বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অবস্থান—সরকারের অংশ না বিপক্ষ, এই প্রশ্ন ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আলোচনার। এক সময় যেসব রাজনৈতিক দল এনসিপিকে ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে চিহ্নিত করত, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে সেই দলটিরই কয়েকজন নেতাকর্মী সরকারের কঠোর সমালোচনা করছেন। এই রাজনৈতিক দ্বৈত অবস্থান কৌশলগত না কি লোকদেখানো — এমন প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
এই প্রেক্ষাপটে গতকাল মঙ্গলবার (১৯শে আগস্ট) দেশ টিভির ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত একটি টকশোর খণ্ডচিত্রে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। আজ বুধবার (২০শে আগস্ট) সকাল সোয়া ১০টা পর্যন্ত ভিডিওটি ইউটিউবে প্রায় ১১ হাজার বার দেখা হয়েছে।
‘সরকারের ভেতরেও আছে, বাইরেও’ — এনসিপি নিয়ে দ্বিধা
আনিস আলমগীর বলেন, এনসিপির কিছু নেতার সরকার বিরোধী বক্তব্য লোকদেখানো কি না, সেটা বলা কঠিন। কারণ তারা এখনো সরকারের অংশ, আবার সমালোচকের ভূমিকাও নিচ্ছে। বিশেষ করে হাসনাত আবদুল্লাহর সাম্প্রতিক বক্তব্যে সরকারের প্রতি হতাশা প্রকাশ পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘তারা সরকারের সঙ্গে থেকেই প্রভাব বিস্তার করছে। আবার সরকারের বিরুদ্ধেও কথা বলছে। এটা দ্বৈত অবস্থান। তারা কীভাবে রাষ্ট্রকে রিফর্ম করবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কিছু জানায়নি, এমনকি তাদের ম্যানিফেস্টোও প্রকাশ করেনি।’
লন্ডন বৈঠকের পর দূরত্ব?
টকশোর সঞ্চালক প্রশ্ন করেন, লন্ডন বৈঠকের পর এনসিপির সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়েছে কি না। আনিস আলমগীরের উত্তর, ‘মূলত কোনো বড় ধরণের দূরত্ব তৈরি হয়নি। বরং ড. ইউনুস জানতেন, তিনি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানে থাকতে পারবেন না।’ তিনি বলেন, এনসিপির পক্ষে সরকারকে প্রভাবিত করে কাঙ্ক্ষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে হতাশা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘তারা ফেব্রুয়ারিকে একটি ‘এক্সিট পয়েন্ট’ হিসেবে ধরেছিল। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা মাঠের প্রস্তুতি এখনো তেমনভাবে শুরু হয়নি। এমনকি দল হিসেবে নিবন্ধনও এখনো পায়নি এনসিপি। তারা এখনো প্রেসার গ্রুপ হিসেবেই কাজ করছে।’
আসিফ মাহমুদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও আস্থাহীনতা
সরকারের সঙ্গে এনসিপির সম্পর্ক প্রসঙ্গে আনিস আলমগীর বলেন, উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের কিছু কর্মকাণ্ড এনসিপির জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি অভিযোগ করেন, ‘আসিফ মাহমুদ লাখ টাকার স্টেডিয়াম কোটি টাকায় দিয়ে দিচ্ছেন, অস্ত্র নিয়ে বিদেশে যাওয়া চেষ্টা করছেন, চাঁদাবাজদের সঙ্গে চলাফেরা করছেন — এসব তথ্য ফাঁস হচ্ছে সরকারের মধ্য থেকেই।’
তিনি মনে করেন, ‘তারা নিজেদেরকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছে, যাতে ড. ইউনূসের পর তারা দায়মুক্ত থেকে যায়। কিন্তু এটা অনিশ্চয়তায় ভরা।’
জুলাই সনদ ও আইনি সুরক্ষা
আনিস আলমগীর বলেন, এনসিপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ৫ই আগস্টের পর ঘটনার ধারাবাহিকতায় ‘জুলাই সনদ’ তৈরি হয়েছে। এই সনদ নিয়ে আইনজীবী, বিচারপতি ও রাজনীতিকদের সমন্বয়ে কমিটি গঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই সনদের পেছনে উদ্দেশ্য হলো—যত কিছু ঘটেছে, ভালো-মন্দ যাই হোক না কেন, যেন তা ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে না পড়ে।’
তবে তিনি সাবধান করে দেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, ইনডিমিনিটি বা আইনি রক্ষা দেয়াল বেশিক্ষণ টেকে না। ক্ষমতা হারালে প্রতিপক্ষ এক কলমে সব উল্টে দিতে পারে।’
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি কি রাজনৈতিক হিসাব?
আনিস আলমগীর বলেন, বর্তমানে আওয়ামী লীগকে আলোচনার বাইরে রাখা হলেও তারা এখনো দেশের ভেতরেই আছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে আছে। তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ, কিন্তু নেতাকর্মীরা তো দেশেই আছে। তারা ভবিষ্যতে কীভাবে ফিরে আসবে, সেটি বড় প্রশ্ন।’
তিনি সতর্ক করেন, ‘আওয়ামী লীগ যদি আগের ফরম্যাটেই ফিরে আসে — দুর্বৃত্ত ও লুটপাটকারীদের নিয়ে — তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হবে। এখন যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো যেন শুধু বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতের দিকেও নজর রেখে নেওয়া হয়।’
আগামী নির্বাচনের ভবিষ্যৎ ও প্রশ্ন
আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের নির্বাচনের মতো যদি একতরফা নির্বাচন হয়, তাহলে এর পরিণতি কী হবে, তা বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভাবা উচিত।’ তিনি ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনগুলোর উদাহরণ দিয়ে প্রশ্ন তোলেন, ‘পূর্ববর্তী কমিশনারদের পরিণতি কী হয়েছে? এখন যারা আছেন, তাদেরও ভাবতে হবে—তারা কী রেখে যাচ্ছেন দেশের জন্য।’
আনিস আলমগীরের বক্তব্যে স্পষ্ট, বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে এনসিপি এখনো দ্বিধান্বিত অবস্থানে। সরকারপন্থি না বিরোধী — সে প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন