ছবি: সংগৃহীত
প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকার পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় নিয়ে সরকার গঠন করে দলটি। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরপর কেটে গেছে ছয় মাস। এই সময়ে অর্থনীতি, প্রশাসন, সামাজিক নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সংঘাতের অভিযোগ এবং কয়েক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিএনপির নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে দেশকে স্থিতিশীল করতে সময় প্রয়োজন। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও বলেছেন, ক্ষমতায় থাকলে চ্যালেঞ্জ থাকবেই। এসব মোকাবিলা করেই এগোতে হবে। তবে দলের ভেতরেও এখন শৃঙ্খলা ও নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
গত ২৭ আগস্ট বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় আইনশৃঙ্খলা, সার ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সংসদ সদস্যরা প্রশ্ন তোলেন। ওই সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কোথাও কোথাও ‘মব কালচার’ বা দলবদ্ধভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে বিএনপির লোকজনও জড়িত বলে তিনি জানান। দলীয় নেতা-কর্মীদের এ বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি চাঁদাবাজির অভিযোগও সরকারের জন্য বড় অস্বস্তির কারণ। ২২ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চাঁদাবাজির সঙ্গে কোনো পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ১৭ আগস্ট ঢাকায় এক চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তারের কথাও জানান তিনি।
রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ উঠছে। ৪ আগস্ট মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে বিএনপির তিন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি ও মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগে এলাকাবাসী মানববন্ধন করেন। অভিযুক্ত এক নেতা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মাদক, সন্ত্রাস ও অবৈধ মাটিকাটার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চলছে।
বরগুনার তালতলীতেও চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ১ জুলাইয়ের ওই ঘটনায় অন্তত ১৪ জন আহত হন। পরে নৌবাহিনীর সদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তোলে।
শরীয়তপুরে ২৬ আগস্ট বিএনপির জেলা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লার বিরুদ্ধে তিন সাংবাদিককে মারধর ও কয়েকজনকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরদিন তিনি কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন। পুলিশ জানিয়েছে, দুই পক্ষের অভিযোগই যাচাই করা হচ্ছে।
মাদক নিয়েও বিএনপির স্থানীয় সংগঠনের ভেতর থেকে উদ্বেগের কথা এসেছে। ৭ আগস্ট চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক নিঝুম খান এক সভায় অভিযোগ করেন, দলের অনেক নেতা-কর্মী মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। তিনি স্থানীয় থানার কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন। তবে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, থানায় ওই সংখ্যক উপপরিদর্শক কর্মরতই নেই। ফলে তার বক্তব্যের ওই অংশ নিয়ে প্রশ্নও ওঠে।
অপরাধের অভিযোগের পাশাপাশি সংঘাতের ঘটনাও ঘটেছে। ১৭ আগস্ট ঢাকার চন্দ্রিমা উদ্যানে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় ১৫৫ জনকে আসামি করে মামলা হয়। পরে বিএনপির ৭৪ নেতা-কর্মী দুটি মামলায় আগাম জামিন পান।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে সরকারের সামনে বড় চাপ নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট। ৬ আগস্ট রয়টার্স জানায়, মহেশখালীর একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল আংশিক চালু হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। ওই টার্মিনাল ২১ জুলাইয়ের আগুনের পর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এতে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ ছিল।
আগস্টের মাঝামাঝি সংকট আরও তীব্র হয়। প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, ১৬ আগস্ট গ্যাসের অভাবে শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার খবর আসে। ২৮ আগস্ট ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা জানানো হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাসের ঘাটতির কারণে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছিল না। ১০ আগস্ট ঘাটতি ছিল সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট।
এ সংকট বিএনপির সংসদীয় দলের সভাতেও উঠে আসে। ২৭ আগস্ট সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা সংসদ সদস্যদের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, আগের সরকারের রেখে যাওয়া অবকাঠামো দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সংকট পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়।
কয়েক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড নিয়েও সরকারের ভেতরে-বাইরে আলোচনা হয়েছে। ফলে শুধু নীতি গ্রহণ নয়, মন্ত্রিসভার সদস্যদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতাও এখন সরকারের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হয়ে উঠেছে।
পররাষ্ট্রনীতিতেও বিএনপির সামনে জটিল সমীকরণ। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বললেও এখনো একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রকাশ পায়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে আগস্টজুড়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি এবং এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কের বড় অমীমাংসিত বিষয় হয়ে আছে। ভারতীয় পক্ষ অবশ্য তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহের কথা জানিয়েছে।
এর মধ্যেই সামনে এসেছে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ৭ আগস্ট এই চুক্তি করে। ২৫ আগস্ট রয়টার্স জানায়, বাংলাদেশও চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এতে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে।
দেশীয় বিশেষজ্ঞদের একটি অংশও তাড়াহুড়া না করার পরামর্শ দিয়েছে। প্রথম আলোর আয়োজিত আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও চুক্তির সুফল ও ঝুঁকি আগে পর্যালোচনা করা দরকার। সংসদ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শও এসেছে।
সব মিলিয়ে বিএনপির ছয় মাসের শাসনে একদিকে স্থিতিশীলতা ফেরানোর উদ্যোগ আছে। অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের আচরণ, আইনশৃঙ্খলা, বাজার, জ্বালানি ও প্রশাসন নিয়ে প্রশ্নও আছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বিরোধী দল হিসেবে দীর্ঘদিন আন্দোলন করা আর সরকার পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও বেড়েছে।
বিএনপির জন্য এখন মূল পরীক্ষা হবে দল ও সরকারের মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা রাখা। চাঁদাবাজি, দখল, মাদক বা সংঘর্ষের অভিযোগ উঠলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট কমানো এবং মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানো। আর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি নতুন প্রতিরক্ষা সমীকরণে বাংলাদেশ কোন অবস্থান নেবে, সেটিও স্পষ্ট করতে হবে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ক্ষমতায় ফেরা বিএনপির জন্য তাই ছয় মাস কেবল শুরু। সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা।
খবরটি শেয়ার করুন