ছবি: সংগৃহীত
সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগকে দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম যেখানে মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি অধ্যায় হিসেবে দেখছে, সেখানে ভারতের বাংলা ও ইংরেজিসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বড় একটি অংশ ঘটনাটিকে অনেক বিস্তৃত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত দেশে ফেরার পরিকল্পনা, আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থান এবং দেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এই পদত্যাগকে যুক্ত করে দেখছে তারা।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে একটি বিষয়—মো. সাহাবুদ্দিন ছিলেন শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোগী এবং তার পদত্যাগের ফলে শেখ হাসিনা "রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে থাকা শেষ রাজনৈতিক মিত্রকেও হারালেন"। রয়টার্স লিখেছে, শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বর দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা ঘোষণা করার কয়েক দিনের মধ্যেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সিদ্ধান্ত আসে। ফলে ঘটনাটি শুধু সাংবিধানিক পরিবর্তন নয়, বরং বাংলাদেশের ক্ষমতার কাঠামোয় একটি প্রতীকী পরিবর্তন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এপি একই ঘটনাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি অসুস্থতার কারণ উল্লেখ করে পদত্যাগ করলেও স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিবেদনে রাজনৈতিক চাপের কথাও উঠে এসেছে। এপি লিখেছে, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তার ধারাবাহিকতায় সাহাবুদ্দিনের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
ভারতের ইংরেজি দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া পদত্যাগকে সরাসরি শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত করেছে। তাদের ভাষায়, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনার ঠিক আগে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে পত্রিকাটি সরকার ও রাষ্ট্রপতির সম্পর্কেও টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিয়েছে।
ভারতের দ্য প্রিন্ট, যারা রয়টার্সের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার পর সরকার রাজনৈতিকভাবে আরও চাপের মুখে পড়ে এবং সেই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগকে দেখা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং দলের বহু নেতা কারাগারে বা আত্মগোপনে থাকায় রাষ্ট্রপতির বিদায় শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তারা প্রায় সবাই সাহাবুদ্দিনকে "শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ মিত্র" বা "সাবেক সহযোগী" হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। রয়টার্স, এপি, আরব নিউজ কিংবা পাকিস্তানের আজ ইংলিশ—সবখানেই এই পরিচয়টি প্রতিবেদনের শুরুতেই এসেছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে ঘটনাটি কেবল একজন রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম ঘটনাটির সাংবিধানিক দিক, অসুস্থতার কারণ, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। দেশীয় প্রতিবেদনে রাজনৈতিক প্রতীকী অর্থের আলোচনা থাকলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মতো শেখ হাসিনার "শেষ রাষ্ট্রীয় মিত্র" প্রসঙ্গটি তুলনামূলকভাবে বেশি জোর দিয়ে উপস্থাপন করা হয়নি।
এই পার্থক্যের একটি কারণও রয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকেরা। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নিয়ে কাজ করা গবেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সাধারণত কোনো দেশের ঘটনাকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, ক্ষমতার ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করে। ফলে একজন রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ সেখানে ব্যক্তি পরিবর্তনের চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে বেশি গুরুত্ব পায়।
রয়টার্স তাদের বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও তিনি রাষ্ট্রপ্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তাই পদটির প্রতীকী গুরুত্ব যথেষ্ট। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরও সাহাবুদ্দিন ওই পদে বহাল ছিলেন। তার পদত্যাগের মাধ্যমে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি অসমাপ্ত অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটল বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন।
ভারতের কিছু বাংলা গণমাধ্যমেও একই ধরনের বিশ্লেষণ উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কিত রাষ্ট্রীয় প্রতীকগুলো একে একে পরিবর্তিত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগকে দেখা হচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের সবাই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। কয়েকজন পর্যবেক্ষক মনে করছেন, পদত্যাগের পেছনে স্বাস্থ্যগত কারণকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে প্রকাশিত পদত্যাগপত্রে দীর্ঘদিনের হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা এবং 'অটোনমিক নিউরোপ্যাথি'র কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও এই বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে।
আবার এপির মতো কয়েকটি সংবাদমাধ্যম একই প্রতিবেদনে লিখেছে, স্বাস্থ্যগত কারণ সরকারি ব্যাখ্যা হলেও রাজনৈতিক চাপের কথাও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দুটি ব্যাখ্যাই পাশাপাশি স্থান পেয়েছে।
বাংলাদেশ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা বিদেশি কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের পর্যবেক্ষণ হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে নজর রাখছে। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ফলে তাৎক্ষণিক সাংবিধানিক সংকট তৈরি না হলেও এটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকেত। কারণ এর মাধ্যমে নতুন সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়েও পরিবর্তনের ধারা সম্পন্ন করছে।
আরেকটি বিষয় আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বারবার এসেছে—শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা। রয়টার্সসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মতে, ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় আসে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ সেই আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে।
তবে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম প্রায়ই বাংলাদেশের রাজনীতিকে শেখ হাসিনা বনাম তার বিরোধীদের দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। অথচ দেশের অভ্যন্তরে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক সমঝোতার মতো বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাই এসব বিষয় তুলনামূলকভাবে বেশি স্থান পেয়েছে।
সব মিলিয়ে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগকে ঘিরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। দেশের সংবাদমাধ্যমের বড় অংশ যেখানে ঘটনাটিকে সাংবিধানিক পরিবর্তন, স্বাস্থ্যগত কারণ এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়ার আলোকে ব্যাখ্যা করছে, সেখানে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এটিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে দেখছে। তাদের বিশ্লেষণে শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ, আওয়ামী লীগের অবস্থান, নতুন সরকারের রাজনৈতিক বার্তা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর পুনর্বিন্যাস—সবকিছুই একই আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
এই দুই ধরনের বিশ্লেষণের মধ্যে কোনটি শেষ পর্যন্ত বেশি গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক মাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে মোড় নেয় তার ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ শুধু একটি সাংবিধানিক ঘটনা নয়; এটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বোঝার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
খবরটি শেয়ার করুন