ছবি: সংগৃহীত
কুষ্টিয়ায় ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ তুলে গত শনিবার একটি দরগায় হামলার ঘটনা আবারও সামনে এনেছে পুরনো এক বাস্তবতা—ধর্মের আড়ালে সংঘবদ্ধ সহিংসতা, যার অন্তরালে অনেক সময়ই থাকে লুটপাট, দখল এবং আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্য। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইসলাম ধর্ম রক্ষার স্লোগান সামনে থাকলেও এসব হামলার পেছনে ধর্মীয় কোনো উদ্দেশ্য থাকে না; বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, এসব হামলার একটি সুস্পষ্ট প্যাটার্ন রয়েছে। তিনি বলেন, “প্রথমে কোরআনের অপমান বা ইসলাম রক্ষার কথা বলে মানুষকে উত্তেজিত করা হয়, তারপর হামলা চালানো হয়। ধর্মীয় বিষয় সামনে আনা হলে সাধারণ মানুষ অনেক সময় প্রতিবাদ না করে বরং তাতে গা ভাসিয়ে দেয়।”
তার মতে, এই কৌশল শুধু আবেগকে ব্যবহার করে না, বরং একটি নিয়ন্ত্রণমূলক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করে। “তৌহিদি জনতার নামে ইসলামকে পুঁজি করে একটি নিয়ন্ত্রণবাদী আদর্শের চর্চা হচ্ছে,” বলেন তিনি।
তবে এর পেছনে শুধু আদর্শিক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য নয়, আরও বাস্তব কারণ কাজ করে বলে মনে করেন তিনি। “অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থ থাকে—লুটপাট, জায়গা-জমি দখল, স্থানীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। ফলে ধর্ম অবমাননা অনেক সময় কেবল একটি অজুহাত,” যোগ করেন জোবাইদা নাসরীন।
জোবাইদা নাসরীনের মতে, “গত দেড় বছরে মবকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোও এক ধরনের রাজনীতি করছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক ক্ষেত্রে কঠোর হতে পারেনি। ইসলাম রক্ষার সাইনবোর্ড থাকলে সেখানে হাত দিতে রাজনৈতিক দল ও সরকার অনেক সময় অস্বস্তি বোধ করে।”
ইসলামী গবেষক ও উত্তরার জামিয়া দারুল আরকাম ইসলামিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ড. ওয়ালীয়ুর রহমান বলছেন, এসব সহিংসতার সঙ্গে মূলধারার আলেমদের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। তার মতে, “বড় আলেমদের কোনো নির্দেশনা এসব ঘটনায় থাকে না। বরং অনেক সময় দেখা যায়, অশিক্ষিত বা কম শিক্ষিত তরুণরা উত্তেজিত হয়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে।”
তিনি আরও বলেন, “অনেকে চায় দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি হোক। এসব ঘটনার পেছনে অশুভ শক্তির হাত থাকে। ধর্মীয় বয়ানের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দেশে বিভিন্ন ওয়াজ-মাহফিল বা খুতবায় ভিন্ন মতাদর্শ, মাজার বা পীরদের ‘অইসলামিক’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। যদিও অনেক ধর্মীয় বক্তা এটিকে ‘ঈমানি দায়িত্ব’ হিসেবে দেখেন, কিন্তু সেই বয়ান থেকে সহিংসতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি অস্বীকার করা যাচ্ছে না।”
ড. ওয়ালীয়ুর রহমান নিজেও এ বিষয়ে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “ইমাম বা খতিবদের উচিত হবে ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনা করার সময় স্পষ্ট করে বলা যে, কোনো অবস্থাতেই আইন হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। প্রতিবাদ করতে হলে তা আইনি উপায়ে করতে হবে—মিছিল, স্মারকলিপি, মামলা—কিন্তু ভাঙচুর বা হামলা নয়।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, সুফি সাধক ও পীরদের মাজারে হামলার ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ মিল রয়েছে—হামলার পর লুটপাট ও সম্পত্তি দখলের ঘটনা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, হামলার সময় বাড়িঘর ভাঙচুরের পাশাপাশি মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করা হয়। এমনকি হামলার পর সেই জায়গা দখলের চেষ্টাও চলে। এতে করে বোঝা যায়, ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে মূলত অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জোবাইদা নাসরীন বলেন, “যখন একটি গোষ্ঠী বুঝতে পারে যে ধর্মের কথা বলে সহজেই মানুষকে একত্র করা যায় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎক্ষণাৎ কঠোর হবে না, তখন তারা এটাকে সুযোগ হিসেবে নেয়।”
মব সহিংসতা ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান স্বীকার করেছেন, “এধরনের ঘটনা না হতে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব ছিল, এবং সরকার এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে।”
তিনি জানান, সরকার এখন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দিকে যাচ্ছে। “মবের ঘটনা ঠেকাতে আইনের কঠোর প্রয়োগ করা হবে। একটি লেজিটিমেট বলপ্রয়োগের জন্য যা যা করা প্রয়োজন, সরকার তা করবে,” বলেন তিনি।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু কঠোরতার ঘোষণা নয়, কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ, বারবার একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে সমস্যাটি কাঠামোগত এবং গভীর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা ঠেকাতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের দায়িত্বশীল ভূমিকা। ধর্মীয় বক্তব্যে সহনশীলতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার বার্তা জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, ধর্মকে সহিংসতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা বন্ধ না হলে এ ধরনের ঘটনা চলতেই থাকবে। কুষ্টিয়ার ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল—ধর্ম অবমাননার অভিযোগ অনেক সময় কেবল একটি অজুহাত; প্রকৃত লক্ষ্য থাকে অন্য কোথাও। এ বাস্তবতা স্বীকার করে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
খবরটি শেয়ার করুন