ফাইল ছবি
দেশে আইসিইউর সংকট যে কত ভয়াবহ, তা করোনাকালে দেশবাসী হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। অস্বীকার করার উপায় নেই যে চাহিদার তুলনায় দেশের সরকারি–বেসরকারি সব হাসপাতালেই আইসিইউর সংখ্যা কম। কিন্তু আইসিইউ নষ্ট বা অব্যবহৃত অবস্থায় থাকবে, এটা কোনোভাবেই মানা যায় না বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা মনে করেন।
তারা জানান, সব রোগীর জন্য আইসিইউর প্রয়োজন হয় না। জটিল, সংকটাপন্ন ও মুমূর্ষু রোগীকেই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হয়।
কোভিড-১৯ মহামারির পর দেশে আইসিইউ অবকাঠামোর ব্যাপক সম্প্রসারণ হলেও তা জীবনরক্ষাকারী সেবায় রূপান্তরিত হতে পারেনি। মূলত জনবল সংকটের কারণে দেশের স্থাপিত অধিকাংশ আইসিইউ শয্যাই অব্যবহৃত পড়ে আছে, আর এদিকে সংকটাপন্ন রোগীরা চিকিৎসার অপেক্ষায় মৃত্যুবরণ করছেন।
চলমান হাম (মিজলস) প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫৬ শিশু মারা গেছে এবং ১৭,০২৪ জনের বেশি আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে স্বাস্থ্যখাতের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা সুখবর ডটকমের অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে। একইসঙ্গে পরিকল্পনা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৭২টি সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে ১,৩৭২টি আইসিইউ শয্যা এবং ৫১টি প্রতিষ্ঠানে ১,০৫৪টি সিসিইউ শয্যা রয়েছে। কোভিড-পূর্ব সময়ে যেখানে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৯৮, তার তুলনায় এটি প্রায় তিনগুণ।
তবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, তীব্র জনবল সংকট, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে এই শয্যার অর্ধেকেরও বেশি ব্যবহারযোগ্য নয়। ফলে ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে, আর রোগীরা আইসিইউ সেবার জন্য অপেক্ষা করছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল সুখবর ডটকমকে এ প্রসঙ্গে বলেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে ১৩টি আইসিইউ ইউনিট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে ১০০টিরও বেশি শয্যা থাকবে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক আবু হুসাইন মো. মইনুল আহসান অব্যবহৃত আইসিইউ শয্যা নিয়ে সুখবর ডটকমকে কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকটের মূল কারণ হলো—প্রয়োজনীয় পরিচালন সক্ষমতা নিশ্চিত না করে অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা। গত মার্চ মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার অপেক্ষায় অন্তত ২২৯ জন রোগী—যাদের মধ্যে ৯১ জন শিশু—মারা যায়। হাম ও নিউমোনিয়ার জটিলতায় আক্রান্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় হাসপাতালটিকে।
রাজশাহী বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, করোনা মহামারিকালে স্থাপিত ৯৪টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে বর্তমানে মাত্র প্রায় ৫০টি সচল আছে। বাকি শয্যাগুলো জেলা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানের অভাবে অচল পড়ে আছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মার্চ মাসে ৩৮৬ জন শিশুকে আইসিইউ অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হয়, যাদের মধ্যে ৯১ জন চিকিৎসা পাওয়ার আগেই মারা যান। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। দেশজুড়ে অব্যবহৃত আইসিইউর উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে।
রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক রোগ হাসপাতালের ১০ শয্যার একটি আইসিইউ ইউনিট জনবল সংকটে বছরের পর বছর বন্ধ ছিল। সম্প্রতি এক শিশুর মৃত্যুর পর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জরুরি নির্দেশে এটি চালু করা হয়। ভোলায় ২০২০ সালে স্থাপিত ৬ শয্যার আইসিইউ ইউনিট একদিনও চালু হয়নি। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক তাইয়াবুর রহমান মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকায় অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে।
টাঙ্গাইলে ২০২০ সালে চালু হওয়া ১০ শয্যার আইসিইউ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বন্ধ হয়ে যায়। জনবল চেয়ে বারবার অনুরোধ করা হলেও এক বছরের বেশি সময় ধরে তা অচল রয়েছে। মুন্সীগঞ্জে ১০ শয্যার একটি আইসিইউ এখনো চালুই হয়নি—যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে।
ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতেও সমস্যা রয়েছে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে অন্তত পাঁচটি আইসিইউ শয্যা বর্তমানে অকার্যকর। হাসপাতালের পরিচালক আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী গতকাল মঙ্গলবার বলেন, সচল শয্যাগুলো সারা বছরই পূর্ণ থাকে। আইসিইউ সম্প্রসারণের বড় অংশই বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ারডনেস’ প্রকল্পের আওতায় করা হয়, যার বাজেট ছিল ১০০ মিলিয়ন ডলার। এই প্রকল্পের আওতায় ১০টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ১৩টি জেলা হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন করা হয়।
তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হলেও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুখবর ডটকমকে বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে আইসিইউ ইউনিট ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করা হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো চালানোর মতো জনবল ছিল না।”
প্রকল্প চলাকালে কিছু হাসপাতালে অস্থায়ী জনবল নিয়োগ দেওয়া হলেও ২০২৫ সালের জুনে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সেই সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়, ফলে অনেক স্থানে সেবা স্থগিত হয়ে পড়ে। এছাড়া মহামারির আগেই স্থাপিত আইসিইউ ইউনিটগুলোরও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও প্রযুক্তিগত সহায়তার সংকটে ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, আইসিইউ শয্যার ঘাটতি যেমন রয়েছে, তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো ব্যবস্থাপনা সংকট। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “সঠিক পরিচালন পরিকল্পনা ছাড়া কীভাবে এমন অবকাঠামো স্থাপন করা হলো?”
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি রশীদ-ই-মাহবুব দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “প্রয়োজনভিত্তিক দক্ষ জনবল তৈরি না করলে এই ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি অকার্যকর হয়ে পড়বে।”
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য কমপক্ষে ৩ থেকে ১০টি আইসিইউ শয্যা প্রয়োজন। সে হিসেবে বাংলাদেশের প্রায় ১৭.৫ কোটি মানুষের জন্য কমপক্ষে ৫,০০০ আইসিইউ শয্যা প্রয়োজন—যা বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল সংকট শুধু শয্যার সংখ্যা নয়, বরং সেগুলোর ব্যবহারযোগ্যতা। রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য এই ব্যর্থতার পরিণতি তাৎক্ষণিক ও বেদনাদায়ক। চলমান হাম প্রাদুর্ভাব শিশুদের আইসিইউর চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুদের আইসিইউ শয্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ১৮ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম।
যেসব জেলায় কার্যকর আইসিইউ নেই, সেখান থেকে রোগীদের দূরের হাসপাতালে পাঠানো হয়, ফলে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়। সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবার খরচ তুলনামূলক কম হলেও বেসরকারি হাসপাতালে তা প্রায় ২০ গুণ বেশি, যা অনেকের জন্য অসহনীয়। দেশজুড়ে আইসিইউ সম্প্রসারণ হলেও এর বেশিরভাগই ঢাকাকেন্দ্রিক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১,৩৭২টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে ৭৩৬টিই ঢাকার মাত্র ২২টি প্রতিষ্ঠানে অবস্থিত। এই বৈষম্যের কারণে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শহরে আসতে হয়—এবং সেখানেও অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ অপেক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।
খবরটি শেয়ার করুন