ছবি: সংগৃহীত
এক শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। তবু ময়মনসিংহের আকাশে, পুরোনো ভবনের বারান্দায়, শতবর্ষী বৃক্ষের ছায়ায় বা ভগ্নপ্রায় জমিদারবাড়ির নীরব দেয়ালে যেন এখনো ভেসে আসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদচারণার প্রতিধ্বনি। ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বকবির সেই সফর কেবল একটি সৌজন্য ভ্রমণ ছিল না; এটি ছিল এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়। কিন্তু শতবর্ষ পূর্তির এই সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে, তার পদচিহ্ন বহন করা অধিকাংশ স্থানই আজও অচিহ্নিত, অবহেলিত কিংবা বিস্মৃতির আড়ালে।
সুখবর ডটকমের পক্ষ থেকে ঢাকায় বসে মুঠোফোনে ময়মনসিংহের গবেষক, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে এসব স্থান সংরক্ষণের দাবি উঠলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই সীমিত। ফলে নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ জানেই না, একদিন এই শহরের পথেই হেঁটেছিলেন নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
লেখক ও গবেষক স্বপন ধর বলেন, ময়মনসিংহ শহরের আলেকজান্ডার ক্যাসেল, শশী লজ, বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সিটি কলেজিয়েট স্কুল, আনন্দমোহন কলেজ, ব্রাহ্মমন্দির এবং ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ি জমিদারবাড়ি—এসবই রবীন্দ্রনাথের সফরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
তার ভাষায়, “ময়মনসিংহের বাইরের কোনো মানুষ চাইলে আজও সহজে বুঝতে পারবেন না, কোথায় কোথায় কবির স্মৃতি লুকিয়ে আছে। বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে, উদ্যোগের কথাও শোনা গেছে, কিন্তু বাস্তবে খুব বেশি কিছু হয়নি।”
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ ময়মনসিংহে পৌঁছান। সে সময় মুক্তাগাছার জমিদার পরিবারের উদ্যোগে আলেকজান্ডার ক্যাসেলের প্রাঙ্গণে একটি বিশাল বটগাছের নিচে তাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় মানুষের কাছে সেই স্থান এখন ‘রবীন্দ্র বটমূল’ নামে পরিচিত। ইতিহাসের এই স্মারকস্থল আজও রয়েছে, কিন্তু সেখানে এমন কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই, যা একজন দর্শনার্থীকে জানিয়ে দেবে—এই জায়গাতেই একদিন বিশ্বকবি দাঁড়িয়েছিলেন।
আলেকজান্ডার ক্যাসেলও যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চৌদ্দ কক্ষবিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক ভবন বহু বছর সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কলেজের অধ্যক্ষ রিজিয়া সুলতানা সুখবর ডটকমকে বলেন, প্রায় তিন মাস আগে ভবনটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তার আশা, এখন ভবনটির সংরক্ষণ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরার উদ্যোগ আরও জোরদার হবে।
রবীন্দ্রনাথের সেই সফরে ময়মনসিংহ পৌরসভা, নাগরিক সমাজ, মহিলা সমিতিসহ নানা সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাকে সংবর্ধনা জানিয়েছিল। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, সে সময় ময়মনসিংহ ছিল পূর্ববঙ্গের অন্যতম প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ফলে কবির আগমনকে ঘিরে শহরে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল।
সেই সফরের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ি। শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্র এবং তৎকালীন জমিদার প্রমোদ চন্দ্র রায় চৌধুরীর আমন্ত্রণে ১৯ ফেব্রুয়ারি সেখানে যান রবীন্দ্রনাথ। কাছারিবাড়ির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জমিদার প্রতীকীভাবে তার হাতে ‘সোনার চাবি’ তুলে দিয়েছিলেন। সে সময়ের সংবাদপত্রেও এই আয়োজনের উল্লেখ পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং জ্ঞান, সংস্কৃতি ও আলোকিত সমাজ নির্মাণের প্রতীকী প্রকাশ।
কিন্তু শতবর্ষ পরে সেই কাছারিবাড়ির বর্তমান অবস্থা হতাশাজনক। আঠারবাড়ি ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শহিদুর রহমান বলেন, নতুন ভবনে পাঠদান শুরু হওয়ার পর প্রায় পাঁচ বছর ধরে ঐতিহাসিক ভবনটিতে আর নিয়মিত ক্লাস হয় না। বর্ষাকালে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় ভবনটি ধীরে ধীরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের রবীন্দ্রসংগীতের শিক্ষক মো. মামুনুল ইসলাম মনে করেন, রবীন্দ্রনাথের ময়মনসিংহ সফর কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, এটি একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। তিনি সুখবর ডটকমকে বলেন, “রবীন্দ্রনাথকে কেবল স্মরণসভায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তার সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও মানবতাবাদী চিন্তার নিয়মিত চর্চার মধ্য দিয়েই তার প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো সম্ভব।”
ময়মনসিংহ অঞ্চলের পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটির সদস্যসচিব ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, বাংলার জাতীয়তাবাদী চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক দর্শনের বিকাশে রবীন্দ্রনাথের অবদান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তার ভাষায়, “যে স্থানগুলো বিশ্বকবির স্মৃতি বহন করছে, সেগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় থেকে বঞ্চিত হবে।”
বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নাসিমা আক্তার জানান, বিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের সফরের স্মৃতি বহন করে এমন কোনো ফলক নেই। তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি স্মৃতিফলক স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা জানতে পারে, একসময় এই প্রতিষ্ঠানেও এসেছিলেন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, আলেকজান্ডার ক্যাসেল ও শশী লজ অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত হলেও রবীন্দ্রনাথের সফরের তথ্য তুলে ধরার মতো কোনো স্থায়ী স্মারক এখনো স্থাপন করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশ্বের নানা দেশে সাহিত্যিকদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানকে সাংস্কৃতিক পর্যটনের অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। কবির বাড়ি, ব্যবহৃত কক্ষ, ভ্রমণস্থল কিংবা কোনো ঐতিহাসিক বৃক্ষও সেখানে সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়। রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতন কিংবা জোড়াসাঁকো যেমন আন্তর্জাতিক আগ্রহের কেন্দ্র, তেমনি বাংলাদেশের শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরের স্মৃতিধন্য স্থানগুলোও দীর্ঘদিন ধরে গবেষক ও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে আসছে। সেই তুলনায় ময়মনসিংহের স্মৃতিচিহ্নগুলো এখনো প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও পরিকল্পনার অপেক্ষায়।
এক শতাব্দী আগে যে সফর ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে নতুন আলো জ্বেলেছিল, সেই আলোর স্মৃতি আজও পুরোপুরি নিভে যায়নি। তবে সময়ের ধুলো যদি আরও জমতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের কোনো এক প্রজন্ম হয়তো শুধু বইয়ের পাতায় পড়বে—একদিন রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন ময়মনসিংহে। অথচ তার পদচিহ্ন যেখানে রয়ে গেছে, সেই স্থানগুলোই তখন হয়তো আর ইতিহাসের ভাষা বলতে পারবে না।
খবরটি শেয়ার করুন