ফাইল ছবি
জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে সাম্প্রতিক বিতর্ক আবারও স্পষ্ট করে দিল—বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘সংস্কার’ কেবল নীতিগত বা আইনগত বিষয় নয়, বরং তা ক্ষমতা, বৈধতা ও জনমতের জটিল সমীকরণের অংশ।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানকে কেন্দ্র করে উত্থাপিত মুলতবি প্রস্তাবের ওপর দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারা এই অচলাবস্থারই প্রতিফলন।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত আলোচনায় সরকারি দল ও বিরোধী দল—উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। তবে সমাধানের পথ খোঁজার পরিবর্তে বিতর্কটি ক্রমেই আইনি ব্যাখ্যা বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতার দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে।
বৈধতা নিয়ে মূল দ্বন্দ্ব
সংবিধান সংস্কারকে কেন্দ্র করে বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’-এর বৈধতা। সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে এই আদেশকে সরাসরি “অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের যুক্তি—এটি না আইন, না অধ্যাদেশ; ফলে এর ভিত্তিতে কোনো সাংবিধানিক কাঠামো গঠন সম্ভব নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ গঠনের পর রাষ্ট্রপতির আইন জারির ক্ষমতা কার্যত সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। সেই বাস্তবতায় বর্তমান আদেশ জারির কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। তার প্রশ্ন—রাষ্ট্রপতি কীভাবে এবং কোন আইনি কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকবেন?
এখানেই সরকারি দলের অবস্থান স্পষ্ট: তারা সংস্কারের বিরোধী নয়, কিন্তু প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে আপসহীন। বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধন করতে হলে সংসদের ভেতরেই সাংবিধানিক পথ অনুসরণ করতে হবে; কোনো “বহিরাগত কাঠামো” বা “অবৈধ আদেশ” এর ভিত্তি হতে পারে না।
অন্যদিকে বিরোধী দল একেবারেই ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখছে। তাদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী গণভোট রাষ্ট্রপতিকে এই আদেশ জারির রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতা দিয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংসদে বলেন, জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করলে সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে।
এই অবস্থান দুটি মূলত দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিনিধিত্ব করে—একটি কঠোর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার পক্ষে, অন্যটি বিপ্লবোত্তর রাজনৈতিক বৈধতার পক্ষে।
গণভোট বনাম সংসদীয় সার্বভৌমত্ব
বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গণভোটের ভূমিকা। জুলাই সনদের ৪৮টি প্রস্তাবের ওপর অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়াকে বিরোধী দল একটি শক্তিশালী গণরায় হিসেবে দেখছে। তাদের যুক্তি, জনগণের এই মতামতকে বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন অপরিহার্য।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা এ ক্ষেত্রে অতীতের উদাহরণ টেনে আনেন। ১৯৭৭, এরশাদ আমল এবং ১৯৯১ সালের গণভোটের কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, এসব গণভোটও সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না, তবুও সেগুলোর ফল কার্যকর হয়েছে। ফলে বর্তমান গণভোটকে অসাংবিধানিক বলা হলে পূর্ববর্তী দৃষ্টান্তগুলোকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে।
সরকারি দলের যুক্তি এখানে ভিন্ন। তারা বলছে, গণভোটের প্রশ্নে “নোট অব ডিসেন্ট” বা ভিন্নমতের বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে। চারটি পৃথক প্রশ্নকে একত্রে একটি উত্তরে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে—যা গণভোটের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এখানে মূল সংঘাতটি দাঁড়ায়—সংসদ কি সর্বোচ্চ, নাকি সরাসরি জনগণের রায়? আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংসদে বলেন, “এই সংসদ সার্বভৌম। কোনো আইন দিয়ে সংসদকে বাধ্য করা যায় না।” অর্থাৎ, গণভোটের ফলাফল সংসদের ওপর বাধ্যতামূলক নয়—এমন একটি অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সংস্কার পরিষদ বনাম সংসদীয় কমিটি
সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য রয়েছে। বিরোধী দল সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে, যা জুলাই সনদের আলোকে একটি আলাদা কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।
কিন্তু সরকারি দল এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিকল্প হিসেবে একটি সর্বদলীয় বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষ থেকে দেওয়া এই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন বিল আনা হবে।
এই প্রস্তাব মূলত সংসদীয় প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সংস্কার সম্পন্ন করার একটি উদ্যোগ। এতে সংসদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে এবং বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে বিরোধী দল এই প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি। শফিকুর রহমান বলেন, যদি সংস্কার নিয়ে আলোচনাকে একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে নিয়ে যেতে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়, তবে তা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে তিনি শর্ত দেন—কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী দলের সমানসংখ্যক সদস্য থাকতে হবে, অন্যথায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাবেই সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে।
রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আত্মবিরোধিতা
সংসদের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে—রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানের মধ্যে আত্মবিরোধিতা। বিরোধী দলের দাবি, বিএনপি নিজেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে অংশ নিয়ে গণভোটের প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল। এমনকি সংসদ ও গণভোট একই দিনে করার প্রস্তাবও তাদের পক্ষ থেকেই এসেছে।
শফিকুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, যদি বিএনপি গণভোটকে সমর্থন করে থাকে, তাহলে এখন সেই ফলাফল অস্বীকার করছে কেন? তার ভাষায়, “তারা নিজেদের তৈরি করা জিনিসের স্ববিরোধিতা করতে পারে না।”
এই অভিযোগের জবাবে সরকারি দল সরাসরি কোনো পাল্টা যুক্তি না দিলেও তারা প্রক্রিয়ার ত্রুটির ওপর জোর দিচ্ছে। অর্থাৎ, তারা গণভোটের ধারণাকে অস্বীকার করছে না, বরং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সংবিধান বনাম ‘বিপ্লবী বৈধতা’
এই বিতর্কের গভীরে রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সংবিধান কি সবসময় চূড়ান্ত, নাকি বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তা অতিক্রম করা যায়?
এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন সংসদে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে কার্যত কোনো সরকার ছিল না। সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ—সংসদ ভেঙে দেওয়া, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, উপদেষ্টাদের শপথ—এসব কিছুই সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তবুও সেগুলো বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই যুক্তি মূলত ‘বিপ্লবী বৈধতা’র ধারণাকে সামনে আনে—যেখানে জনগণের অভ্যুত্থান বা সম্মিলিত ইচ্ছা সংবিধানের বাইরে গিয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
সরকারি দল এই যুক্তিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করলেও তারা এখন সেই বাস্তবতাকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে আনতে চায়। আইনমন্ত্রীর ভাষায়, “চব্বিশের সমঝোতার দলিল হিসেবে আমরা সংবিধানের পথ ধরে হেঁটে যাব।”
আইনি প্রশ্ন ও বিচার বিভাগের ভূমিকা
সংবিধান সংস্কার আদেশের বৈধতা নিয়ে আদালতে রিট হওয়া এবং রুল জারি হওয়াও আলোচনায় উঠে এসেছে। বিরোধী দলের যুক্তি—যদি এটি আইন না হতো, তাহলে আদালত রিট গ্রহণ করত না। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এই বিতর্কের চূড়ান্ত মীমাংসা কোথায়? সংসদে, নাকি আদালতে?
সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা বিচার বিভাগের হাতে। ফলে শেষ পর্যন্ত এই সংকট আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে—যা রাজনৈতিক সমাধানকে আরও জটিল করে তুলবে।
অচলাবস্থার ভবিষ্যৎ
দুই ঘণ্টার আলোচনার পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই আলোচনা সমাপ্ত ঘোষণা করেন। এটি কেবল একটি সংসদীয় প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নয়, বরং রাজনৈতিক অচলাবস্থার প্রতীক।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি সম্ভাব্য পথ সামনে রয়েছে—প্রথমত, সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন। দ্বিতীয়ত, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের মাধ্যমে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন।
তৃতীয়ত, আদালতের মাধ্যমে বৈধতার চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নির্ধারণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই তিনটির কোনোটিই সহজ নয়। রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে দ্বন্দ্ব সমাধানের পথকে কঠিন করে তুলেছে।
সংবিধান সংস্কার নিয়ে জাতীয় সংসদের এই বিতর্ক মূলত একটি বৃহত্তর প্রশ্নের প্রতিফলন—রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস কোথায়? সংবিধানে, নাকি জনগণের সরাসরি রায়ে?
সরকারি দল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও সংসদের সার্বভৌমত্বকে প্রাধান্য দিচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধী দল গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত জনমতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় না হলে সংবিধান সংস্কারের পথ দীর্ঘায়িত হবে বলেই মনে হচ্ছে।
সমাধান হয়তো একপক্ষের জয় নয়, বরং একটি মধ্যপন্থায়—যেখানে গণভোটের রাজনৈতিক বার্তা ও সংবিধানের আইনি কাঠামো—উভয়কেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু সেই সমঝোতার রাজনৈতিক সদিচ্ছা তৈরি না হলে, বর্তমান অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল।
খবরটি শেয়ার করুন