রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছিল: ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী *** উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে ১,৩৯৯টি ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে: গবেষণা *** হুতিদের মোকাবিলায় এবার সৌদির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা তুরস্কের! যুদ্ধ করবে কি? *** কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ *** তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি *** জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান *** মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের *** আওয়ামী লীগ-জামায়াত এক হয়েও বিএনপির কিছুই করতে পারেনি: এমপি চাঁদ *** তেজগাঁওয়ে মসজিদে গোপন বৈঠক: উগ্রবাদ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ১২ জন ৩ দিনের রিমান্ডে *** কেরানীগঞ্জে থানার সামনে ট্রাকে আগুন, আব্দুল্লাহপুরে ককটেল বিস্ফোরণ

গুপ্ত রাজনীতির একাল-সেকাল

উপ-সম্পাদকীয়

🕒 প্রকাশ: ০২:৫৫ অপরাহ্ন, ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

শায়লা শবনম

‘গুপ্ত’ শব্দের অর্থ হলো— গোপন, আড়ালে থাকা বা প্রকাশ্যে না আসা। এই শব্দটি বাংলা ভাষায় বহুকাল ধরেই পরিচিত। উপমহাদেশের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দের ব্যবহার কেবল ভাষাগত নয়, এটি বরাবরই ক্ষমতা, কৌশল, সন্দেহ এবং কখনও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। পৃথিবীর ইতিহাসে গুপ্ত পরিচয় কখনও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা করেছে, আবার কখনও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে গুপ্ত তৎপরতা থাকলেও ‘গুপ্ত’ শব্দটি এত ঘনঘন, এত প্রকাশ্যে এবং এত রাজনৈতিক অর্থবহভাবে ব্যবহৃত হয়নি— যতটা দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ‘গুপ্ত’ শব্দটি নতুন এক রাজনৈতিক অভিধা পায়। এখন এটি আর শুধু নিষিদ্ধ সংগঠন বা আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বৈধ রাজনৈতিক পরিসরের ভেতরে থেকেও কাউকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

প্রাচীনকালের গুপ্তচর ও রাজনীতি

রাজনীতিতে গুপ্ত ধারণার উৎপত্তি নতুন নয়। প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে গুপ্তচর বা গুপ্ত দূত ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার একটি স্বাভাবিক উপাদান। কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’-এ গুপ্তচর ব্যবস্থার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, রাজাকে জানতে হবে শত্রু কী ভাবছে, মিত্র কী পরিকল্পনা করছে এবং এই জানার কাজটি প্রকাশ্যে সম্ভব নয়।

মধ্যযুগে রাজদরবারে ছদ্মবেশী দূত, গোপন বৈঠক, এমনকি গুপ্ত বার্তা আদান-প্রদান ছিল স্বাভাবিক চর্চা। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা উপমহাদেশ— সব জায়গাতেই গুপ্ত তৎপরতা রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। তবে সেসব ক্ষেত্রে গুপ্ততা ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, যুদ্ধ, কূটনীতি বা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার কৌশল।

বাংলায় গুপ্ত রাজনীতির ইতিহাস

এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও গুপ্ত সংগঠন বা আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির নজির কম নয়। ব্রিটিশ শাসনামলে বিপ্লবী সংগঠনগুলো গুপ্তভাবে কাজ করেছে। পাকিস্তান আমলেও অনেক রাজনৈতিক দল ও নেতা আত্মগোপনে থেকে সংগঠন চালিয়েছেন।

সামরিক শাসনের সময় গুপ্ত সভা, গোপন লিফলেট, ছদ্মনাম—সবই ছিল আন্দোলনের বাস্তবতা। কিন্তু সেই গুপ্ত রাজনীতি ছিল রাষ্ট্রের দমননীতির ফল। প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ না থাকায় গোপন পথ বেছে নিতে হয়েছে। বর্তমান আলোচনার সঙ্গে এখানেই বড় পার্থক্য।

‘গুপ্ত’ রাজনীতির নতুন সংজ্ঞা

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর ‘গুপ্ত’ শব্দটি একেবারে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে যারা দীর্ঘদিন বিগত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন 'ছাত্রলীগ' এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের একটি অংশ আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে ভিন্ন রাজনৈতিক (ইসলামী ছাত্র শিবির) পরিচয়ে নিজেদের হাজির করেন। তখন বলা হয়, তারা কৌশলগতভাবে ভেতরে থেকে কাজ করছিলেন— অর্থাৎ ‘গুপ্ত’ ছিলেন।

এই গুপ্ত পরিচয়কে কেউ কেউ আন্দোলনের বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ এটিকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। ২০২৫ সালের শুরুতে ছাত্রদল সভাপতির বক্তব্য সেই বিতর্ককে আরও উসকে দেয়। তিনি দাবি করেন, ছাত্রলীগের ভেতরে শিবিরের নেতাকর্মীরা গুপ্ত অবস্থায় ছিল। প্রশ্ন ওঠে— আন্দোলন ব্যর্থ হলে কি তারা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করত? এই প্রশ্নের উত্তর আর এগোয়নি। কিন্তু ‘গুপ্ত’ শব্দটি তখন থেকেই কৌশল না অভিযোগ— এই দ্বন্দ্বে আটকে যায়।

নির্বাচন এবং ‘গুপ্ত’ রাজনীতি

২০২৬ সালের নির্বাচনি প্রেক্ষাপটে এসে ‘গুপ্ত’ শব্দটি আরও সরাসরি রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে। ৩১শে জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জনসভায় বক্তব্যে সতর্ক করেন, কিছু মানুষ ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে এবং তাদের ‘গুপ্ত’ বলে চিহ্নিত করতে বলেন। তার বক্তব্যে ‘গত ১৬ বছর দেখা যায়নি’— এই অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল।

এই বক্তব্যের পরদিন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রকাশ্য জনসভায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি ‘গুপ্ত’ ও ‘সুপ্ত’ শব্দ ব্যবহারের প্রতিবাদ করেন এবং পাল্টা প্রশ্ন তোলেন— নিজেরা গুপ্ত-সুপ্ত হয়ে থাকলে অন্যকে গুপ্ত বলার অধিকার কোথায়?

গুপ্ত বনাম আদর্শ: জামায়াতের অস্বস্তি

গুপ্ত শব্দটি জামায়াতের ক্ষেত্রে সংবেদনশীল হয়ে ওঠার পেছনে আদর্শিক কারণও রয়েছে। সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামালের মতে, ইসলামি রাজনীতিতে গুপ্ততার ধারণা নেতিবাচক। ইসলামে গুপ্ত রাজনীতি মুনাফেকির সঙ্গে তুলনীয়। ফলে জামায়াত যদি স্বীকার করে যে তারা গুপ্ত রাজনীতিতে ছিল, তাহলে আদর্শিকভাবে তারা সমালোচনার মুখে পড়বে।

এই কারণেই ‘গুপ্ত’ শব্দটি জামায়াতের গায়ে লেগেছে এবং তারা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে—এমন বিশ্লেষণও উঠে আসছে।

আত্মপ্রতারণা নাকি রাজনৈতিক কৌশল

জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্ন দৃষ্টিতে। তার মতে, দীর্ঘদিন জোট রাজনীতি করে শরিক দলকে এখন গুপ্ত বলা আত্মপ্রতারণার শামিল। তিনি মনে করেন, একটি বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার মুখে এ ধরনের শব্দ ব্যবহার রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত এবং বেমানান।

তার বক্তব্যে আরও উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—অতীতে অনেক নেতা রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আত্মগোপনে গেছেন, সেটি কৌশল। কিন্তু সেই ইতিহাসকে আজ অপমানের ভাষায় ব্যবহার করা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য দুঃখজনক।

গুপ্ত রাজনীতি: নতুন বিভাজন 

বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে— ‘গুপ্ত’ শব্দের এই অতিরিক্ত ব্যবহার কি রাজনীতিতে নতুন বিভাজন তৈরি করছে? আদর্শ, কর্মসূচি বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্কের বদলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অতীত উপস্থিতি নিয়ে আক্রমণ বাড়ছে। এতে রাজনীতির মূল আলোচনা পেছনে পড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ‘গুপ্ত’ শব্দটি এমন এক সন্দেহের রাজনীতি তৈরি করছে, যেখানে প্রকাশ্য রাজনীতিতেও সবাইকে প্রমাণ করতে হচ্ছে— আমি গুপ্ত নই।

সময়ের ফারাকে গুপ্ত রাজনীতি 

গুপ্ত রাজনীতি—  একসময় যা ছিল বাধ্যবাধকতা, এখন তা হয়ে উঠছে অভিযোগ। আগে গুপ্ততা ছিল ক্ষমতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার কৌশল, এখন তা ব্যবহার হচ্ছে ক্ষমতা অর্জনের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার অস্ত্র হিসেবে। এই পরিবর্তনই ‘গুপ্ত রাজনীতির একাল-সেকাল’-এর সবচেয়ে বড় ফারাক।

‘গুপ্ত’ শব্দটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্প্রতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর ভেতর এ ধরনের রাজনীতির চর্চা নিয়ে পুরনো বিতর্ক থাকলেও— আদর্শিক সমালোচনার মুখে পড়ার ভয়ে দলটির নেতারা তা কখনোই স্বীকার করেন না।

এ নিয়ে নির্বাচনি প্রচার মাঠে বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে ‘গুপ্ত’ রাজনীতির অভিযোগ উঠায় পুরনো বিতর্ক নতুন করে ডালপালা ছড়িয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়— গুপ্ত কে, আর প্রকাশ্যই বা কে? নাকি এই শব্দটি কেবলই নির্বাচনি রাজনীতির এক নতুন বাগ্মিতা? 

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

শায়লা শবনম

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছিল: ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী

🕒 প্রকাশ: ০৯:২৪ পূর্বাহ্ন, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে ১,৩৯৯টি ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে: গবেষণা

🕒 প্রকাশ: ০৯:১০ পূর্বাহ্ন, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

এম এস সুব্বুলক্ষ্মীর চরিত্রে রাশমিকা

🕒 প্রকাশ: ০৯:০২ পূর্বাহ্ন, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

হুতিদের মোকাবিলায় এবার সৌদির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা তুরস্কের! যুদ্ধ করবে কি?

🕒 প্রকাশ: ০৮:৫১ পূর্বাহ্ন, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ

🕒 প্রকাশ: ০১:২২ পূর্বাহ্ন, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬

Footer Up 970x250