ফাইল ছবি
যে দিনটির কথা কেউ ভাবতে চাননি, শেষ পর্যন্ত সেই দিনটি এসেই গেল। আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর দেখা যাবে না লিওনেল মেসিকে। ৩৯ বছর বয়সে জাতীয় দলকে বিদায় বলেছেন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকাদের একজন।
সোমবার, ৩১ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাতে লেখা একটি আবেগঘন চিঠি প্রকাশ করেন মেসি। সঙ্গে ছিল একটি ভিডিও বার্তা। সেই চিঠিতে তিনি জানিয়ে দেন, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে আর খেলবেন না। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো ২০ বছরের বেশি সময়ের এক অধ্যায়।
রয়টার্স বলছে, আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষ ম্যাচ ছিল ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল। ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচের দুই দিন পর, ২১ জুলাই, মেসি নিজের বিদায়ের চিঠি লিখে ফেলেছিলেন। তবে তখন সেটি প্রকাশ করেননি। তারপর আসে জীবনের আরও বড় এক আঘাত।
৮ আগস্ট মারা যান মেসির বাবা হোর্হে মেসি। রোজারিওর একটি হাসপাতালে ৬৮ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। ইউরোনিউজ জানিয়েছে, বাবার মৃত্যুর পর মেসি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও গভীর অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছিলেন। সেই শোকের মধ্যেই মেসির মনে আরও পরিষ্কার হয়ে যায় সিদ্ধান্তটি।
বিদায়ী চিঠির শেষ দিকে মেসি লিখেছেন, ২১ জুলাই, বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিন পরই তিনি কথাগুলো লিখেছিলেন। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর তিনি সিদ্ধান্তের বিষয়ে ‘আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত’ হয়েছেন। ফিফাও মেসির অবসরের খবর প্রকাশ করে জানিয়েছে, ৮ আগস্ট বাবার মৃত্যুর পরই তিনি সেই চিঠি প্রকাশ করেন।
অর্থাৎ বাবার মৃত্যু মেসির অবসরের একমাত্র কারণ নয়। সিদ্ধান্তের বীজ রোপিত হয়েছিল বিশ্বকাপ ফাইনালের পরই। কিন্তু হোর্হে মেসির মৃত্যু সেই সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত করে দেয়।
হোর্হে ছিলেন মেসির জীবনের ছায়ার মতো। ছোটবেলা থেকে ছেলের ফুটবলযাত্রার সঙ্গে ছিলেন তিনি। রোজারিওর ছোট্ট মাঠ থেকে বার্সেলোনার মহাতারকা হয়ে ওঠা, এরপর আর্জেন্টিনার অধিনায়কত্ব—প্রতিটি বাঁকে ছিলেন বাবা। মেসির সাফল্যের গল্পে তাই হোর্হের উপস্থিতি নীরব হলেও গভীর। ৮ আগস্ট সেই মানুষটিই চলে গেলেন।
এর আগে ১২ আগস্ট বাবাকে নিয়ে একটি আবেগঘন চিঠি লিখেছিলেন মেসি। লা নাসিওন জানিয়েছিল, সেই লেখায় বিশ্বকাপের সময়কার স্মৃতি এবং বাবাকে হারানোর শোকের কথা তুলে ধরেছিলেন তিনি। বাবার মৃত্যুর পর ফুটবল চালিয়ে যাবেন কি না, সে প্রশ্নও তখন তার মনে জেগেছিল। তবে মেসির বিদায়ের গল্পে শুধু শোক নেই। আছে সময়ের হিসাবও।
মেসির বয়স এখন ৩৯ বছর। ফুটবল তাকে অনেক কিছু দিয়েছে। তিনিও ফুটবলকে দিয়েছেন তার চেয়েও বেশি। কিন্তু শরীর ও মন—দুটিই একসময় সীমারেখা টেনে দেয়। ২০ বছরের বেশি সময় জাতীয় দলের হয়ে খেলার পর মেসি বুঝেছেন, এবার হয়তো থামার সময়।
নিজের চিঠিতে তিনি বলেছেন, সিদ্ধান্তটি তাকে ভেতর থেকে কষ্ট দিয়েছে। এখনো দিচ্ছে। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছেন, সময় এসে গেছে। আরেকটি কথা বলেছেন তিনি। সেটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় দলের হয়ে তিনি নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিয়েছেন। এখন তার মনে হচ্ছে, দেওয়ার মতো আর কিছু অবশিষ্ট নেই। এই অনুভূতিই হয়তো মেসির বিদায়ের সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যা।
জাতীয় দলের হয়ে খেলা ক্লাব ফুটবলের মতো নয়। সেখানে প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোটি মানুষের আবেগ। একটি গোল শুধু গোল নয়। একটি হার শুধু হার নয়। মেসি এই চাপ বহন করেছেন দুই দশকের বেশি সময়। শুরুটা অবশ্য এত সুন্দর ছিল না।
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে অভিষেকের পর তাকে প্রায়ই দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। প্রত্যাশার ভার ছিল বিপুল। অথচ জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় সাফল্য পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বহু বছর।
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরপর হার। ২০১৬ সালে চিলির কাছে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর তো অভিমান করে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন মেসি। পরে ফিরে আসেন। সেই প্রত্যাবর্তনের পর বদলে যায় গল্প।
২০২১ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। মেসির হাতে ওঠে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। পরের বছর ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা জেতে আর্জেন্টিনা। তারপর ১৮ ডিসেম্বর ২০২২।
কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। মেসির হাতে ওঠে সেই ট্রফি, যেটি নিয়ে তার ক্যারিয়ারজুড়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ছিল। শৈশবের স্বপ্ন পূরণ হয়। ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনার ভারও যেন সেদিন পুরোপুরি সরে যায়। ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। মেসির নেতৃত্বে দলটি হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম সফল জাতীয় দল।
রয়টার্সের হিসাবে, জাতীয় দলের হয়ে মেসির শেষ পরিসংখ্যান ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল। দুটিই আর্জেন্টিনার রেকর্ড। তিনি আটবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা এবং ফিনালিসিমা জিতেছেন। কিন্তু শেষটাও হলো শিরোপা দিয়ে নয়।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হার দিয়ে শেষ হলো মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। হয়তো তিনি চেয়েছিলেন আরেকটি বিশ্বকাপ দিয়ে বিদায় নিতে। হয়নি। তবু তার বিদায়কে ব্যর্থতার গল্প বলা যাবে না। বরং এটি এমন এক গল্প, যার শেষ অধ্যায়ে এসে সব হিসাব মিলে গেছে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট মেসির অবসরকে দুই দশকের বেশি সময়ের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে। পত্রিকাটি তার বিদায়ী বার্তার সেই কথাটিও তুলে ধরেছে, যেখানে মেসি বলেছেন, অধ্যায়গুলো একে একে শেষ হয়ে আসছে। এই অধ্যায়টি তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে।
মেসির বিদায়ের আরেকটি কারণ প্রজন্মের পরিবর্তন। তার পরে আসছেন একদল তরুণ। নিকো পাজ, ভ্যালেন্তিন বারকোসহ আরও অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়ার অপেক্ষায়। মেসি নিজেও মনে করেন, তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।
এই জায়গাতেই একজন কিংবদন্তির মহত্ত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি শুধু নিজের জায়গা আঁকড়ে থাকেননি। নতুনদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছেন।
মিন্টের বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে বিষয়টি। মেসি ২১ জুলাই চিঠিটি লেখার সময়ই জানিয়েছিলেন, তার মনে হচ্ছে তিনি নিজের সবটুকু দিয়ে ফেলেছেন এবং নতুন প্রজন্মের জন্য জায়গা তৈরি করার সময় এসেছে। এ যেন এক প্রদীপের শেষ আলো। নিভে যাওয়ার আগে আরও একবার চারপাশ আলোকিত করে যাওয়া।
আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সির সঙ্গে মেসির নাম এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে তাকে ছাড়া সেই জার্সিকে ভাবাও কঠিন। একসময় যে জার্সি পরেছিলেন ম্যারাডোনা, পরে সেটিই হয়ে উঠেছিল মেসির পরিচয়। এখন সেই জার্সি নতুন কারও অপেক্ষায়।
তবে মেসির রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার এত সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তিনি শুধু গোলের রেকর্ড রেখে যাচ্ছেন না। রেখে যাচ্ছেন একটি সময়ের স্মৃতি। ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। অপমান থেকে গৌরবে ফেরার গল্প। কান্না থেকে বিশ্বকাপ জয়ের গল্প।
একসময় জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মেসিকে দেখে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা স্বপ্ন দেখতেন। এখন তারা সেই স্বপ্নের স্মৃতি বয়ে বেড়াবেন। ৩১ আগস্টের সেই চিঠিতে মেসি বলেছেন, এখন থেকে তিনি মাঠের বাইরে থেকে জাতীয় দলকে সমর্থন করবেন। অর্থাৎ জার্সি বদলাবে। ভূমিকা বদলাবে। কিন্তু ভালোবাসা বদলাবে না।
মাঠে আর থাকবেন না মেসি। থাকবে তার ছায়া। থাকবে ১২৫ গোলের স্মৃতি। থাকবে ২০ বছরের লড়াই। থাকবে ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা। থাকবে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ। থাকবে অশ্রুসিক্ত বিদায়। আর থাকবে একটি প্রশ্ন—মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনা কেমন হবে? সময়ের উত্তর সময়ই দেবে।
শুধু এটুকু নিশ্চিত। আর্জেন্টিনার ফুটবলে মেসির আগে যেমন একটি যুগ ছিল, মেসির পরেও থাকবে। কিন্তু মেসির যুগটি আর ফিরে আসবে না। কারণ কিছু খেলোয়াড় মাঠে খেলেন। আর কিছু খেলোয়াড় একটি দেশের ফুটবল-ইতিহাস হয়ে যান। লিওনেল মেসি সেই দ্বিতীয় দলের মানুষ।
খবরটি শেয়ার করুন