মঙ্গলবার, ১৩ই জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩০শে পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** চট্টগ্রাম বন্দরে চাকরি পেলেন ৯ জুলাই যোদ্ধা *** যে ইস্যুতে সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপ চায় বিএনপি *** ‘সাংবাদিকদের স্নাতক হওয়ার বাধ্যবাধকতায় সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হবে’ *** বাম ও মধ্যপন্থী মতাদর্শের তরুণদের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম আসছে *** শেখ হাসিনাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করল পিবিআই *** বাংলাদেশের বাহিনীগুলোর কোনো পদক্ষেপ ভারতের বিরুদ্ধে নয়: ভারতীয় সেনাপ্রধান *** ইরানের সরকার স্বীকার করল নিহত ২০০০—বেসরকারি সূত্রমতে ১২০০০ *** প্রবাসীদের সুখবর দিলেন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল *** শিক্ষার্থীদের চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে: প্রধান উপদেষ্টা *** দক্ষিণ এশীয় উচ্চশিক্ষা সম্মেলন উদ্বোধন করলেন প্রধান উপদেষ্টা

‘সাংবাদিকদের স্নাতক হওয়ার বাধ্যবাধকতায় সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হবে’

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৭:৫০ অপরাহ্ন, ১৩ই জানুয়ারী ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

হ্যালো বাংলাদেশ সংবাদমাধ্যমের বিশেষ প্রতিনিধি আসাদ জামান নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে লেখেন, 'তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন- এটা শোনার পর এক সাংবাদিকের প্রশ্ন, এখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কে?' সাংবাদিক আসাদ জামানের ওই স্ট্যাটাসে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা মন্তব্য করেন, 'আমি নিশ্চিত এই সাংবাদিক একদিন মিডিয়া দখল করে হেড অফ নিউজ বা সিইও হবে।'

গত ৯ই জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান তারেক রহমান। এর আগে তিনি দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন। ওই দিন রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানানো হয়। বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে বৈঠক শেষে রাত সাড়ে ১০টার পর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় এক গণমাধ্যমকর্মী মির্জা ফখরুলের কাছে জানতে চান, তারেক রহমান চেয়ারম্যান হওয়ার পর বিএনপির এখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কে?

বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসি-ঠাট্টা, আলোচনা-সমালোচনা চলছে সাংবাদিক সমাজসহ নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনের মধ্যে। অনেকে দাবি তুলেছেন, সাংবাদিকতা করার ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা উচিত। বিশেষ করে, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন রূপান্তরকালিন সরকারের গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, সেখানে  সাংবাদিকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক করতে সুপারিশ করা হয়েছে, এর বাস্তবায়ন হওয়া উচিত।

তবে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ মনে আফসান চৌধুরী মনে করেন, সাংবাদিকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক হওয়ার সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে সাংবাদিকদের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হতে পারে। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকতা করতে পারাই সাংবাদিক হওয়ার যোগ্যতা। এটা আমি মনে করি।’

আফসান চৌধুরী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক। তিনি অর্ধশতাব্দির বেশি সময় সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ‘ঢাকা কুরিয়ার’, ‘দ্য ডেইলি স্টার’ ও ‘বিবিসি’তে কাজ করেছেন। সাহিত্যিক ও গবেষক হিসেবেও তিনি বরেণ্য।

তিনি বলেন, ‘আমি পত্রিকায় দেখেছি এ সুপারিশ (সাংবাদিক হতে হলে স্নাতক ডিগ্রি লাগবে, কমিশনের এমন সুপারিশ) । কিন্তু এটা কখনও হতে পারে? আমার সাংবিধানিক অধিকার এতে খর্ব হবে না?’

তিনি বলেন, ‘বিবিসিতেও তো এ নিয়ম (সাংবাদিক হতে হলে স্নাতক ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা) নেই। সাংবাদিকতা করতে পারাই সাংবাদিক হওয়ার যোগ্যতা। এটা আমি মনে করি। এখানে স্নাতক হওয়ার দরকার নেই। তবে এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা হওয়া উচিত।’

দৈনিক সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন গবেষক ও কথাসাহিত্যিক আফসান চৌধুরী। গত বছরের ২৪শে মার্চ ওই সাক্ষাৎকার ছাপা সংস্করণে প্রকাশ করে সমকাল।

সেখানে আফসান চৌধুরী সাংবাদিকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক করতে কমিশনের সুপারিশ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ঢাকার বাইরে যারা সাংবাদিকতা করেন, তাদের তো খুবই খারাপ অবস্থা। তাদের দেখভাল করারও কেউ নেই। তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা না করে বলে দিলেই হলো, স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে এসো সাংবাদিকতা করার জন্য?’

অনেকে বলছেন, কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিএ পাস তো দূরের কথা, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হননি। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাউস ডিগ্রি নিয়ে আসা অনেকে তার কোনো কোনো কবিতা বোঝার জ্ঞান মোটেও রাখেন না। প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা না থাকলেও তার সাংবাদিকতা ডিগ্রিওয়ালা অনেকের কাছে অষ্টম আশ্চর্যের মতো বিস্ময়! নজরুল গণমানুষের সাংবাদিকতা করেছেন, তিনি উপমহাদেশে গণসাংবাদিকতার পথিকৃৎদের অন্যতম।

মুক্তিযুদ্ধের পর প্রকাশিত প্রথম সরকারবিরোধী আলোচিত-সমালোচিত দৈনিক গণকণ্ঠের সম্পাদক আল মাহমুদ বড়জোর সপ্তম শ্রেণি পাস। ওই পত্রিকায় কলামিস্ট মহিউদ্দিন আহমদ, দেশের স্বঘোষিত স্টিভ জবস মোস্তাফা জব্বাররা তার অধীনে সাংবাদিকতা করেন। প্রকৃতি প্রদত্ত অপরিমেয় প্রজ্ঞাবান আল মাহমুদের সোনালি কাবিনের কোনো কবিতার একটা লাইনের মতো কিছু সৃষ্টি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেটওয়ালা অনেক শিক্ষক, আমলার পক্ষে শুধু অসম্ভবই নয়, তার কবিতা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা নিয়ে তারা এ জন্মে জন্মই নিতে পারেননি। 

জাতীয় একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত এক সাংবাদিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মান (বিএ) প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার সময়ই জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে আচ্ছন্ন ছিলেন। বিপ্লবের ফাঁদে পড়ায় তার আর সনদপত্র অর্জনের পড়াশোনা হয়নি। বাংলা, স্মার্ট ইংরেজি ভাষায় তার যে দক্ষতা, এর তুলনা করলে শুধু এ দেশেই নয়, পুরো উপমহাদেশে তার মতো খুব কমজনকে পাওয়া যাবে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক মাহমুদ জামাল কাদেরী বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়ায় কথিত ডিগ্রি পাসের সনদপত্র অর্জন করতে পারেননি। দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায়, তিনি যে সংবাদমাধ্যমে কাজ করবেন, তা সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশ, প্রচার হবে। 

সাংবাদিক সমাজের মতে, সাংবাদিকতা সৃজনশীল পেশা, কোনোভাবেই তা সরকারি-বেসরকারি কারখানার ডিগ্রিসর্বস্ব চাকরির মতো নয়। সাংবাদিকতায় আসার নূন্যতম যোগ্যতা, নীতিমালা কী হবে, তা নির্ধারণ করবেন দেশের অভিজ্ঞ সাংবাদিক, সম্পাদকেরা।

আমলা, কোনো কাউন্সিল, কমিশন, বা সরকারি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কোনো না কোনো আইনের মারপ্যাচে রাখলেও তারা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ নয়। জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিদিনের সংবাদের মুখ্য অংশ আসে ঢাকার বাইরে থেকে। সংবাদ ছাড়াও একাধিক কারণে সারাদেশের প্রতিনিধি, ব্যুরো প্রধান, সংবাদদাতাদের ওপর নির্ভর করতে হয় জাতীয় প্রচারমাধ্যমগুলোকে। ঢাকার বাইরের প্রতিনিধিদের বেলায় সাংবাদিকতা এখনো পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি, তাদের বেলায় শখ, নেশা পর্যায়ে রয়ে গেছে।

দেশের কোনো জেলা, উপজেলা থেকে ‘নেশার’ টানে যে প্রতিনিধি হতে চাইবেন, তার বেলায় ডিগ্রি পাসের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা প্রায় সময় অবাস্তব হয়ে যাবে। শুধু বড় ডিগ্রি থাকলেই সংবাদ লেখা, সম্পাদনা করা যায় না। পেশার প্রতি অদম্য আবেগ, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, সমাজের প্রতি শুদ্ধ দায়বোধ, রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীল আনুগত্য না থাকলে সৎ সাংবাদিক হওয়া যায় না। 

বেশি বছর আগের ঘটনা নয়, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন তখন ইংরেজি একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক। ঢাকা কলেজ থেকে ইংরেজিতে সম্মান (বিএ) পাস করা এক যুবক আনোয়ার হোসেনের কাছে আসেন তার পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে চাকরি করতে। যুবকের কয়েক দিনের পীড়াপীড়িতে আনোয়ার হোসেনের শিক্ষকমন গলে যায়। তাকে আনোয়ার হোসেন নিজস্ব প্রতিবেদক হিসেবে নিয়োগ দেন।

কাজে যোগ দেওয়ার প্রথমদিন ওই প্রতিবেদককে বাংলায় লেখা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ধরিয়ে দিয়ে ইংরেজিতে প্রতিবেদন আকারে লিখতে বলেন তার পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটে, যুবক প্রতিবেদন সাজাতে পারছেন না, তাপ নিয়ন্ত্রিত কার্যালয়ে বসেও তিনি ঘামছিলেন। পাশে বসা এক সহকর্মী বিষয়টি আঁচ করতে পেরে যুবকের কাছে জানতে চান, তোমার গ্রামের বাড়ি কোন জেলায়?

যুবক নারায়ণগঞ্জ বললে সহকর্মী বলেন, জেলার নাম ইংরেজিতে বানান করতে। মানসিক চাপে অস্থির ওই নিজস্ব প্রতিবেদক নিজ জেলার ইংরেজি বানানও ভুলে যান তখন। অবশ্য চালাকি করে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটান তিনি। বলেন, আমাদের বাড়ি ঢাকা, ডিএইচএকেএ।

গণমাধ্যম সাংবাদিকতা আফসান চৌধুরী

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250