ছবি: সংগৃহীত
ক্ষমতাসীন বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে নতুন চার মুখ যুক্ত হয়েছেন। তাদের একজন অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার। চিকিৎসক হিসেবে তার পরিচিতি আগে থেকেই। বিশেষ করে ক্যানসার চিকিৎসায় তার দীর্ঘ পেশাগত পথচলা রয়েছে। তবে চিকিৎসক পরিচয়ের আড়ালে তার আরেকটি দীর্ঘ পরিচয় আছে। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও বহু বছর ধরে যুক্ত।
আজ শনিবার বিএনপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চারজনকে স্থায়ী কমিটির সদস্য করার কথা জানানো হয়। নতুন সদস্যদের তালিকায় ফরহাদ হালিম ডোনারের সঙ্গে রয়েছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, সাবেক ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান এবং মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ।
দলের সহদপ্তর সম্পাদক মুহাম্মদ মুনির হোসেনের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গতি আনা এবং দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যেই তাদের এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন চারজনের মধ্যে ফরহাদ হালিম ডোনারকে ঘিরেই আগ্রহটা একটু বেশি। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাকে দলীয় রাজনীতির সামনের সারিতে খুব বেশি দেখা যায়নি। অথচ বিএনপির ভেতরে তার যোগাযোগ পুরোনো। চিকিৎসা পেশা, পেশাজীবী সংগঠন এবং দলীয় রাজনীতির নানা স্তরে তিনি কাজ করেছেন। সেই পথ ধরেই এবার তিনি পৌঁছেছেন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পরিসরে।
ফরহাদ হালিম ডোনারের মূল পরিচয় একজন চিকিৎসক হিসেবে। তিনি ক্যানসার বিশেষজ্ঞ। দেশের ক্যানসার চিকিৎসার পরিসর বড় করার সঙ্গে তার নাম বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের প্রথম প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
দেশে ক্যানসারের চিকিৎসাব্যবস্থা যখন আরও বিস্তৃত হওয়ার পথে ছিল, তখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়নেও তিনি কাজ করেছেন। চিকিৎসার পাশাপাশি চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বস্থানীয় দায়িত্বে থাকার অভিজ্ঞতাও আছে তার।
চিকিৎসা পেশার বাইরে পেশাজীবী রাজনীতিতেও ডোনারের অবস্থান তৈরি হয়। তিনি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত। চিকিৎসকদের এই সংগঠনের আহ্বায়কের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিএনপির রাজনীতিতে তার ভূমিকার শুরু আরও আগে। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার দায়িত্বেও ছিলেন। ফলে দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও নীতিনির্ধারণী মহলের সঙ্গে তার যোগাযোগ নতুন কিছু নয়।
দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন। এই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নামে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রমে তার উপস্থিতি ছিল। দলীয় কর্মকাণ্ডের বাইরেও শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
রাজনীতির মাঠে তার দৃশ্যমানতা হয়তো সাম্প্রতিক সময়ে তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু দলের ভেতরে তার কাজের পরিধি কম ছিল না। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতেও তার নাম ছিল। নির্বাচনী প্রস্তুতিতে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দায়িত্বে তার অন্তর্ভুক্তি দেখায়, নেতৃত্বের কাছে তার ওপর আস্থার জায়গাটি আগে থেকেই ছিল।
এ বছরের জুলাইয়ে তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের খবর আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে তাকে মনোনীত করা হয়। দেশের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার পেশাগত পরিচয়ের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়।
ফরহাদ হালিম ডোনারের রাজনৈতিক যাত্রাকে তাই শুধু মিছিল-মিটিংয়ের রাজনীতি দিয়ে দেখার সুযোগ নেই। তার পথটি অনেকটা ভিন্ন। চিকিৎসা দিয়ে শুরু। এরপর চিকিৎসকদের পেশাজীবী সংগঠন। সেখান থেকে বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতি। একই সঙ্গে শিক্ষা, গবেষণা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড। দীর্ঘ সময় ধরে এই কয়েকটি ক্ষেত্রের সমান্তরাল পথচলা তাকে দলের কাছে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে তার অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ পথচলার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
দলের ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলের পর ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে মৃত্যু, পদত্যাগসহ নানা কারণে এই ফোরামের কয়েকটি আসন খালি হয়েছে। পরে বিভিন্ন সময়ে শূন্য পদ পূরণ করা হয়েছে। এবার একসঙ্গে চারজনকে যুক্ত করল বিএনপি।
নতুন চারজন যুক্ত হওয়ার আগে স্থায়ী কমিটিতে ১৩ জন সদস্য ছিলেন। তারা হলেন তারেক রহমান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
স্থায়ী কমিটির সদস্য জমির উদ্দিন সরকার গত ১২ জুলাই মারা যান। ফলে একটি পদ শূন্য হয়। এর বাইরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী করার পর তিনি গত বৃহস্পতিবার দলীয় পদ ছেড়ে দিয়েছেন। এই কারণে স্থায়ী কমিটির মোট সদস্যসংখ্যার হিসাবেও পরিবর্তন এসেছে।
চারজন নতুন সদস্য যোগ করার আগে ১৩ জনের মধ্যে মির্জা ফখরুল ছিলেন। তার দলীয় পদ ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে নতুন চারজনসহ স্থায়ী কমিটিতে এখন কার্যকর সদস্যসংখ্যা ১৬ জন। তবে ১৯ সদস্যের কাঠামো অনুযায়ী আরও পদ পূরণের সুযোগ থাকছে।
নতুন চারজনের মধ্যে রুহুল কবির রিজভীর নাম বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত। তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আমানউল্লাহ আমানও বিএনপির পুরোনো ও পরিচিত নেতা। আর ইসমাইল জবিউল্লাহ বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এই চারজনের তালিকায় ফরহাদ হালিম ডোনারের অবস্থান তাই একেবারে আলাদা ধরনের। তিনি রাজনীতিবিদ, আবার চিকিৎসকও। তিনি পেশাজীবী সংগঠনের নেতা, আবার দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত। চিকিৎসা ও শিক্ষাঙ্গনের অভিজ্ঞতাও তার রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটি শুধু দল পরিচালনার জায়গা নয়। দেশের রাজনীতি, নির্বাচন, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দলের ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণে এই ফোরামের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় ডোনারের প্রবেশ তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনের স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন দলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
রাজনীতির দৃশ্যপটে তিনি হয়তো খুব বেশি আলোচিত মুখ নন। কিন্তু তার কাজের ক্ষেত্র বিস্তৃত। ক্যানসার চিকিৎসা থেকে চিকিৎসা শিক্ষা। পেশাজীবী সংগঠন থেকে দলীয় সংগঠন। নির্বাচন প্রস্তুতি থেকে উচ্চশিক্ষার প্রশাসন। নানা পথ পেরিয়ে এবার বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে জায়গা করে নিলেন অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার।
দলের নীতিনির্ধারণী টেবিলে এবার তার জন্যও একটি চেয়ার থাকল। সেই চেয়ারে বসে চিকিৎসক ডোনারকে এখন রাজনীতির আরও বড় দায়িত্ব সামলাতে হবে।
খবরটি শেয়ার করুন