বুধবার, ২৬শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১১ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** অপারেশন সিঁদুরের পর আলোচনায় জে–১০সিই, বাংলাদেশ কেন কিনতে চায় চীনের এই যুদ্ধবিমান *** কারাগারে মৃত্যু, দীর্ঘ আটক: এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের যেসব নেতার নাম *** কারাগারে হার্ট অ্যাটাক হলেও তখন জামিন পাননি খায়রুল হক *** বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ৫ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা *** এই অল্প সময়ে বেশি কিছু আশা করা ঠিক হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** হরমুজে ‘অস্থায়ী নৌপথ’ চালু করছে ইরান–ওমান, আছে শর্তও *** আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) *** তিন সাংবাদিককে মারধরের পর বিএনপি নেতা বললেন, ‘তোমরা লেখবা, আমরা পিডামু’ *** সরকার চায় শেখ হাসিনা দেশের বাইরে থাকুন, আল জাজিরাকে বিশেষজ্ঞরা *** মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন কেন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে

সুখবর এক্সপ্লেইনার

অপারেশন সিঁদুরের পর আলোচনায় জে–১০সিই, বাংলাদেশ কেন কিনতে চায় চীনের এই যুদ্ধবিমান

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৮:৪০ অপরাহ্ন, ২৬শে আগস্ট ২০২৬

#

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে আধুনিক করতে চীনের তৈরি জে–১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। প্রায় দেড় বছর ধরে চীনের সঙ্গে এ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে যুদ্ধবিমান কেনার খসড়া চুক্তিও তৈরি হয়েছে। অনুমোদনের জন্য তা সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

চীনের তৈরি এই যুদ্ধবিমান গত বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের সংঘাতের পর আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনায় আসে। পাকিস্তানের দাবি ছিল, জে–১০সি ব্যবহার করে তারা ভারতের কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। এর মধ্যে ফরাসি নির্মাতা দাসোঁর তৈরি রাফালও ছিল বলে দাবি করা হয়। ভারত শুরুতে নিজেদের কোনো যুদ্ধবিমান হারানোর কথা স্বীকার করেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে তখন নানা দাবি ও পাল্টা দাবি দেখা যায়।

তবে পরে বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ২০২৫ সালের মে মাসে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানায়, পাকিস্তানের চীনা তৈরি জে–১০ যুদ্ধবিমান অন্তত দুটি ভারতীয় সামরিক বিমান ভূপাতিত করেছিল বলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের উচ্চমাত্রার আস্থা ছিল। তাদের একজন বলেন, অন্তত একটি বিমান ছিল রাফাল।

পরে রয়টার্সের আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সংঘাতে অন্তত একটি ভারতীয় রাফাল ভূপাতিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এর পেছনে শুধু যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা নয়, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ব্যবস্থা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন সামরিক ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই অভিজ্ঞতার কারণেই বাংলাদেশের কাছে জে–১০সিই এখন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চতুর্থ প্রজন্মের বিভিন্ন ধরনের বহুমুখী যুদ্ধবিমান, যুদ্ধবিমান, আক্রমণকারী হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার এবং চালকবিহীন বিমান ব্যবস্থা কেনার প্রক্রিয়া চলছে। বাজেট পাওয়া গেলে চলতি অর্থবছরেই এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হতে পারে। তা সম্ভব না হলে পরবর্তী বাজেটে নেওয়া হবে।

জে–১০সিই কেনার বিষয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে খসড়া চুক্তিপত্র তৈরি করা হয়েছে। অনুমোদনের জন্য সেটি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

জাহেদ উর রহমান বলেন, ভারত ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সংঘাতে চীনের তৈরি জে–১০সি যুদ্ধবিমান রাফালের বিরুদ্ধে ভালো করেছে। তার ভাষায়, রাফালকে সাড়ে চার প্রজন্মের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি বলা হয়। তার সঙ্গে বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জে–১০সি ভালো করেছে। এ কারণেই বাংলাদেশ এ যুদ্ধবিমানের দিকে মনোযোগ দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ‘জে–১০সি রাফালকে হারিয়েছে’—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কারণ যুদ্ধের ফল শুধু একটি যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না। পাইলটের প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশে নজরদারি ব্যবস্থা, যোগাযোগ এবং যুদ্ধের কৌশল—সবকিছু মিলেই ফল নির্ধারিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও ভারত–পাকিস্তান সংঘাত নিয়ে প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছিল, দুই দেশের দাবি পরস্পরবিরোধী ছিল এবং অনেক তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পাকিস্তান পাঁচটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছিল। ভারত নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেনি। তবে তিনটি ভারতীয় যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যাওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অর্থাৎ, অপারেশন সিঁদুরের সময় জে–১০সির ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হলেও এর প্রতিটি দাবি সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, ওই সংঘাত চীনের তৈরি যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের দিকে বিশ্বের সামরিক বিশ্লেষকদের নজর কাড়ে।

জে–১০সির রপ্তানি সংস্করণ হলো জে–১০সিই। চীনের বিমানবাহিনী জে–১০সি ব্যবহার করে। এটি এক ইঞ্জিনের বহুমুখী যুদ্ধবিমান। অর্থাৎ শুধু আকাশে অন্য যুদ্ধবিমানের সঙ্গে লড়াই নয়, স্থল ও সমুদ্রের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, নজরদারি এবং বিভিন্ন ধরনের সামরিক অভিযানে এটি ব্যবহার করা যায়।

প্রতিরক্ষাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ডিফেন্স নিউজ জানিয়েছে, জে–১০সি সক্রিয় বৈদ্যুতিনভাবে নিয়ন্ত্রিত রাডার ব্যবস্থায় সজ্জিত। একই সঙ্গে দূরপাল্লার পিএল–১৫ আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা এর অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক জাস্টিন ব্রঙ্ক জে–১০সিকে আধুনিক ও শক্তিশালী হালকা বহুমুখী যুদ্ধবিমান হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

চীনের এই যুদ্ধবিমানের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর রাডার। সক্রিয় বৈদ্যুতিনভাবে নিয়ন্ত্রিত রাডার ব্যবস্থার কারণে একই সময়ে একাধিক লক্ষ্য শনাক্ত ও অনুসরণ করার সক্ষমতা বাড়ে। এ ধরনের রাডার আধুনিক যুদ্ধবিমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখনকার আকাশযুদ্ধে শত্রুপক্ষকে চোখে দেখার আগেই দূর থেকে শনাক্ত করা এবং আক্রমণ করা বড় বিষয়।

এর সঙ্গে রয়েছে পিএল–১৫ ক্ষেপণাস্ত্র। এটি দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার জন্য তৈরি। সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে এই ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। জেনসের তথ্য অনুযায়ী, পিএল–১৫ ক্ষেপণাস্ত্রে সক্রিয় বৈদ্যুতিনভাবে নিয়ন্ত্রিত রাডার ব্যবস্থা রয়েছে এবং এর সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৩০০ কিলোমিটার বলে জেনসের অনুমান।

তবে ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লা আর বাস্তব যুদ্ধে কার্যকর পাল্লা এক বিষয় নয়। লক্ষ্যবস্তুর উচ্চতা, গতি, দিক, আবহাওয়া, রাডার তথ্য, বৈদ্যুতিন যুদ্ধ এবং অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর বাস্তব পাল্লা নির্ভর করে।

২০২৫ সালের মে মাসের সংঘাতের ক্ষেত্রে এই ক্ষেপণাস্ত্রের কথাই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিল। রয়টার্সের অনুসন্ধানে বলা হয়, পাকিস্তানি জে–১০সি থেকে ছোড়া পিএল–১৫ ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূর থেকে একটি রাফালকে আঘাত করেছিল বলে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা দাবি করেন। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দূরত্ব আরও বেশি হতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, ওই সংঘাতে পাকিস্তান শুধু একটি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেনি। আকাশ, স্থল ও মহাকাশভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থাকে যুক্ত করে তারা একটি সমন্বিত যুদ্ধব্যবস্থা তৈরি করেছিল। এতে জে–১০সি যুদ্ধবিমান দূরের নজরদারি বিমানের কাছ থেকে তথ্য পেতে পারত। ফলে নিজেদের রাডার সব সময় চালু না রেখেও যুদ্ধক্ষেত্র সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়েছিল।

এ কারণেই সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, অপারেশন সিঁদুরের অভিজ্ঞতা থেকে শুধু জে–১০সির সক্ষমতা নয়, আধুনিক আকাশযুদ্ধে একটি সমন্বিত যুদ্ধব্যবস্থার গুরুত্বও বোঝা যায়।

বাংলাদেশের জন্য জে–১০সিই কেন আকর্ষণীয়, তার আরেকটি কারণ দাম। একই ধরনের পশ্চিমা যুদ্ধবিমানের তুলনায় চীনের যুদ্ধবিমান তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যেতে পারে। ক্রয়মূল্যের পাশাপাশি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও তুলনামূলক কম হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

দেশের প্রতিরক্ষা খাতের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার পর শুধু বিমান কেনার খরচই থাকে না। পাইলট প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ, অস্ত্র, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, ঘাঁটির অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ব্যয়ের বিষয়ও থাকে। কম ক্রয়মূল্যের সঙ্গে যদি পরিচালনা ব্যয়ও তুলনামূলক কম হয়, তাহলে সীমিত প্রতিরক্ষা বাজেটের দেশগুলোর জন্য সেটি বড় সুবিধা।

বাংলাদেশের চীনের অস্ত্র ব্যবহারের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও জে–১০সিই কেনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীতে চীনা নির্মিত বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে। ফলে নতুন যুদ্ধবিমান যুক্ত হলে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।

গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান মনে করেন, প্রযুক্তিগত দিক থেকে জে–১০সি তার সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। দামও তুলনামূলক সাশ্রয়ী। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের চীনা সমরাস্ত্র ব্যবহারের ধারাবাহিকতার সঙ্গেও এটি মেলে।

তবে তার মতে, শুধু সামরিক প্রয়োজন দেখলেই হবে না। ভূরাজনীতিও বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির কথাও মাথায় রাখা প্রয়োজন। জে–১০সিই কেনার কারণে যেন ওই সম্পর্ক বা বাণিজ্যিক স্বার্থে কোনো সমস্যা তৈরি না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তৈরি হয়। একটি আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনা সামরিক সিদ্ধান্ত হলেও এর প্রভাব শুধু প্রতিরক্ষা খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে কূটনীতি, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ও জড়িয়ে যায়।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক পুরোনো। চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই দশকে চীন বাংলাদেশকে নৌযান, যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ও ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছে।

রয়টার্স আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশ সম্ভাব্যভাবে ২৪টি পর্যন্ত জে–১০সিই কেনার কথা বিবেচনা করছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কতটি বিমান কেনা হবে, মোট ব্যয় কত হবে কিংবা কবে বিমানগুলো সরবরাহ করা হবে—এসব তথ্য প্রকাশ করেনি। এগুলো চূড়ান্ত আলোচনার সময় নির্ধারণ হবে।

দেশের এই আগ্রহ অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০২৫ সালের মার্চে বেইজিং সফরের সময় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে জে–১০সিই কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। ২৮ মার্চ বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে তাদের বৈঠক হয়। সেই সময় দুই দেশের আলোচনায় তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহায়তা, বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনা এবং বাংলাদেশের বন্দরগুলোর সঙ্গে চীনের কুনমিংয়ের যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।

এরপর গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের কয়েক দিন আগে চীনের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে জে–১০সিই কেনা নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ওই আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছিল।

এখন খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত হওয়ায় বিষয়টি আরও এক ধাপ এগিয়েছে। তবে খসড়া চুক্তি তৈরি হওয়া আর চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি হওয়া এক বিষয় নয়। এর পরেও অনুমোদন, অর্থের সংস্থান, কারিগরি মূল্যায়ন, দর–কষাকষি এবং সরবরাহের সময়সূচি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

দেশের বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন নেই। দেশের আকাশসীমা সুরক্ষা, নজরদারি এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় আধুনিক যুদ্ধবিমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পুরোনো যুদ্ধবিমানের বহর ধীরে ধীরে আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন।

তবে যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে শুধু ‘কোন বিমান বেশি শক্তিশালী’—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। কতটা সময় এটি কার্যকর থাকবে, অস্ত্র ও যন্ত্রাংশ কত সহজে পাওয়া যাবে, পাইলট ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ কীভাবে হবে, যুদ্ধের সময় সরবরাহব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে এবং দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ কতটা পড়বে—এসবও বিবেচনায় নিতে হবে।

অপারেশন সিঁদুরের অভিজ্ঞতা জে–১০সির প্রতি বাংলাদেশের আগ্রহ বাড়িয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। তবে ওই সংঘাত এটাও দেখিয়েছে যে আধুনিক যুদ্ধ শুধু যুদ্ধবিমান বনাম যুদ্ধবিমানের লড়াই নয়। উন্নত রাডার, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি বিমান, উপগ্রহ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিন যুদ্ধ—সবকিছুর সমন্বয় এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রয়টার্সের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ভারতীয় রাফালের ক্ষতির ঘটনাকে শুধু চীনা যুদ্ধবিমানের শ্রেষ্ঠত্ব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। যুদ্ধক্ষেত্রে কার কাছে ভালো তথ্য ছিল, কে দ্রুত সেই তথ্য কাজে লাগাতে পেরেছে এবং কোন পক্ষের সমন্বিত ব্যবস্থা বেশি কার্যকর ছিল—এসব বিষয়ও বড় ভূমিকা রেখেছে।

তাই বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত জে–১০সিই কেনে, তাহলে শুধু যুদ্ধবিমান কেনাই যথেষ্ট হবে না। এর সঙ্গে আধুনিক রাডার, আকাশ নজরদারি, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা এবং সমন্বিত কমান্ড ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।

সব মিলিয়ে জে–১০সিই বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক কম খরচে আধুনিক যুদ্ধবিমান বহরে যুক্ত করার একটি সুযোগ হতে পারে। অপারেশন সিঁদুরে এর আলোচিত ভূমিকা সেই আগ্রহকে আরও বাড়িয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সামর্থ্য, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, অস্ত্রের সরবরাহ এবং চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক—সবকিছুকেই একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তবেই এই কেনাকাটা বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষাকে বাস্তবে কতটা শক্তিশালী করবে, সেটি নির্ধারিত হবে।

যুদ্ধবিমান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250