ফাইল ছবি
দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ টানাপোড়েন, সংঘাত ও অনিশ্চয়তার এক অধ্যায়ের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পরদিনই তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার তিনটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে—দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই তিন অগ্রাধিকার ছিল জনমুখী এবং বাস্তবসম্মত।
কিন্তু সরকারের প্রথম ১০০ দিন শেষ হতে চলেছে। সাধারণভাবে এই সময়টিকে নতুন সরকারের ‘মধুচন্দ্রিমা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়—যেখানে জনগণ কিছুটা সময় দেয়, বিরোধীরা অপেক্ষা করে এবং প্রশাসন নতুনভাবে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। সেই সময় প্রায় শেষ হওয়ার মুখে প্রশ্ন উঠছে, সরকারের ঘোষিত তিন অগ্রাধিকারে দৃশ্যমান অগ্রগতি কতটা এসেছে?
তিন মাসের মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, সরকার এমন এক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় দায়িত্ব নিয়েছে, যা তার জন্য অনুকূল ছিল না। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের বিস্তার বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দেয়। দেশের আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এর প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক। জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে, উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে, এমনকি রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার প্রথমে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর অবস্থান নিলেও পরে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তের কারণে তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়। কিন্তু সমস্যাটি শুধু দাম বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম বাড়ে। এমন এক সময়ে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, যখন দেশের মানুষ টানা তিন বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বহন করছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো দুই অঙ্কের কাছাকাছি অবস্থান করছে। শহরাঞ্চলের মধ্যবিত্তের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। বিশেষ করে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, সবজি ও মাছের বাজারে অস্বস্তি অব্যাহত রয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাজারে দ্রুত স্বস্তি ফিরবে—এমন প্রত্যাশা ছিল সাধারণ মানুষের। কিন্তু বাস্তবে বাজারে সেই পরিবর্তন দেখা যায়নি।
বরং বোরো মৌসুমেও চালের দাম বাড়তে দেখা গেছে। এর পেছনে একদিকে রয়েছে আগাম বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওর অঞ্চলে ফসলহানি, অন্যদিকে রয়েছে সরকারি ক্রয়নীতির সীমাবদ্ধতা। কৃষকেরা অভিযোগ করছেন, ডিজেলের উচ্চমূল্যে ব্যয় বাড়লেও সরকার সময়মতো ধান কেনেনি। ফলে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন তারা। অর্থনীতিবিদদের মতে, ধান কম কিনে চাল বেশি কেনার পুরোনো নীতির ধারাবাহিকতা এখনো বজায় আছে।
এবারের বোরো মৌসুমে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন চালের সম্ভাব্য ঘাটতির আশঙ্কা ইতিমধ্যে বাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সরকার চাল আমদানির উদ্যোগের কথা বললেও বাজারে এখনো তার সুস্পষ্ট ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। কিন্তু এখানেও সরকারকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডিজেলের জন্য পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মানুষ তেল পাননি। একই সময়ে মজুতদারির অভিযোগও সামনে আসে। সরকার প্রথমদিকে ঘাটতির কথা অস্বীকার করলেও পরে বিপিসি সরবরাহ বাড়ালে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। এতে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে কি কৃত্রিম সংকটের সুযোগে একটি অংশ অতিরিক্ত মুনাফা করেছে?
জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ খাতে। গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করা হলেও রাজধানীকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত রাখা হয়। এই বৈষম্যমূলক নীতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে সরকার ঢাকাতেও লোডশেডিং শুরু করলে কিছুটা সমতা এলেও প্রশ্ন থেকেই গেছে—সংকট ব্যবস্থাপনায় সরকারের প্রস্তুতি ও সমন্বয় কতটা কার্যকর ছিল।
তবে সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন সমালোচনার জায়গা হয়ে উঠেছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই দেশে ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যাকাণ্ড, নারী নির্যাতন ও মব সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, নতুন সরকারের তিন মাসেও তার দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, এপ্রিল মাসে দেশে অন্তত ৪৯টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে নিহত হয়েছেন ২১ জন। এ ছাড়া রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে হামলা, বাউল-পীরদের ওপর আক্রমণ এবং টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনাও ঘটেছে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ফিলিপনগরের দরগায় হামলা ও পীর হত্যার ঘটনায় হামলাকারীদের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ্যে এলেও গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র দুজন। একইভাবে রাজধানীর শাহ আলীর মাজারে হামলার ঘটনাতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকার বলছে, অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধই বিবেচনায় নেওয়া হবে। কিন্তু সমালোচকেরা বলছেন, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলে তদন্তের গতি কমে যাচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসনের ভেতরে যে শিথিলতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে নতুন সরকার এখনো পুরোপুরি সক্ষম হয়নি। পুলিশ প্রশাসনে বদলি ও পুনর্বিন্যাস করা হলেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি।
তবে সরকারের তিন মাসের মূল্যায়নে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা। প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া এই রোগ নতুন করে ভয়াবহ আকারে ফিরে আসে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের সরকারের সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম চললেও বিশেষ ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকা কেনার নীতিগত পরিবর্তনের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এর দায় নতুন সরকারের নয়, কিন্তু সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার প্রশ্নে সরকারকে বিচার করা হচ্ছে।
সরকার দ্রুত টিকা সংগ্রহ করে দেশজুড়ে প্রায় ১ কোটি ৭২ লাখ শিশুকে টিকা দেয়। এটি প্রশাসনিকভাবে একটি বড় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সামনে এসেছে। উপজেলা ও জেলা হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন, আইসিইউ ও বিশেষায়িত চিকিৎসার অভাবে বহু শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা শুরু থেকেই হামের প্রাদুর্ভাবকে ‘স্বাস্থ্যগত জরুরি পরিস্থিতি’ ঘোষণার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার সেই পথে যায়নি। ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ গড়ে ওঠেনি। দরিদ্র পরিবারগুলো চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে ঋণ, জমি বিক্রি বা বন্ধক রাখতে বাধ্য হয়েছে। এই পরিস্থিতি সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ, মানুষের প্রত্যাশা ছিল—নতুন সরকার অন্তত জনসেবামূলক খাতগুলোতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে।
অবশ্য সরকারের পক্ষেও কিছু ইতিবাচক দিক তুলে ধরা হচ্ছে। প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কমানোর চেষ্টা, বিরোধী মতের প্রতি তুলনামূলক সহনশীলতা এবং গণমাধ্যমের ওপর সরাসরি চাপ কম থাকার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ বলছে, অর্থনীতিতে বড় ধরনের আতঙ্ক বা অনিশ্চয়তা এখনো তৈরি হয়নি। রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহও পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রত্যাশা ব্যবস্থাপনা। দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকার কারণে বিএনপি মানুষের কাছে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে হাজির হয়েছিল। ফলে মানুষ দ্রুত ফল চায়। কিন্তু বৈশ্বিক সংকট, অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার বাস্তবতায় সেই ফল দ্রুত দেখানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
সরকারের প্রথম তিন মাসের অভিজ্ঞতা বলছে, কেবল বৈশ্বিক বা প্রাকৃতিক কারণ নয়, নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ঘাটতিও অনেক সংকটকে গভীর করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ, বাজার নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সমন্বিত কৌশলের অভাব স্পষ্ট হয়েছে।
মধুচন্দ্রিমার সময় প্রায় শেষ। এখন থেকে সরকারকে আর ‘নতুন’ বলে ছাড় দেওয়া হবে না। সামনে বাজেট বাস্তবায়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যনিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় বাস্তব ফল দেখাতে হবে। কারণ, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনসমর্থন ধরে রাখার সবচেয়ে বড় শর্ত এখন আর কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—কার্যকর প্রশাসনিক সক্ষমতা।
খবরটি শেয়ার করুন