ফাইল ছবি
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের করা সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনে রূপ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে ওই সরকারের আমলে জারি হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। ২০২৫ সালের ওই অধ্যাদেশের বলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
গত বুধবার, ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে এ–সংক্রান্ত ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস হয়। পাস হওয়া বিলে অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে কোনো সত্তাকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতাও এই আইনে থাকছে। আগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে নিষিদ্ধ করার বিধান থাকলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান ছিল না। এতে দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধই থাকছে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের লক্ষ্যে করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশকে বর্তমান সরকার জাতীয় সংসদে স্থায়ী আইনে রূপ দিলেও এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া—বিশেষ করে রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ—এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো শক্ত প্রতিক্রিয়া বা আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ না থাকায় বিষয়টি মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও আইনি পরিসরেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। রাশিয়া ও চীনসহ সাবেক আওয়ামী লীগের সরকারের মিত্ররাও এই ইস্যুতে নিশ্চুপ।
ক্ষমতায় থাকাকালীন আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বেশি কূটনৈতিক সুসম্পর্ক থাকা প্রতিবেশী দেশ ভারত গত চারদিনে বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা বলেনি। ইউরোপের যেসব দেশ রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিপক্ষে অবস্থান নেয়, তেমন কোনো দেশ এখনো পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে বিবৃতি দেয়নি। দেশ-বিদেশে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব আশা করেছিল, বিএনপির সরকার ড. ইউনূসের সরকারের অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করলে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দলটির পক্ষে হয়তো বিবৃতি দেবে। কিন্তু সেই আশা হতাশায় রূপ নিচ্ছে।
ভারতে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত তিনজন নেতা আজ শনিবার রাতে সুখবর ডটকমকে বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন চব্বিশের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল, সেখানেও রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ না করার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছিল। এ কারণে তারা আশা করেছেন, দলটি নিষিদ্ধ হওয়ায় জাতিসংঘ বিবৃতি দিতে পারে।
তাদের মতে, রাজনীতিতে প্রায়ই দুঃসময় আসে, আসতে পারে। আওয়ামী লীগ এখন তেমন সময়েরই মুখোমুখি। তবে পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সরকারের বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি, মানবাধিকার প্রশ্ন বা দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে আওয়ামী লীগের পক্ষে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে—এমনটিই প্রত্যাশা করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্র বলছে, দলটিকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি এখনো পর্যন্ত অনেক দেশ সাধারণত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও আইনি বিষয় বলে সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছে। সরকার এই নিষেধাজ্ঞাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচার কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে এটি সরাসরি রাজনৈতিক দমন নয়, বরং আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিদেশে উপস্থাপিত হয়েছে।
বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী ভারত—যার গণমাধ্যম অতীতে এই দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে—আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পর তাদের তুলনামূলক নীরবতা অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বিষয়টি দেশটির গণমাধ্যমেও অতীতের বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও এর নেতৃত্বধীন সরকারের সংকটে বেশিরভাগ ভারতীয় গণমাধ্যম দলটিকে এবং সরকারকে সমর্থন জানিয়েছে।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর একটি বড় অংশে দলটির প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন পোর্টাল এবং প্রভাবশালী বিশ্লেষকেরা সেই সময় ঘটনাটিকে “গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিচ্যুতি” হিসেবে তুলে ধরেন। অনেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে দলটির প্রতি সমর্থনও জানান। সেসব গণমাধ্যমও এখন আওয়ামী লীগের প্রশ্নে চুপ।
২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের একটি অংশ তাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, বিবৃতি ও দলীয় কার্যক্রম প্রকাশের বিষয়ে প্রায় সময় দেশের গণমাধ্যমগুলোর তুলনায় ভারতীয়গুলোকে বিভিন্ন কারণে গুরুত্ব বেশি দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান পরিস্থিতি—যেখানে একই দলকে নিষিদ্ধ করার জন্য সংসদে বিল পাস হয়েছে—তা নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের দৃশ্যত নীরবতা নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে: কেন এই পরিবর্তন?
ঢাকা ও নয়াদিল্লির নির্ভরযোগ্য একাধিক কূটনৈতিক সূত্র সুখবর ডটকমকে জানায়, ভারতীয় গণমাধ্যমের অবস্থান অনেকাংশে তাদের রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। ভারত সরকার বর্তমানে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে সরকার আছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। তারেক রহমান সরকার ও নরেন্দ্র মোদি সরকার দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাচ্ছে। এসব কারণে আওয়ামী লীগ ইস্যুতে ভারতীয় গণমাধ্যম নীরব।
তথ্যমতে, ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী এনে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। ওই সংশোধনের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনকে শুধু তালিকাভুক্ত করা নয়, বরং তাদের “যাবতীয় কার্যক্রম” নিষিদ্ধ করার স্পষ্ট বিধান যুক্ত করা হয়।
এর ভিত্তিতে একই বছরের ১২ মে প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। গত ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিলের মাধ্যমে সেই অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনে রূপ দেওয়া হয়, যেখানে অধ্যাদেশের মূল বিষয়বস্তুর কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
খবরটি শেয়ার করুন