ফাইল ছবি
একটি রাজনৈতিক দলের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময় সম্ভবত তখনই আসে, যখন তার শীর্ষ নেতৃত্ব কারাগারে, দ্বিতীয় সারির নেতারা মামলায় জর্জরিত এবং দলের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রক্ষমতায় দীর্ঘদিন ধরে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দেশের রাজনীতিতে গত দেড় দশকে বিএনপি অনেকটা সেই অবস্থার মধ্য দিয়েই গেছে। সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছিলেন লন্ডনে। মাঠের অসংখ্য নেতাকর্মী মামলা, গ্রেপ্তার ও হামলার মুখে ছিলেন। পরপর দুটি জাতীয় নির্বাচন বর্জন করেছে দলটি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েও ফল প্রত্যাখ্যান করেছে।
তারপরও দলটি ভাঙেনি। বরং ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনে ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ২০৯টি আসন নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিএনপি। প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে দলটি। পাঁচ দিন পর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারেক রহমান। এই প্রত্যাবর্তনের শিকড় অবশ্য আরও গভীরে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল সেনাসদস্যের অভ্যুত্থানে নিহত হন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার মৃত্যুর পর দলটি নেতৃত্বের বড় সংকটে পড়ে। এরশাদ আমলে বিএনপিতে একাধিকবার ভাঙনও দেখা যায়। কিন্তু ওই সময়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন দলটির জন্য নতুন রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে। জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে দলের প্রধান রাজনৈতিক মুখ হয়ে ওঠেন।
১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়। খালেদা জিয়া হন প্রধানমন্ত্রী। আবার ২০০১ সালে আওয়ামী লীগকে হারিয়ে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরে দলটি। কিন্তু ওই মেয়াদের শেষদিকে রাজনৈতিক সহিংসতা, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা এবং জঙ্গিবাদের উত্থান বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তিতে বড় চাপ তৈরি করে।
২০০৬-০৭ সালের নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে সংকট ছিল আরও বড় বাঁক। রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেয়। জরুরি অবস্থার মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। খালেদা জিয়াও কারাগারে যান। তারেক রহমানও গ্রেপ্তার হন এবং পরে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। সেখান থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির বড় পরাজয় হয়। আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। এরপর শুরু হয় বিএনপির সবচেয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার অধ্যায়।
২০১৪ সালের নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি না মানায় বর্জন করে বিএনপি। ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ফল প্রত্যাখ্যান করে। ২০২৪ সালের নির্বাচনও বর্জন করে দলটি।
এই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন। দলটির দাবি ছিল, লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দেওয়া হয়েছে। এই সংখ্যার সব স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নথিতে বিরোধী নেতাকর্মীদের ব্যাপক গ্রেপ্তার ও মামলার চিত্র উঠে এসেছে।
২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, বিএনপির হিসাবে তিন লাখের বেশি নেতাকর্মী ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ মামলায় জড়িয়েছিলেন। সংগঠনটি নিজের অনুসন্ধানে ঢাকার মাত্র ছয়টি থানায় করা ১৪টি মামলায় ৫১৯ জনের নাম পাওয়ার কথা জানায়। অনেক মামলায় বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাত ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছিল।
খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে প্রতীকী ঘটনা। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুর্নীতির মামলায় তার সাজা হয়। নির্বাচনের আগে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তখন জানায়, রায়ের আগে বিএনপির শত শত সমর্থককে আটক বা প্রতিরোধমূলক হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল।
২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বিরোধী প্রার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও ভয়ভীতির কথা উঠে আসে। সংগঠনটি জানায়, নির্বাচনের আগে বিএনপির হাজারো নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। এমনকি কিছু মামলায় মৃত ও বিদেশে থাকা ব্যক্তিদেরও আসামি করার অভিযোগ পাওয়া যায়। বিএনপির জন্য বড় প্রশ্ন ছিল, এত চাপের মধ্যেও দলটি ভাঙল না কেন?
এর একটি উত্তর পাওয়া যায় সংগঠনের ভেতরের পরিবর্তনে। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও পেশাগত পটভূমি থেকে আসা অনেক নেতা ছিলেন। তাদের কেউ কেউ দল ছেড়েছিলেন। কিন্তু গত দেড় দশকে বিএনপির তৃণমূলের বড় অংশ তৈরি হয়েছে ছাত্রদল, যুবদল ও অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের মধ্য দিয়ে। ফলে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্র ছিল বিএনপিই। দীর্ঘ দমন-পীড়ন সেই পরিচয়কে আরও শক্ত করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের ব্যাখ্যায়, বিএনপির মধ্যপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানও দলটির টিকে থাকার বড় কারণ। আওয়ামী লীগের বাইরে এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিপরীতে একটি বড় মধ্যপন্থী রাজনৈতিক জায়গা বিএনপির জন্য ছিল। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সাংগঠনিক ঐতিহ্যও দলটিকে সংকটে ধরে রাখে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বও এই সময়েই ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়। লন্ডনে থেকেও তিনি দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেন। বিএনপির জন্য এটি ছিল এক ধরনের নেতৃত্বের পরীক্ষা। দলের শীর্ষ নেতা দেশে নেই, চেয়ারপারসন কারাগারে—তবু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যায়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়া বিএনপির সামনে নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করে। বিএনপি সরকার পতনের একক কৃতিত্ব দাবি করতে পারেনি; ২০২৪ সালের আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল ছাত্র-জনতা। কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশে সবচেয়ে বড় সংগঠিত রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি দ্রুত মাঠ দখল করে।
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রায় ১৭ বছর পর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। রয়টার্স তার প্রত্যাবর্তনকে নির্বাচনের আগে বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখেছিল। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে ঢাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়।
কিন্তু দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিন পর আসে আরেক শোকের ঘটনা। ৩০ ডিসেম্বর মারা যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। স্বামীর মৃত্যুর পর যে নারী বিএনপিকে ভাঙন থেকে টেনে বের করে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত করেছিলেন, তার রাজনৈতিক জীবনের উত্তরাধিকার এবার পুরোপুরি এসে পড়ে তারেক রহমানের হাতে।
এরপরের গল্পটি নির্বাচনের। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯ আসন পায়। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী দলটি পেয়েছে ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯৯৪ ভোট। ভোটের হার ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ১৯৯১ সালে বিএনপি যেখানে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৪০ আসন পেয়েছিল, এবার সেখানে প্রায় অর্ধেক ভোট পেয়ে ২০৯ আসনে জয়ী হয়েছে। ভোট পড়েছে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
রয়টার্স এই ফলকে প্রায় দুই দশক পর বিএনপির ক্ষমতায় ফেরার পথ খুলে দেওয়া ‘সুইপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের বিশ্লেষণে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বাড়ানো, দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার নেতৃত্বে ২৫ মন্ত্রী ও ২৪ প্রতিমন্ত্রী নিয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়। নতুন মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ নেতাদের পাশাপাশি অনেক নতুন মুখও রাখা হয়।
বিএনপির এই প্রত্যাবর্তন তাই কেবল একটি নির্বাচনী বিজয় নয়। এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সহনশীলতারও ফল। দলটি আন্দোলনে সবসময় সফল হয়নি। শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়াও বিএনপির একক আন্দোলনে হয়নি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থেকেও তারা সাংগঠনিক কাঠামো ধরে রেখেছে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রেখেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মকে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
রাজনীতির নদীতে অনেক দলই ভাটার স্রোতে হারিয়ে যায়। বিএনপি হারায়নি। বরং দীর্ঘ দুঃসময়কে তারা সংগঠনের পরীক্ষাগারে পরিণত করেছে। এখন অবশ্য তাদের সামনে আরও বড় পরীক্ষা। বিরোধী দলে থেকে ক্ষমতায় ফেরার লড়াই তারা জিতেছে। ক্ষমতায় থেকে সেই প্রত্যাশার জবাব দেওয়া হবে তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।
কারণ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ক্ষমতায় ফেরা ইতিহাস তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষমতাকে গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও মানুষের আস্থায় পরিণত করাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে বিএনপির এই প্রত্যাবর্তন কতটা স্থায়ী হয়।
খবরটি শেয়ার করুন