ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় দেওয়া এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ঝালকাঠির সংসদ সদস্য জেবা আমিনা খান। মূলত ইংরেজিতে দেওয়া তার বক্তব্যের মধ্যে বাংলা শব্দ ও স্থানীয় প্রসঙ্গ যুক্ত হওয়ায় বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে। এরপর শুরু হয় সমালোচনা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এবং নানা ধরনের ট্রল।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বক্তব্যের ভাষা বা উপস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা করা যতটা স্বাভাবিক, তাকে ব্যক্তিগতভাবে বিদ্রূপ বা অপমানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা কি গ্রহণযোগ্য?
গতকাল মঙ্গলবার (১৬ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নেন জেবা আমিনা খান। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি তার নির্বাচনী এলাকার অবকাঠামোগত সমস্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “মাই এরিয়া ঝালকাঠিতে দ্য কাঁচা রাস্তাজ আর এ ভেরি ভেরি ব্যাড সিচুয়েশন। এগুলো হয়েছে ডিউ টু দুর্নীতি।”
এরপর তিনি আরও বলেন, “দ্য রাস্তাজ আর এ ভেরি ভেরি ব্যাড সিচুয়েশন। দিস ইজ ডিউ টু দ্য দুর্নীতি, উই হ্যাভ সিন ফ্রম দ্য প্রিভিয়াস রেজিম। দে হ্যাভ লুটেড, লিটারালি লুটেড দ্য কান্ট্রি।”
বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই তার ইংরেজি উচ্চারণ, বাক্যগঠন এবং বাংলা-ইংরেজি মিশ্রিত উপস্থাপনা নিয়ে মন্তব্য করতে শুরু করেন। কেউ কেউ বিষয়টিকে হাস্যরসের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেন। বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপে ভিডিওটি কেটে ছোট ছোট অংশে প্রকাশ করা হয়। সেখানে অনেক মন্তব্যই ছিল কৌতুক বা ব্যঙ্গধর্মী।
নেটিজেনদের একটি অংশের মতে, জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতা ও উপস্থাপনার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। তাদের যুক্তি, সংসদ সদস্যদের বক্তব্য শুধু সংসদ কক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রতিনিধিত্বের মান সম্পর্কেও বার্তা দেয়।
ঢাকার বাসিন্দা ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী মাহবুব রহমান লিখেছেন, “সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি যে ভাষায় স্বচ্ছন্দ, সেই ভাষায় বক্তব্য দিতে পারতেন। বক্তব্যের বিষয়বস্তুর চেয়ে ভাষা নিয়ে বেশি আলোচনা হওয়া দুঃখজনক।” আরেক ব্যবহারকারী শারমিন সুলতানা মন্তব্য করেন, “জাতীয় সংসদে বক্তব্যের একটি মান থাকা উচিত। মানুষ তাই আলোচনা করছে। এটাকে পুরোপুরি অন্যায় বলা যাবে না।”
তবে সমালোচনা আর ট্রলের মধ্যে পার্থক্য আছে বলে মনে করেন অনেকে। তাদের মতে, বক্তব্যের ভাষা বা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ হলেও ব্যক্তিগত আক্রমণ, অবমাননাকর মিম তৈরি কিংবা নারী পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিদ্রূপ গ্রহণযোগ্য নয়।
সামাজিক মাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, একজন সংসদ সদস্যের বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু যখন সেটি ব্যক্তিগত বিদ্রূপে পরিণত হয়, তখন তা আর গঠনমূলক সমালোচনা থাকে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই দেখি, নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও বেশি।
জেবা আমিনা খানের বক্তব্যে অবশ্য শুধু সড়ক অবকাঠামো নয়, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিশুবিকাশের বিষয়ও উঠে আসে। তিনি বলেন, “ফর হিউম্যান ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট, লার্নিং স্টার্টস অ্যাট এ ভেরি আর্লিয়েস্ট স্টেজ। আই অ্যাজ এ মন্টেসরি টিচার বিলিভ ফ্রম নট টু সেভেন।”
তিনি ডে-কেয়ার সেন্টার, প্রাথমিক বয়সে শিক্ষার পরিবেশ এবং শিশুদের বিকাশ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। বক্তব্যে জানান, তার একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মেয়ে রয়েছে এবং পরিবেশ থেকে শেখার মাধ্যমে সে দুটি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছে।
বাজেট প্রসঙ্গে জেবা আমিনা খান বলেন, “দ্য বাজেট সেন্টার্স অন থ্রি আর স্ট্র্যাটেজি—রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন।” তিনি মানবসম্পদ উন্নয়ন, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রবৃদ্ধিকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের বক্তব্য দ্রুত ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ বক্তব্যের একটি ছোট অংশ আলাদা করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে বক্তব্যের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট আড়ালে থেকে যায় এবং জনমনে ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
তাদের মতে, জেবা আমিনা খানের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছে। তার বক্তব্যের বিষয়বস্তু ছিল মূলত বাজেট, দুর্নীতি, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়ন। কিন্তু আলোচনার বড় অংশ আবর্তিত হচ্ছে ভাষা ও উপস্থাপনাকে ঘিরে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নাদিয়া ইসলাম লিখেছেন, “আমি তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত নাও হতে পারি। কিন্তু কাউকে নিয়ে অপমানজনক ট্রল করা উচিত নয়। আমরা বক্তব্যের মান নিয়ে কথা বলতে পারি, ব্যক্তিকে হেয় করা নয়।”
অন্যদিকে রাকিব হাসান মনে করেন, “জনপ্রতিনিধিরা জনসমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। তবে সমালোচনা যেন শালীনতার সীমা অতিক্রম না করে।”
দেশে নারী রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রলের বিষয়টি নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন নারী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সাংবাদিক ও জনপরিচিত ব্যক্তিকে তাদের বক্তব্য, পোশাক, উচ্চারণ, বা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিদ্রূপের মুখে পড়তে হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, অনলাইন পরিসরে নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্রূপ ও ব্যক্তিগত আক্রমণের মাত্রা সাধারণত বেশি দেখা যায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জেবা আমিনা খানের সংসদীয় বক্তব্য নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা ও সমালোচনা হওয়া স্বাভাবিক। কারণ তিনি একজন জনপ্রতিনিধি এবং তার বক্তব্য জনগণের মূল্যায়নের আওতায় পড়বে। কিন্তু সেই সমালোচনা যখন ব্যক্তিগত বিদ্রূপ, অবমাননা বা সংগঠিত ট্রলে রূপ নেয়, তখন তা গণতান্ত্রিক আলোচনার পরিবেশকে দুর্বল করে।
সংসদে দেওয়া তার বক্তব্যের ভাষাগত দিক নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু মতভেদের মধ্যেও শালীনতা, যুক্তি ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা—সুস্থ জনআলোচনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
খবরটি শেয়ার করুন