ছবি: সংগৃহীত
যখন তথ্যভিত্তিক গণমাধ্যমে আগুন দেওয়া হয়, তখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্রের ভিত্তি। মতের বৈচিত্র্য, ভিন্নমতের সহনশীলতা, যুক্তি-তর্কের চর্চা এবং প্রতিবাদের অধিকার—সবই একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়ে। এমনই এক প্রেক্ষাপটে মাহফুজ আনাম তার কলামে গণমাধ্যমে হামলার ঘটনাকে গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে তুলে ধরেছেন।
আজ শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) 'হোয়েন ইন্ডিপেনডেন্ট নিউজপেপারস বার্ন, সো ডাজ ডেমোক্রেসি' শিরোনামে ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত কলামে মাহফুজ আনামের এই বক্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্কও তৈরি হয়েছে—বিশেষত ঘটনাপ্রবাহের উপস্থাপন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের অনুপস্থিতি নিয়ে।
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি পত্রিকা—দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। মাহফুজ আনাম তার লেখায় এই ঘটনাকে পূর্বপরিকল্পিত ও সংগঠিত আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এটি কেবল দুটি সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে হামলা নয়, বরং গণতন্ত্রকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্র।
কলামে তিনি দাবি করেন, এই দুটি পত্রিকা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—উভয় পক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কাজ করেছে। দুর্নীতি, দমননীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, হেফাজতে মৃত্যু—এসব বিষয়ে তারা ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে পত্রিকাগুলোর ওপর নানা চাপ, মামলা, বিজ্ঞাপন বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক আক্রমণের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে সমালোচকরা বলছেন, মাহফুজ আনামের লেখার শুরুতে এমন একটি আবহ তৈরি হয়েছে, যাতে পাঠকের মনে হতে পারে এই অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। অথচ বাস্তবে ঘটনাটি ঘটেছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। এই প্রেক্ষাপটটি তার লেখায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলেই অভিযোগ উঠেছে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে মাহফুজ আনামের নিরপেক্ষতা নিয়ে। কারণ, অতীতে তিনি নিজেই ইউনূস সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তাকে ‘আজীবন শুভাকাঙ্ক্ষী’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। অথচ বর্তমান লেখায় সেই সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া সাংবাদিক নির্যাতন, গ্রেপ্তার, চাকরিচ্যুতি, গণহারে মামলা বা অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের মতো গুরুতর বিষয়গুলো অনুপস্থিত।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়কালে দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের যে চিত্র দেখা গেছে, তা দেশের ইতিহাসে অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—কেন এই বাস্তবতাগুলো তার লেখায় প্রতিফলিত হয়নি?
মাহফুজ আনাম তার কলামে অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের ভূমিকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, তাদের অনেকে অতীতে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোতে নিয়মিত লিখেছেন, সম্পাদকীয় নীতিমালা সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং পত্রিকাগুলোর সহায়তাও নিয়েছেন। কিন্তু অগ্নিসংযোগের সময় কিংবা পরবর্তী সময়ে তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত প্রতিবাদ বা পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—প্রথম আলো, যার সম্পাদক মতিউর রহমান, এখনো কেন সেই সাবেক উপদেষ্টাদের লেখা প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে আসিফ নজরুল এবং এম সাখাওয়াত হোসেনের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিদের, যারা ওই সময় সরকারের অংশ ছিলেন, তাদের লেখার প্রকাশ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সমালোচকদের মতে, এটি একটি নৈতিক দ্বিধা তৈরি করে। একদিকে পত্রিকা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে সেই সময়কার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরই মতামত পত্রিকার পাতায় স্থান পাচ্ছে। এতে পাঠকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি গণমাধ্যমের জন্য সম্পাদকীয় স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পাঠকের আস্থা ধরে রাখাও জরুরি। যদি কোনো লেখক বা ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকে, তাহলে তার লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় ব্যাখ্যা বা প্রেক্ষাপট দেওয়া প্রয়োজন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মাহফুজ আনামের লেখায় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার গণমাধ্যম নিপীড়নের বিস্তারিত বিবরণ থাকলেও ড. ইউনূসের সরকারের সমালোচনা তুলনামূলকভাবে কম। এটিকে কেউ কেউ তার ‘অকারণ বিদ্বেষ’ হিসেবে দেখছেন আওয়ামী লীগের প্রতি, আবার অন্যরা বলছেন—এটি তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।
তবে এই বিতর্কের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো ঝুঁকির মুখে। অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়, বরং একটি সমাজের সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক চেতনারও পরীক্ষা।
মাহফুজ আনাম তার কলামে উল্লেখ করেছেন, “আমরা ফিরে এসেছি একটিমাত্র প্রত্যয় নিয়ে—মাথা নোয়াবার নয়।” এই অবস্থান নিঃসন্দেহে সাহসিকতার প্রতীক। কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, প্রেক্ষাপটের পূর্ণতা এবং সব পক্ষের প্রতি সমান দৃষ্টি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণমাধ্যম যদি সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের রক্ষক হতে চায়, তবে তাকে শুধু ক্ষমতার সমালোচনা নয়, নিজের অবস্থানও স্বচ্ছ রাখতে হবে। তথ্যের পূর্ণতা, প্রেক্ষাপটের ভারসাম্য এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা—এই তিনটি বিষয়ই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে প্রশ্নটি থেকেই যায়—আগুনের পর যে নীরবতা দেখা গেছে, তা কি কেবল ব্যর্থতা, নাকি ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা? আর গণমাধ্যম কি সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে প্রস্তুত? অনেকে বলছেন, মাহফুজ আনামের আওয়ামী বিদ্বেষ শিগগিরই বিএনপি বিদ্বেষে রূপ নেবে। কারণ, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
খবরটি শেয়ার করুন