ছবি: সংগৃহীত
১৮ মাস কারাগারে এবং ১৭ বছর বিদেশে কাটানোর পর সশরীরে আবার দেশের রাজনীতির মাঠে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের সংকটাপন্ন অবস্থায় তার দেশে না ফেরার সমালোচনাও কম হয়নি। অবশেষে দেশে এলেন তিনি, গতকাল ২৫শে ডিসেম্বর এবং এমন একটা সময়ে ফিরলেন যখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে ব্যস্ততা চলছে।
বিদেশে থাকা তারেক রহমানের জন্য তার দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে যে উদগ্রীব অপেক্ষা ছিল, সেটা তার ঢাকার ফেরার দিনে বিমানবন্দরের আশপাশে এবং পূর্বাচলের ৩০০ ফিটে বিএনপির আয়োজিত সংবর্ধনাস্থলে বিপুল মানুষের সমাগম থেকে অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে। তবে দেশে ফেরার অপেক্ষার শেষ হলেও এবার অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জও রয়েছে তারেক রহমানের সামনে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
বিবিসি বাংলা বলছে, ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি শাসনামলে তারেক রহমানকে ঘিরে অতীত অভিযোগের প্রেক্ষিতে জনগণের কাছে ভাবমূর্তি পরিবর্তন ও আস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জও আছে। তিনি দেশে ফেরার পর তাকে ঘিরে নেতা-কর্মীদের মধ্যে বেপরোয়াভাব চলে আসতে পারে, এমন আশঙ্কাও বেশ আগে থেকেই করেছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
'তারেক রহমানকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে' শিরোনামে আজ শুক্রবার (২৬শে ডিসেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে, সেটি লন্ডনে তারেক রহমানের আয়ের উৎস। এর কোনো সঠিক উত্তর এখনো নেই। আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি এতদিন বিদেশে থাকার পর ট্রাভেল পাস নিয়ে যে এসেছেন, এরপর তার লন্ডন ফেরার সুযোগ রয়েছে কিনা, অথবা তিনি যুক্তরাজ্যের পাসপোর্ট নিয়েছেন কিনা। আবার, তিনি দেশে ফিরে এলেও এখনো তার পাসপোর্টসহ কিছু বিষয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
এতে বলা হয়, তারেক রহমানের নিরাপত্তার শঙ্কা অনেকবারই সামনে এসেছে। এবার তিনি ঢাকায় ফেরার পর বিমানবন্দর থেকেই সেনাবাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা গেছে তার গাড়িবহর ও চলাচলের রাস্তা ধরে। জনসংযোগের ক্ষেত্রে এমন কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিবন্ধকতাও হতে পারে। দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে খাপ খাওয়ানোর চ্যালেঞ্জও আছে। মাঠপর্যায়ে সেসব বিষয় মোকাবিলা করে যে 'ঐক্যের' কথা তিনি বলেন, সেগুলো দৃশ্যমান করতে হবে তারেক রহমানকে।
এতে আরো বলা হয়, আবার নির্বাচনের মাঠে লন্ডন থেকে ফেরা তার ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মী ও দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা, বিএনপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পেতে প্রভাব বিস্তার করতে চাওয়া নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে। এর মধ্যেই আওয়ামী লীগ শাসনামলে দেশে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীরা যতটা ভোগান্তির মধ্য দিয়ে গেছেন, সেসব নেতাকর্মী নির্বাচনী মনোনয়নে জায়গা না পাওয়ার অভিযোগও করেন। সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে জনগণের আস্থা কতটা ফেরাতে পারবেন তারেক রহমান, সেদিকে নজর থাকবে অনেকের।
বিবিসি বাংলা বলছে, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অসুস্থতায় দীর্ঘদিন তারেক রহমান দলটির নেতৃত্ব দিলেও এখন নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তার সামনে রয়েছে। শীর্ষ নেতা হিসেবে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে কৌশল নির্ধারণ বা অনিশ্চয়তা মোকাবিলা ছাড়াও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, বিরোধী পক্ষের সমালোচনা বা চাপ, কূটনৈতিক পর্যায়ে অবস্থান, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ শক্ত করা- এমন বিভিন্ন বিষয় থাকবে।
এসব প্রসঙ্গে বিবিসি বাংলাকে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন বলেন, 'জনসাধারণের অনেক প্রশ্ন আছে, তার (তারেক রহমান) নেতাকর্মীদের অনেক প্রশ্ন আছে। তিনি কেন এতদিন আসেননি, ওখানে (লন্ডনে) কোন স্ট্যাটাসে থাকলেন, কেন মায়ের (খালেদা জিয়া) অসুস্থতার সময়ও আসতে পারলেন না, আবার এও বললেন তিনি একা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না এবং সেকথা বলতেও পারছেন না, এগুলো নিয়ে যে অস্বচ্ছতা আছে তার সম্পর্কে, সেটা কিন্তু নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে একটি সমস্যা।'
দলীয় বিভিন্ন সমস্যা, চাঁদাবাজি ইস্যু, এবং তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সেসব সমস্যা বড় করে প্রচার করাটাও তারেক রহমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয় হবে উল্লেখ করেন বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন।
'তিনি দলকে নেতৃত্ব দেবেন একটা নির্বাচনী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। তার কাছে যে প্রত্যাশার চাপ, এই প্রত্যাশা পূরণ করার ক্ষেত্রে তার অনেক সমস্যা আছে। কারণ তিনি ১৭ বছর দেশের বাইরে। তিনি যতই ইন্টারনেট প্রযুক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ রাখুন বা নেতৃত্ব করুন, ইংরেজিতে গ্রাউন্ড রিয়েলিটি বলে একটা বিষয় আছে, যে সত্যি বাস্তব অবস্থাটা কেমন, যখন তার মুখোমুখি হবেন' সেসবের চ্যালেঞ্জ থাকবে বলে মনে করছেন মোজাম্মেল হোসেন।
তার মতে, 'বিএনপির মতো বড় দল আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে একটি গণতান্ত্রিক মধ্যপন্থি দলের অভাব দেশের মানুষ বোধ করেন, তাদের যে প্রত্যাশা থাকবে সেটি পূরণ করাও বিএনপির জন্য বেশ কঠিন হবে।' অবশ্য নির্বাচন কাছে চলে এলে কোনো না কোনোভাবে দলের অভ্যন্তরীণ সমস্যার অন্তত সমাধান হয়ে যাওয়ার সুযোগও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামীম রেজার মতে, তারেক রহমানের দেশে ব্যক্তিগত দিকের সেসব আলোচনা রয়েছে, সেগুলো খুব একটা জোরালো হবে না। বরং একটা সমবেদনার জায়গা তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, বিএনপির প্রবীণ ও তরুণ পর্যায়ে নেতাদের বিভিন্ন অনুরোধ এবং সেসবের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা নির্বাচনের আগে অন্তত সম্ভব হবে বলে মনে করছি না। সেসব আলোচনা নির্বাচনের পড়ে আরও প্রকট হতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন