ছবি: সংগৃহীত
বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় কোস্ট গার্ডের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত রাষ্ট্রীয় কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মাধ্যমে না করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করার পক্ষে মত দিয়েছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। তার মতে, কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ উঠলে একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্য কোনো সংস্থার তদন্ত নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তৈরি হয়।
সোমবার (৩১ আগস্ট) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে বার্গম্যান মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে এ মন্তব্য করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম ও রাজনৈতিক ঘটনাবলি নিয়ে লিখে আসছেন।
বার্গম্যান তার পোস্টে বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত অন্যান্য পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ থেকে এমন ধারণার জোরালো ভিত্তি রয়েছে যে, মিরাজ শেখকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সদস্যরা তুলে নিয়ে গেছেন এবং এরপর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। মন্ত্রীর দাবি, অন্য একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদন্তে ঘটনাটির পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং মিরাজ সুন্দরবনের অপরাধী চক্রগুলোর নিজেদের মধ্যে সংঘাতের শিকার হয়ে থাকতে পারেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বার্গম্যান বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে নাম প্রকাশ না করা একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদন্তের ফলাফলের মধ্যে যে বিরোধ দেখা যাচ্ছে, সেটিই স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে। তার মতে, একই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর একটি সংস্থার বিরুদ্ধে অন্য একটি সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করালে সেই তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করা কঠিন।
বার্গম্যান আরও লিখেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিখোঁজ হওয়ার পর তার ঘটনার তদন্ত কোনো নিরাপত্তা সংস্থার মাধ্যমে করা হতো, তাহলে সেই তদন্তেও সত্য উদ্ঘাটনের সম্ভাবনা কম থাকত। তার বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে।
মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকার বাসিন্দা মিরাজ সুন্দরবনে মাছ ধরার পাশাপাশি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাতেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় জয়মনির ঠোটা এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে থেকে সাদাপোশাকে থাকা দুজন তাকে ধরে নিয়ে যান। পরে তাকে কোস্ট গার্ডের স্পিডবোটে তুলে নেওয়া হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুনও দাবি করেছেন, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বামীকে কোস্ট গার্ডের স্পিডবোটে তুলে নিতে দেখেছেন। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যের কথা উল্লেখ করা হয়। তাদের সবাই মিরাজকে কোস্ট গার্ডের স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। পরে মিরাজের পরিবারের সদস্যরা কোস্ট গার্ডের দপ্তরে যোগাযোগ করলে প্রথমে তাকে অভিযানে থাকার কথা বলা হয় এবং পরে তার অবস্থান অস্বীকার করা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।
মিরাজের পরিবার ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি করে। পরে তার সন্ধান চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়। ১২ জুলাই হাইকোর্ট মিরাজ শেখকে ১৫ দিনের মধ্যে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তার বর্তমান অবস্থান, নিরাপত্তা এবং তাকে উদ্ধারে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।
এদিকে মিরাজকে আটক বা নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে কোস্ট গার্ড। বাহিনীটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১০ এপ্রিল জয়মনির ঘোল এলাকায় তাদের কোনো বিশেষ অভিযান ছিল না। মিরাজের বিরুদ্ধে সুন্দরবনকেন্দ্রিক বনদস্যু চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকার কথাও কোস্ট গার্ড জানিয়েছে। তবে মিরাজের পরিবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
মিরাজের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রও প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান করেছে। সংগঠনটির প্রতিনিধিরা মিরাজের পরিবারের সদস্য, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, সাংবাদিক, পুলিশ ও কোস্ট গার্ড কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের অনুসন্ধানে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও কোস্ট গার্ডের আনুষ্ঠানিক অস্বীকৃতির মধ্যে অসংগতি পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়। এ কারণে আইন ও সালিশ কেন্দ্র ঘটনাটির স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচও ঘটনাটির তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, মিরাজকে সর্বশেষ কোস্ট গার্ডের হেফাজতে দেখা যাওয়ার অভিযোগের কারণে ঘটনাটি গুরুতরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংস্থাটি এটিকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে প্রথম গুমের অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ২৯ আগস্ট বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে দেশে কোনো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি। মিরাজের ঘটনা নিয়ে স্বাধীনভাবে তদন্ত হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, তদন্তে বনদস্যুদের সঙ্গে মিরাজের সংশ্লিষ্টতা এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। তিনি মিরাজের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও ডিজিটাল তথ্য যাচাই করেছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি সুখবর ডটকমকে মুঠোফোনে বলেন, এসব তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পথনির্দেশনা পাওয়া যায়। তার মতে, কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে একই বাহিনী বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে তদন্ত করানো কঠিন। তাই তদন্তের দায়িত্ব স্বাধীন কোনো সংস্থার হাতে দেওয়া প্রয়োজন।
নূর খান আরও বলেছেন, গুমের মতো জটিল মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত সাধারণ পুলিশি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে কার্যকর ফল পাওয়া কঠিন। তার মতে, স্বাধীন তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তলব ও জিজ্ঞাসাবাদ, বিভিন্ন স্থানে পরিদর্শন এবং নথি ও ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে।
গুমের অভিযোগের তদন্ত কোন সংস্থার হাতে থাকবে, তা নিয়েও বর্তমানে নীতিগত বিতর্ক রয়েছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের প্রস্তাবিত আইনে গুমের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ নিয়ে মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে স্বাধীন তদন্তের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
২৯ আগস্টে ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নূর খান লিটন বলেন, গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব কোনোভাবেই অভিযুক্ত বাহিনীর অধীন থাকা উচিত নয়। তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অধীনে, পুলিশের বাইরে কোনো স্বাধীন সংস্থা বা পৃথক কোনো তদন্তব্যবস্থার মাধ্যমে তদন্তের পক্ষে মত দেন। একই অনুষ্ঠানে আইনজীবী সারা হোসেনও গুমের ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র তদন্তব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
মিরাজ শেখের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তার অবস্থান। তিনি যদি কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত থেকেও থাকেন, তাহলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় এনে আদালতে হাজির করার দাবি করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। আর যদি তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করে থাকে, তাহলে তার অবস্থান ও আটক করার কারণ পরিবারকে জানানো এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ফলে মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় কার দাবি সত্য, তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন এমন একটি তদন্ত, যেটির ওপর অভিযোগকারী পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী, অভিযুক্ত সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা থাকবে। ডেভিড বার্গম্যানের বক্তব্যের মূল প্রশ্নটিও সেখানেই—অভিযোগ যদি রাষ্ট্রের কোনো নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরের আরেকটি সংস্থার তদন্ত কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে। মিরাজের সন্ধান ও ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের নিরপেক্ষ সমাধানই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
খবরটি শেয়ার করুন