মঙ্গলবার, ৩১শে মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ই চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** শওকত মাহমুদের গ্রেপ্তার ও নতুন মামলার পর সাংবাদিক সমাজের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন *** ‘৮ বছর টিকা দেওয়া হয়নি’—স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি কতটা সত্য, বাস্তব চিত্র কী বলছে *** সিরাজগঞ্জে জ্বালানি নিতে ‘ফুয়েল কার্ড’ বাধ্যতামূলক, ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর *** তাজু ভাই ২.০: ভাইরালের আড়ালে এক চরজীবনের গল্প *** আসিফ মাহমুদের ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার দাবি ‘চরম মিথ্যাচার’: আনিস আলমগীর *** মঙ্গল শোভাযাত্রা ও আনন্দ শোভাযাত্রার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই: সংস্কৃতিমন্ত্রী *** জ্বালানি ইস্যুতে ২৪ ঘণ্টায় ৩৯১ অভিযান, ৮৭ হাজার লিটার মজুদ তেল উদ্ধার *** হামের সব পরীক্ষা রাজধানীকেন্দ্রিক: ঢাকার বাইরে চিকিৎসা বিলম্ব, বাড়ছে ঝুঁকি *** অবৈধ পথে ইউরোপযাত্রায় বছরে কত বাংলাদেশি মারা যাচ্ছেন *** পরিবারের দুঃখ ভুলতেই ভিডিও করেন তাইজুল, ভাইরাল হয়ে ওঠা এক সরল মানুষের গল্প

শওকত মাহমুদের গ্রেপ্তার ও নতুন মামলার পর সাংবাদিক সমাজের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১০:০০ অপরাহ্ন, ৩১শে মার্চ ২০২৬

#

ফাইল ছবি

'রহস্যময় রাজনৈতিক চরিত্রের অধিকারী' সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার আমলে প্রতারণায় জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। এই অভিযোগে বিএনপির সাবেক নেতা, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও জনতা পার্টির মহাসচিব শওকত মাহমুদকে ২০২৫ সালে গ্রেপ্তার করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের সাবেক সরকার।

এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক এনায়েত করিম চৌধুরীকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। সেই মামলায় শওকত মাহমুদকে পরে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

ওই অভিযোগে শওকত মাহমুদসহ মোট দুজন সাংবাদিক এই পর্যন্ত গ্রেপ্তার হন। এনায়েত করিমের সঙ্গে মিলে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রতারণা করার গুরুতর অভিযোগ আছে শওকত মাহমুদের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগে আরো কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান বলে ড. ইউনূস সরকারের প্রশাসন জানায়।

ওই সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে এলে তদন্ত কার্যক্রম থেমে যায়। তবে ওই মামলার পাশাপাশি কারাবন্দী সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদকে নতুন করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। নতুন করে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ফলে তার মুক্তির সম্ভাবনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে আইনজীবীরা মনে করছেন।

এই ঘটনায় সাংবাদিক সমাজে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ‘মঞ্চ ৭১’ নামের সংগঠনের সঙ্গে শওকত মাহমুদের সংশ্লিষ্টতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেক সাংবাদিক বলছেন, এই সংগঠনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা আগে শোনা যায়নি। ফলে হঠাৎ করে তাকে এই মামলায় যুক্ত করা কতটা যৌক্তিক—সে প্রশ্ন উঠছে।

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই শওকত মাহমুদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি এখন তদন্তাধীন থাকায় এ নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করতে নারাজ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

শওকত মাহমুদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে সাংবাদিকদের একটি বড় অংশের নীরবতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চাইছেন, বিএনপির সাবেক নেতা ও দলটির শুভাকাঙ্ক্ষী শওকত মাহমুদের বিরুদ্ধে বিএনপি সরকারের আমলে এই ধরনের মামলা কেন দায়ের হলো, কেন সাংবাদিক সমাজের এই নীরবতা, এবং এই মামলায় তার সংশ্লিষ্টতার ভিত্তি কতটা দৃঢ়। একই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অন্য আসামিরা ইতোমধ্যে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

ওই মামলায় আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন এবং মঞ্জুরুল আলম পান্না আদালতের মাধ্যমে জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়েছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—একই মামলায় অন্যরা জামিন পেলেও শওকত মাহমুদ কেন এখনো কারাগারে?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্তে প্রাপ্ত নতুন তথ্য বা আলাদা অভিযোগ থাকলে আদালত ভিন্নভাবে বিবেচনা করতে পারেন। তবে একই ধরনের অভিযোগে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ হলে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এদিকে সাংবাদিক সমাজের একাংশ মনে করছে, বিষয়টি নিয়ে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। বিশেষ করে তদন্তের অগ্রগতি এবং অভিযোগের ভিত্তি পরিষ্কার করা হলে বিভ্রান্তি কমবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং পেশাগত সংহতির বিষয়টিও সামনে এসেছে।

একজন সাংবাদিক নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার পর পেশাজীবী সংগঠনগুলোর ভূমিকা কী হওয়া উচিত—তা নিয়েও আলোচনা চলছে নেটিজেনদের মধ্যে। শওকত মাহমুদের গ্রেপ্তার এবং তা ঘিরে নীরবতা—উভয়ই এখন প্রশ্নের মুখে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও মতপ্রকাশের পরিসর নিয়ে নানা বিতর্কের মধ্যে এই গ্রেপ্তার নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগ নিয়ে আগেও বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

শওকত মাহমুদের মতো একজন পরিচিত সাংবাদিক নেতার গ্রেপ্তারের পর সাংবাদিক সমাজের বড় অংশের নীরবতা অনেককে বিস্মিত করেছে। বিশেষ করে বিএনপিপন্থি সাংবাদিকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিবাদ না আসায় এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা চলছে।

কয়েকজন সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুখবর ডটকমকে জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, মামলার প্রকৃতি এবং অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় অনেকেই প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে দ্বিধা করছেন। তবে এই গ্রেপ্তারের সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কোনো সম্পর্ক নেই বলে মূলধারার অনেক সাংবাদিকের অভিমত।

জানা গেছে, গতকাল সোমবার ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত শাহবাগ থানায় দায়ের করা একটি মামলায় শওকত মাহমুদকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। মামলাটি করা হয়েছে ‘মঞ্চ ৭১’ নামে সংগঠনের আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠককে কেন্দ্র করে, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে—রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের লক্ষ্যে গত বছরের ৫ আগস্ট ‘মঞ্চ ৭১’ নামে একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে।

পরবর্তীতে ২৮ আগস্ট রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—তারা ওই সময়ের অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাতের উদ্দেশ্যে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন এবং ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।

এই মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন এবং সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাসহ মোট ১৬ জন। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৭০ থেকে ৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শওকত মাহমুদের নাম শুরুতে এজাহারে ছিল না। পরবর্তীতে তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তাকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

প্রাথমিক তদন্তে শওকত মাহমুদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও দাবি করা হয় আবেদনে। এতে বলা হয়, তিনি দলীয় লোকজন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারমূলক সভা করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়।

তথ্যমতে, গত অক্টোবরে সাংবাদিক আজহার আলী সরকারকে ঢাকার রমনা থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্তসংশ্লিষ্টেরা তখন বলেন, ড. ইউনূসের সরকারকে 'উৎখাতের' ষড়যন্ত্রের অভিযোগে করা মামলায় এনায়েত করিম চৌধুরী মাসুদ করিমের সহযোগী ছিলেন আজহার।

আজহার আলী সরকার একসময় সাংবাদিকতা করতেন। তিনি আমাদের সময় পত্রিকায় কাজ করেছেন। তবে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি কোনো গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলে সুখবর ডটকমকে জানিয়েছে তার পরিবার। এরপর এই মামলায় শওকত মাহমুদ গ্রেপ্তার হন।

বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একটি সূত্র সুখবর ডটকমকে জানায়, 'প্রতারক' এনায়েত করিম ও শওকত মাহমুদের প্রতারণার 'ফাঁদে' পা না দিতে দলটির শীর্ষ কয়েক নেতাকে ২০২১ সালেই মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়। বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতাকে শওকত মাহমুদ ও এনায়েত করিমের সঙ্গে বিদেশে বৈঠক করায় দলের পক্ষে শোকজও করা হয় ওই বছর।

গোয়েন্দা সূত্র সুখবর ডটকমকে জানিয়েছে, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শওকত মাহমুদের সঙ্গে সখ্য গড়ে এনায়েত করিম প্রতারণা চালিয়ে গেছেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে এনায়েতের যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। নিজেকে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গে প্রতারণা করতেন তিনি।

এর আগে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার আমলেও (২০০১-০৬ সাল) একবার এনায়েতকে প্রতারণার অভিযোগে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

অনুসন্ধান বলছে, গত আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে এনায়েত বিএনপিসহ একাধিক দলের বিভিন্ন নেতাকে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তখন তিনি তাদের কাছে নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রভাবশালী সংস্থার লোক বলে পরিচয় দেন। তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে এনায়েত ব্যাংকক ও নেপালে একাধিক বৈঠকও করেন। বৈঠক আয়োজনে আওয়ামী লীগের সাবেক সরকার সহযোগিতা করত বলে অভিযোগ আছে।

এসব বৈঠকের সমন্বয়ক ছিলেন শওকত মাহমুদ। তার 'ফাঁদে পা দিয়ে' বিএনপিসহ কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন সেসব বৈঠকে। বৈঠকে উপস্থিত থাকায় বিএনপি শওকত মাহমুদ ও দলটির আরেক শীর্ষ নেতাকে কারণ দর্শানোর চিঠিও দেয়। এ বিষয়ে ২০২১ সালের ২১ মার্চ দৈনিক প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও অনেক নেতার কাছ থেকে অর্থ নেন এনায়েত। ২০১৮ সালের পর সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তিনি প্রতারণা চালিয়ে গেছেন।

শওকত মাহমুদ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250