সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বাড়ছে হুতিদের হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মুখে ইরানের হুঁশিয়ারি *** জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী *** সাগরে শক্তিশালী হচ্ছে লঘুচাপ, ৬ অঞ্চলে ৬০ কিমি ঝড়ের আভাস *** আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যেভাবে ছড়াল আগুন *** আশুলিয়ায় কাভার্ড ভ্যান থেকে ৬ লাশ উদ্ধার *** জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথম স্ত্রীসহ থানায় এমপি নজরুল *** সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা *** কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন *** শিল্পকলা একাডেমির সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, পল্লবীতে বাসে আগুন *** ন্যাম ভবন থেকে সাতক্ষীরার এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার

‘ওপরের নির্দেশে প্রতিবেদন’ করেছিলেন মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপা

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৪:৫৭ অপরাহ্ন, ১৭ই জুন ২০২৬

#

ফাইল ছবি

২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ঘিরে সংঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের সময় দুজনই সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে নিজেদের সিদ্ধান্তের পরিবর্তে ‘ওপরের নির্দেশ’ অনুসরণ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন এবং এ বিষয়ে ব্যক্তিগত দায় অস্বীকার করেছেন।

আজ বুধবার (১৭ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্রগুলো জানায়, চলতি সপ্তাহে একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু এবং একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপাকে পৃথকভাবে একদিন করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তারা শাপলা চত্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সে সময়ের সংবাদ পরিবেশন, সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত, তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার–সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তাদের বক্তব্য নেন।

তদন্ত সংস্থার সূত্র অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপা জানিয়েছেন, তারা যে সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রচার করেছিলেন, তা প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের নির্দেশনা অনুসারেই করা হয়েছিল। সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা ব্যক্তিগতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি বলেও দাবি করেছেন।

একই জিজ্ঞাসাবাদের সময় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ও পরে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও ফুটেজও মোজাম্মেল বাবুকে দেখানো হয় বলে জানা গেছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই ফুটেজগুলো দেখানোর পর তিনি সেগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন। তবে এ বিষয়ে তার পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এর আগে গত ৭ জুন ট্রাইব্যুনাল-১ মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপাকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল এই অনুমতি প্রদান করেন। একই আদেশে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১০ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়। ফলে ওই দিন তদন্তের অগ্রগতি এবং তদন্ত সংস্থার পর্যবেক্ষণ আদালতে উপস্থাপনের কথা রয়েছে।

মামলাটিতে বর্তমানে মোট নয়জন গ্রেপ্তার রয়েছেন। মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপা ছাড়াও গ্রেপ্তার হওয়া অন্য ব্যক্তিরা হলেন সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহিদুল হক, পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির এবং সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনার পর কিছু সংবাদমাধ্যমে এমন তথ্য ও প্রতিবেদন প্রচার করা হয়েছিল, যা প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করতে ভূমিকা রেখেছিল। সেই অভিযোগের সূত্র ধরেই সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপার ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে এখনো বিচারিক সিদ্ধান্ত হয়নি এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

দেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতায় দীর্ঘ সময় ধরে পরিচিত মুখ ছিলেন মোজাম্মেল বাবু। তিনি একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিভিন্ন টকশো ও সমসাময়িক রাজনৈতিক আলোচনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আলোচিত ছিলেন। অন্যদিকে ফারজানা রূপা টেলিভিশন সাংবাদিকতায় প্রতিবেদক ও সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। একাত্তর টেলিভিশনের প্রধান প্রতিবেদক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের রাজনৈতিক ও সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যুতে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন ও টেলিভিশন উপস্থাপনার কারণে দুজনই দীর্ঘদিন ধরে জনপরিসরে পরিচিত ছিলেন।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ঘিরে সে সময় সংবাদমাধ্যমগুলোর ভূমিকা, তথ্য সংগ্রহের উৎস, সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত এবং প্রচারিত তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াসহ নানা বিষয় এখন তদন্তের অংশ হিসেবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যও তদন্ত প্রতিবেদনে বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।

আইন ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, কোনো বড় জাতীয় ঘটনার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেই বিষয়ে তদন্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা প্রয়োজন। কারণ একদিকে যেমন আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হয়, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত দায়বদ্ধতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়।

তাদের মতে, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত অনেক সময় একক ব্যক্তির নয়, বরং একটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রক্রিয়ার অংশ। কোনো ঘটনার জন্য ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করতে হলে কে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কোন তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ প্রচার হয়েছে এবং তখনকার বাস্তবতা কী ছিল—এসব বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

এদিকে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে জিজ্ঞাসাবাদে ‘ওপরের নির্দেশে’ কাজ করার দাবি এবং ভিডিও ফুটেজ নিয়ে মোজাম্মেল বাবুর বক্তব্য তদন্তের পরবর্তী ধাপে কতটা গুরুত্ব পায়, সেদিকে নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আগামী ১০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কোন দিকে এগোয়, তা নির্ভর করবে তদন্ত সংস্থার উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্ত এবং ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণের ওপর।

ফারজানা রূপা মোজাম্মেল বাবু

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250