ছবি: সংগৃহীত
দেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক পরিসরে জনমত গঠন ও কূটনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্ব নতুন নয়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন, শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়া এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক মহলে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের পক্ষে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আইনজীবী স্টিভেন পাওলসের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং তা নিয়ে দলটির আন্তর্জাতিক প্রচারণার কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাপ্তাহিক ব্লিটজের সম্পাদক সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী সম্প্রতি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক ও মিডিয়া-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের ‘আনাড়িপনা ও অযোগ্যতার’ কারণে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও রাজনৈতিক উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথাযথ প্রচার পাচ্ছে না।
তার পোস্টে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে লন্ডনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের আইনজীবী স্টিভেন পাওলস আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউটরের কাছে আওয়ামী লীগের পক্ষে একটি যোগাযোগপত্র জমা দেন। সেখানে জুলাই-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক সহিংসতা, হত্যা, আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে তদন্তের আহ্বান জানানো হয়। ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্স তাদের ওয়েবসাইটে বিষয়টি প্রকাশও করে।
ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের বিবৃতিতে বলা হয়, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত কিছু ঘটনা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
এরপর থেকে আবারও আলোচনায় আসেন স্টিভেন পাওলস। তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্কের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাওলস জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখিত প্রায় ১ হাজার ৪০০ মৃত্যুর হিসাবকে ‘অত্যন্ত ভুল’ এবং ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে দাবি করেছেন।
অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। সংস্থাটি শতাধিক সাক্ষাৎকার, ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত এবং বিভিন্ন উৎসের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ অনুমান প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অধিকাংশ নিহত ব্যক্তি নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন বলে যুক্তিসংগত ভিত্তি পাওয়া গেছে।
সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর মতে, স্টিভেন পাওলসের সাম্প্রতিক চিঠিটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সাড়া পায়নি। তার দাবি, যদি লন্ডন বা নিউইয়র্কে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হতো এবং বিষয়টিকে আরও কৌশলগতভাবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হতো, তাহলে তা পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে বড় আকারে প্রচার পেতে পারত।
তবে কোনো কোনো গণযোগাযোগ বিশ্লেষক অবশ্য বিষয়টিকে কিছুটা ভিন্নভাবে দেখছেন। তারা বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের বার্তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জায়গা পাবে কি না, সেটি শুধু সংবাদ সম্মেলনের ওপর নির্ভর করে না। অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা, তথ্য-প্রমাণ, আন্তর্জাতিক আগ্রহ এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট—সবকিছু মিলিয়েই সংবাদমূল্য তৈরি হয়।
তাদের মতে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক প্রচারণা দুর্বল হতে পারে, কিন্তু এটাও সত্য যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এখন ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কসহ বহু বড় ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত। ফলে বাংলাদেশ-সংক্রান্ত সব দাবি সমান গুরুত্ব পাবে, এমন আশা বাস্তবসম্মত নয়।
মিডিয়া কৌশল বিশ্লেষকেরা মনে করেন, আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগে শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বা আইনি চিঠি যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো আখ্যান প্রতিষ্ঠা করতে হলে গবেষণা প্রতিবেদন, তথ্যচিত্র, মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের ব্রিফিং এবং ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন হয়।
তারা বলছেন, বিশ্ব রাজনীতিতে এখন ‘ন্যারেটিভ ওয়ার’ বা আখ্যানের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। যে পক্ষ তথ্য ও যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে পারে, তারাই জনমত গঠনে এগিয়ে থাকে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, স্টিভেন পাওলসের সাম্প্রতিক চিঠি নিয়ে বিতর্কের মধ্য দিয়ে মূলত দুটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রথমত, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় প্রকৃত নিহতের সংখ্যা কত ছিল এবং তা কীভাবে নির্ধারণ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে।
জাতিসংঘের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে উত্থাপিত পাল্টা দাবির মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। একদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর তাদের অনুসন্ধানে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কথা বলেছে। অন্যদিকে স্টিভেন পাওলস ও আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতারা সেই অনুসন্ধানের পদ্ধতি, তথ্যসূত্র এবং উপসংহার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
ফলে বিষয়টি কেবল একটি আইনি বা রাজনৈতিক বিতর্কেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি আন্তর্জাতিক জনমত, মানবাধিকার অনুসন্ধান এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের কার্যকারিতা নিয়েও নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর ফেসবুক পোস্ট সেই আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কোন আখ্যান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা পাবে, তা নির্ভর করবে তথ্য-প্রমাণ, স্বাধীন তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক মহলের মূল্যায়নের ওপর।
অনেকের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও মিডিয়া কৌশলের কিছু সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে দলটির বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন এবং বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সমালোচনামূলক প্রতিবেদনের জবাবে একটি সুসংগঠিত ও ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কাঠামো গড়ে তুলতে দলটি প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি বলে সমালোচকেরা মনে করেন।
এই প্রেক্ষাপটে সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর পর্যবেক্ষণকে অনেকেই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু আইনি চিঠি পাঠানো বা বিবৃতি প্রদান যথেষ্ট নয়; বরং সেই তথ্যকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, নীতিনির্ধারক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সামনে পেশ করার জন্য একটি পেশাদার যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়। বিশ্বের বড় রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত এ ধরনের কাজের জন্য বিশেষায়িত মিডিয়া সেল, জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং আন্তর্জাতিক লবিং টিম ব্যবহার করে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক মিডিয়া বিভাগ আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হয়ে উঠতে না পারলে দলটির পক্ষে নিজেদের অবস্থান বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে রাজনৈতিক বিতর্ক এখন অনেকাংশেই তথ্য, গবেষণা এবং গণমাধ্যমভিত্তিক আখ্যানের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে কোনো দাবি উত্থাপন করলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলোচনায় আসে না; বরং দাবির পক্ষে তথ্য-প্রমাণ, নথিপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য উপস্থাপনা কৌশল প্রয়োজন হয়।
কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, স্টিভেন পাওলসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত আইনজীবীর সম্পৃক্ততা আওয়ামী লীগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারত। কিন্তু সেই উদ্যোগকে ঘিরে যদি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিস্তৃত আলোচনা সৃষ্টি না হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনে যোগাযোগ কৌশলের দুর্বলতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলন, সাংবাদিক ব্রিফিং, নীতিনির্ধারকদের কাছে তথ্যপত্র সরবরাহ এবং গবেষণাভিত্তিক ডকুমেন্টেশন—এসব ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া দরকার ছিল।
এছাড়া বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল কূটনীতি ও অনলাইন জনমত গঠনের গুরুত্বও অনেক বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক পডকাস্ট, নীতিবিষয়ক ওয়েবিনার এবং বৈশ্বিক সংবাদ প্ল্যাটফর্মগুলো এখন রাজনৈতিক বার্তা প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অনেকের মতে, আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক মিডিয়া টিমকে এসব ক্ষেত্রেও আরও দক্ষ ও আধুনিক পদ্ধতিতে কাজ করতে হবে। শুধু দলীয় সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বার্তা প্রচার না করে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের জন্য উপযোগী ভাষা, তথ্য ও উপস্থাপনা কৌশল তৈরি করাও জরুরি।
পর্যবেক্ষকদের একটি অংশের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এখন তথ্যযুদ্ধ ও আখ্যান-প্রতিযোগিতা একটি বাস্তবতা। ফলে যে কোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্য শক্তিশালী আন্তর্জাতিক মিডিয়া নেটওয়ার্ক, গবেষণানির্ভর প্রচারণা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক মিডিয়া বিভাগকে আরও পেশাদার, সমন্বিত এবং কার্যকর রূপ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
তাদের মতে, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে হলে দলটিকে বর্তমান কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করে আধুনিক ও দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
খবরটি শেয়ার করুন