রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** দ্বিতীয় জানাজা শেষে গন্ধমতিতে চিরনিদ্রায় অপ্রতিম, দুপুরে পুলিশের সংবাদ সম্মেলন *** ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ দল *** মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছিল: ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী *** উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে ১,৩৯৯টি ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে: গবেষণা *** হুতিদের মোকাবিলায় এবার সৌদির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা তুরস্কের! যুদ্ধ করবে কি? *** কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ *** তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি *** জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান *** মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের *** আওয়ামী লীগ-জামায়াত এক হয়েও বিএনপির কিছুই করতে পারেনি: এমপি চাঁদ

সুখবর এক্সপ্লেইনার

ফিরল তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা: পরবর্তী সরকার কি নিরপেক্ষ, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হবে?

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৩:৩৮ অপরাহ্ন, ৯ই জুলাই ২০২৬

#

দেশের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে নতুন এক মোড় এসেছে। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের পথ কার্যত উন্মুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে গণভোটের বিধানও ফিরে আসছে। সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদও বাতিলই থাকছে। ফলে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যেসব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তার কয়েকটি আর বহাল থাকল না।

আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা তিনটি আপিল খারিজ করে দেন। এর ফলে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকে। আদালতের এই সিদ্ধান্তকে অনেক আইনজ্ঞ দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রায় হিসেবে দেখছেন।

রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, হাইকোর্টের রায় বহাল থাকায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, গণভোট এবং সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল থাকল।

একই দিনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান আরও এক ধাপ এগিয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেন। তিনি বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। তার ভাষায়, এটি সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলনের ফল।

এই দুটি বক্তব্যের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, পরবর্তী তত্বাবধায়ক সরকার কি সত্যিই নিরপেক্ষ হবে? আগামী নির্বাচন কি সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে? দীর্ঘদিনের নির্বাচন-সংকট কি এবার কাটবে?

দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল রাজনৈতিক সংকট থেকে। ১৯৯৬ সালে তীব্র আন্দোলনের মুখে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনের সময় একটি নির্দলীয় সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এবং নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে ভোট আয়োজনের সুযোগ দেবে।

১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। এই তিনটি নির্বাচন দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছিল। যদিও ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় দীর্ঘ প্রায় দুই বছর দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার পর এই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। সরকার তখন যুক্তি দিয়েছিল, সর্বোচ্চ আদালতের আগের একটি রায়ে এই ব্যবস্থা অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছিল। তাই নির্বাচিত সরকারের অধীনেই নির্বাচন হওয়া উচিত।

কিন্তু বিরোধী দলগুলো এই সিদ্ধান্ত মানেনি। বিশেষ করে বিএনপি শুরু থেকেই দাবি করে আসছিল, দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। এরপর প্রায় এক যুগ ধরে দেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে ওঠে নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো।

২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপিসহ বড় বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশি-বিদেশি মহলে নানা প্রশ্ন ওঠে। এরপর নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারের দাবি আরও জোরালো হয়।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। পরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞার কারণে অংশ নিতে পারেনি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের দলগুলোও নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়নি।

এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনকে আরও অংশগ্রহণমূলক করার প্রশ্ন নতুন গুরুত্ব পায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের বড় একটি অংশ নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজনীয়তার কথা আবারও সামনে আনতে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দুটি রিট করা হয়। ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসংক্রান্ত বিধান অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করা হয়। সংবিধানের ৭(ক), ৭(খ) ও ৪৪(২) অনুচ্ছেদও বাতিল ঘোষণা করা হয়।

হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি আপিল করা হয়েছিল। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার ব্যক্তি, নওগাঁর মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আপিল করেন। আপিল বিভাগের সর্বশেষ রায়ে সেই আপিলগুলো খারিজ হয়ে গেছে।

জামায়াতের পক্ষে শুনানি করা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছেন, চারটি বিষয় এখন অসাংবিধানিক হিসেবেই বহাল থাকল। এর মধ্যে রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, গণভোট, ৭(ক) ও ৭(খ), এবং ৪৪(২)। অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিসংক্রান্ত বাকি বিষয়গুলো সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের এই রায়ের রাজনৈতিক গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সাংবিধানিক গুরুত্বও। কারণ, আদালত সরাসরি নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

সাবেক আইন কমিশনের সদস্য এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু আইনি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐকমত্য, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন, নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াকে বিশ্বাসযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে বলেছেন, দেশের নির্বাচনব্যবস্থার মূল সংকট আস্থার সংকট। যে ব্যবস্থাই থাকুক না কেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি তার ওপর আস্থা না রাখে, তাহলে সংকট থেকেই যাবে।

অন্যদিকে সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের কেউ কেউ মনে করেন, নির্বাচনকালীন সরকারের ধরন গুরুত্বপূর্ণ হলেও নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন যদি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাহলে নির্বাচন আরও গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের রায়ের ফলে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। কারণ, আদালত আইনি পথ খুলে দিয়েছে। কিন্তু একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক সমঝোতার বিকল্প নেই।

বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অংশগ্রহণ। দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে আগামী নির্বাচন কতটা সর্বজনগ্রাহ্য হবে, তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাবে। আবার যদি আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তন ঘটে, তাহলে নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।

এদিকে বিএনপি বহু বছর ধরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছে। এখন সেই দাবি বাস্তবায়নের পথে এগোনোয় দলটির ওপরও বাড়তি দায়িত্ব তৈরি হয়েছে। তারা নির্বাচনকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে কী ধরনের প্রস্তাব দেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আদালতের রায়ের পর সংসদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিসংক্রান্ত বহু বিষয় সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। ফলে নতুন সংসদ চাইলে সংবিধানের আরও কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনতে পারবে।

দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট বহু পুরোনো। সেই সংকট নিরসনে বিভিন্ন সময়ে নানা সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কখনও তত্ত্বাবধায়ক সরকার, কখনও নির্বাচন কমিশন সংস্কার, কখনও সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান এখনও আসেনি।

সর্বশেষ রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আবারও সাংবিধানিক ভিত্তি পেল। তবে এটিই শেষ কথা নয়। এই ব্যবস্থার কাঠামো কী হবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, মেয়াদ কতদিন হবে, ক্ষমতার সীমা কোথায় থাকবে এবং নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী হবে—এসব বিষয়ে প্রয়োজন হবে স্পষ্ট আইনি বিধান ও রাজনৈতিক ঐকমত্য।

সব মিলিয়ে আপিল বিভাগের এই রায় দেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এখন নজর থাকবে রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে। তারা কি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক, প্রতিযোগিতামূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ তৈরি করতে পারবে, নাকি পুরোনো অবিশ্বাস আবারও নতুন সংকট সৃষ্টি করবে—সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী গণতান্ত্রিক যাত্রাপথ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250