ফাইল ছবি
দেশের বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ এবং এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ সাইফুল আলমকে ঘিরে আন্তর্জাতিক তদন্তের পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় ছড়িয়ে থাকা সম্পদ এখন বিভিন্ন দেশের তদন্ত সংস্থার নজরে। দেশীয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই সাম্রাজ্যের একটি বড় অংশ বিদেশে স্থানান্তরিত অর্থের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যদিও এস আলম বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
মালয়েশিয়ার প্রভাবশালী ব্যবসায়িক সাময়িকী দ্য এজ মালয়েশিয়া এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এখন বিশেষভাবে নজর পড়েছে কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত দুটি বড় হোটেলের ওপর। এগুলো হলো কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত রেনেসাঁ কুয়ালালামপুর হোটেল অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টার এবং এর পাশের ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার। আন্তর্জাতিক হোটেল ব্র্যান্ড ম্যারিয়টের অধীনে পরিচালিত এ দুটি সম্পত্তির মালিকানা এমন একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে, যার সঙ্গে এস আলম গ্রুপের সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্য এজ মালয়েশিয়ার অনুসন্ধান অনুযায়ী, হোটেল দুটির মালিক ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল এসডিএন বিএইচডি, যার পূর্বনাম ছিল কানালি লজিস্টিকস এসডিএন বিএইচডি। ২০১৬ সালে মালয়েশিয়ার আইজিবি কর্প বিএইচডি মূল রেনেসাঁ হোটেলটি ৭৬ কোটি ৫০ লাখ রিঙ্গিতে ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের কাছে বিক্রি করে। পরে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক সংস্কার শেষে ২০২৩ সালের অক্টোবরে এটিকে ম্যারিয়ট ইন্টারন্যাশনালের মালয়েশিয়ার প্রথম দ্বৈত-ব্র্যান্ডের সম্পত্তি হিসেবে পুনরায় চালু করে। পশ্চিম অংশে রেনেসাঁ হোটেল এবং পূর্ব অংশে ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন পরিচালিত হচ্ছে।
কোম্পানি রেকর্ড ঘেঁটে দ্য এজ মালয়েশিয়া দেখতে পেয়েছে, ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনালের শতভাগ মালিকানা রয়েছে ওয়াইআইএফ হোল্ডিং মালয়েশিয়া এসডিএন বিএইচডির হাতে। এই প্রতিষ্ঠান আবার সিঙ্গাপুরভিত্তিক ওয়াইআইএফ হোল্ডিং পিটিই লিমিটেডের মালিকানাধীন। সেই সূত্র ধরে মালিকানা কাঠামো পৌঁছে গেছে হিলড্রিকস এশিয়া গ্রোথ ফান্ড ভিসিসি পর্যন্ত। যদিও মালয়েশিয়ার কোনো কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত হোটেল দুটির বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়নি, তবুও আন্তর্জাতিক তদন্তের বিস্তৃত পরিধির কারণে ভবিষ্যতে এসব সম্পদও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে এস আলমকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে সাইপ্রাসে। গত ১৯ মে নিকোসিয়ার একটি আদালত পারেক্লিশিয়া এলাকায় অবস্থিত এস আলম ও তার স্ত্রী ফারজানা পারভীনের যৌথ মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল আবাসিক সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দেন। বাংলাদেশের উদ্যোগে শুরু হওয়া পারস্পরিক আইনি সহায়তা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সাইপ্রাসের অর্থ পাচারবিরোধী ইউনিট মোকাস আদালতে আবেদন করলে এ আদেশ আসে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর প্রকাশ্যে বলেছেন, এস আলম-সংশ্লিষ্ট তদন্তে ৮০০ কোটি ইউরোরও বেশি অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া বিপুল ঋণের অর্থ জটিল আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও ট্রাস্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সাইপ্রাস, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ, জার্সি এবং অন্যান্য অঞ্চলে স্থানান্তর করা হয়ে থাকতে পারে।
তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া বিপুল ঋণ। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ঋণের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে খেলাপি হয়ে যায়। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, ওই অর্থ বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে পাচার করে সম্পদ গঠনে ব্যবহার করা হয়েছে কি না।
সাইপ্রাসে নিবন্ধিত একলেয়ার ইন্টারন্যাশনালও তদন্তের আওতায় এসেছে। জানা যায়, ২০১৬ সালে একলেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড অধিগ্রহণের মাধ্যমে এস আলম প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা অর্জন করেন। একই বছর তিনি সাইপ্রাসের বহুল আলোচিত ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ কর্মসূচির আওতায় দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করেন। পরে দুর্নীতির অভিযোগ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে সাইপ্রাস সরকার সেই কর্মসূচি বাতিল করে।
সাইপ্রাসের আদালতে জমা দেওয়া নথি অনুসারে, বাংলাদেশি তদন্তকারীরা ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এস আলম এবং তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করছেন। আন্তর্জাতিক আইন সংস্থা কুইন ইমানুয়েল উরকহার্ট অ্যান্ড সুলিভান তার পক্ষে আইনি প্রতিনিধিত্ব করছে। এস আলমের দাবি, তার সব বিদেশি বিনিয়োগ বৈধ উৎস থেকে অর্থায়িত হয়েছে এবং তিনি কোনো ধরনের অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত নন।
সাইপ্রাসে সম্পত্তি জব্দের নির্দেশের পরদিন বাংলাদেশের আদালত থেকেও তার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ রায় আসে। গত ২১ মে চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত-১ এস আলম, তার স্ত্রী, দুই ছেলে এবং পরিবারের অন্য সদস্যসহ মোট ১১ জনকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেন। ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে নেওয়া ৮৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে এই রায় দেওয়া হয়।
আদালত সূত্র অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওজি ট্রাভেলস লিমিটেডের জন্য ১৩৪টি বাস কেনার উদ্দেশ্যে ঋণটি নেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে এস আলমকে সাজা দিলেন।
এদিকে সিঙ্গাপুরেও বাড়ছে চাপ। ২০২৩ সালে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর দেশটি তার বিদেশি ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বাংলাদেশি তদন্তকারীদের দাবি, সিঙ্গাপুরে এস আলমের সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটি সিঙ্গাপুরি ডলারেরও বেশি।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে তিনি সিঙ্গাপুরে একাধিক বড় সম্পদ কিনেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ৩২৮ কক্ষের হোটেল গ্র্যান্ড চ্যান্সেলর সিঙ্গাপুর, লিটল ইন্ডিয়া এলাকার খুচরা বাণিজ্যিক সম্পত্তি এবং আইবিস সিঙ্গাপুর নোভেনা হোটেল। এসব বিনিয়োগের মোট মূল্য কয়েকশ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশের আদালত ইতোমধ্যে এস আলম, তার স্ত্রী এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও শেয়ার জব্দের নির্দেশ দিয়েছে। সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত আটটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার এবং কয়েক মিলিয়ন সিঙ্গাপুরি ডলারের বিনিয়োগও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সিঙ্গাপুরের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের বিএফআইইউর কাছে এস আলম গ্রুপের দেশি-বিদেশি সম্পদের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। এটি ইঙ্গিত করছে যে সিঙ্গাপুরের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আরও গুরুতর অভিযোগ করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এস আলম বিদেশে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৮৯ কোটি সিঙ্গাপুরি ডলার পর্যন্ত অর্থ পাচার করে থাকতে পারেন। কানালি লজিস্টিকস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীকালে এই প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে ভেনচুরা ইন্টারন্যাশনাল করা হয় এবং মালয়েশিয়ার হোটেল সম্পদ অধিগ্রহণে এটি ব্যবহৃত হয় বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ।
অন্যদিকে এস আলমের পক্ষে সিঙ্গাপুরভিত্তিক আইন সংস্থা ওং পার্টনারশিপ দাবি করেছে, বাংলাদেশের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের ভাষায়, সম্পদ জব্দের পদক্ষেপগুলো ‘অবৈধ, খামখেয়ালিপূর্ণ এবং বৈষম্যমূলক’।
এস আলমকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফর। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধান হিসেবে এটি তার প্রথম বিদেশ সফর। কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২১ ও ২২ জুন কুয়ালালামপুর সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
এই সফরের প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে থাকবে শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা এবং অভিবাসন সহযোগিতা। বিশেষ করে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। গত কয়েক বছরে শ্রমিক নিয়োগে অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় এবং প্রতারণার অভিযোগের কারণে শ্রমবাজারটি ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
দ্য এজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সুবিধা ভোগ করেছে। অনেক শ্রমিক চাকরির আশায় বিপুল ঋণ নিয়ে মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। ২০২৪ সালে শ্রমিক প্রবেশ বন্ধ হওয়ার ফলে প্রায় ১৮ হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি, যদিও তারা ইতোমধ্যে এজেন্টদের অর্থ পরিশোধ করেছিলেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০২ থেকে বাড়িয়ে ৪৩২-এ উন্নীত করার বিষয় বিবেচনা করছে। এর উদ্দেশ্য শ্রমবাজারকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে আরও উন্মুক্ত করা।
এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ায় এস আলম-সংশ্লিষ্ট সম্পদ এবং বাংলাদেশি শ্রমবাজার—দুটি বিষয় একই সময়ে আলোচনায় উঠে এসেছে। দ্য এজের ভাষ্য অনুযায়ী, কুয়ালালামপুরের ওই দুটি হোটেল কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রির জন্য বাজারে তোলা না হলেও কয়েক বছর আগে সেগুলোর সম্ভাব্য মূল্য ১২৫ কোটি রিঙ্গিত নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সম্পত্তি খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত বাজারমূল্য ৮৫ থেকে ৯৫ কোটি রিঙ্গিতের মধ্যে হওয়া উচিত।
এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাইপ্রাসে সম্পদ জব্দ, বাংলাদেশে আদালতের সাজা, সিঙ্গাপুরে আর্থিক তদন্ত এবং মালয়েশিয়ায় সম্পদের ওপর বাড়তি নজরদারি—সব মিলিয়ে এস আলমকে ঘিরে আন্তর্জাতিক তদন্ত এখন একটি সমন্বিত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ এটিকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক অপরাধের অনুসন্ধান হিসেবে বর্ণনা করছে।
একসময় বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত, শিল্পগোষ্ঠী এবং বিদেশে বিস্তৃত হোটেল ব্যবসার মাধ্যমে যে প্রভাববলয় গড়ে উঠেছিল, সেটি এখন বিভিন্ন দেশের আদালত, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে। তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল কী হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে চাপ ক্রমেই বাড়ছে, সে বিষয়ে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই।
খবরটি শেয়ার করুন