ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক একাধিক সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিশুদের ভাগ্য অনেক ভালো। বয়স দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে দেশের ৮২ শতাংশ শিশু জীবনরক্ষাকারী টিকা পায়। কিছু ক্ষেত্রে এই হার ৯৯ শাতংশ। টিকার এই সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রসংশিত হয়েছে। এর পেছনে আছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই।
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকায় টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, “আট বছর আগে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল, এরপর আর দেওয়া হয়নি।”
তার এই মন্তব্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে—আসলে কি দেশে টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ ছিল?
তবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত ছিল এবং উচ্চহারে টিকাদান নিশ্চিত করা হয়েছে অন্তত ২০২৩ সাল পর্যন্ত।
‘ভ্যাকসিন হিরো’ স্বীকৃতি ও বাংলাদেশের অর্জন
দেশের টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃত। ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননা দেয় গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন এলায়েন্স। এই পুরস্কার শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেন সংস্থাটির তৎকালীন বোর্ড চেয়ার নগচি ওকোনজো-আইয়েলা।
দেশে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির অনন্য সাফল্যের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননায় ভূষিত হন। এই স্বীকৃতি কেবল প্রতীকী নয়; এটি দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পোলিও নির্মূল, মা ও নবজাতকের ধনুষ্টংকার নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অর্জন করেছে। ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকে শেখ হাসিনার সরকারের পোলিওমুক্ত সনদ পাওয়া তারই একটি উদাহরণ।
টিকাদান কর্মসূচি কি সত্যিই বন্ধ ছিল?
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর থেকে দেশে হাম টিকা দেওয়া হয়নি—এমন ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু সরকারি তথ্য বলছে ভিন্ন কথা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১২ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে টিকাদানের হার ছিল সর্বনিম্ন ৮৯.৪ শতাংশ (২০১৮ সালে) এবং সর্বোচ্চ ১০৩.৬ শতাংশ (২০২২ সালে)। শতভাগের বেশি কভারেজের কারণ হিসেবে ধরা হয়, পূর্বে বাদ পড়া শিশুরাও পরবর্তী সময়ে টিকার আওতায় এসেছে।
এতে স্পষ্ট যে, টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ ছিল না; বরং ধারাবাহিকভাবে উচ্চ কভারেজ বজায় ছিল। এমনকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদও আজ বিকেলে সুখবর ডটকমকে নিশ্চিত করেছেন, “প্রতিবছরই বাংলাদেশে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে, কোনো বছরই বাদ যায়নি।”
রুটিন টিকা বনাম ক্যাম্পেইন—বিভ্রান্তির উৎস
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভ্রান্তি থাকতে পারে—রুটিন টিকাদান ও বড় আকারের ক্যাম্পেইনের মধ্যে পার্থক্য।
বাংলাদেশে টিকাদান মূলত দুইভাবে হয়: ১. রুটিন ইপিআই টিকাদান: নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শিশুদের টিকা দেওয়া হয়; ২.ক্যাম্পেইন বা গণটিকাদান কর্মসূচি: নির্দিষ্ট সময়ে দেশজুড়ে বিশেষ উদ্যোগ। মন্ত্রী হয়তো বড় আকারের ক্যাম্পেইনের কথা বলতে গিয়ে “টিকা দেওয়া হয়নি” মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এটিকে পুরো টিকাদান বন্ধ থাকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা বিভ্রান্তিকর।
তাছাড়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসেও দেশে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়েছে। ফলে “২০১৮ সালের পর কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি”—এই দাবি সঠিক নয়।
সাম্প্রতিক পতন: আসল সংকট কোথায়?
যেখানে বিতর্কের কেন্দ্র “৮ বছর টিকা দেওয়া হয়নি”, বাস্তব সংকটটি অন্য জায়গায়। ২০২৩ সালের পর থেকে টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ২০২৪ সালে কভারেজ নেমে আসে ৮৬.৬ শতাংশে, ২০২৫ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৫৯.৬ শতাংশে। এই পতনই বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন। এই হার ৭০ শতাংশের নিচে নামলে প্রাদুর্ভাব প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।
কেন তৈরি হলো ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’?
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে: কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব: নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হয়েছে, শহরের বস্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকার ঘাটতি, অভ্যন্তরীণ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জনসংখ্যা স্থানান্তর (মাইগ্রেশন), মনিটরিং ও ফলোআপে দুর্বলতা ও টিকা না পাওয়া শিশুদের সংখ্যা বৃদ্ধি। এই সব মিলিয়ে একটি “ইমিউনিটি গ্যাপ” তৈরি হয়েছে, যার ফলে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
শিশুরা কেন ঝুঁকিতে?
দেশে সাধারণত শিশুদের দুই ডোজ হাম টিকা দেওয়া হয়: প্রথম ডোজ: ৯ মাস বয়সে আর দ্বিতীয় ডোজ: ১৫ মাস বয়সে। ধারণা করা হয়, মায়ের শরীর থেকে প্রাপ্ত অ্যান্টিবডি শিশুকে প্রথম ৯ মাস কিছুটা সুরক্ষা দেয়। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, ৯ মাসের আগেই অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে টিকাদানের সময়সূচি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে বলে মত দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: ভুল বার্তার ঝুঁকি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—এ ধরনের ভুল বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, মন্ত্রীর বক্তব্য মাঠপর্যায়ে প্রভাব ফেলে। যদি বলা হয় বহু বছর টিকা দেওয়া হয়নি, তাহলে স্বাস্থ্যকর্মীরা বিভ্রান্ত হতে পারেন, এমনকি টিকা থাকা সত্ত্বেও না থাকার ধারণা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে: টিকাদান কর্মসূচির ওপর আস্থা কমতে পারে, অভিভাবকদের মধ্যে ভীতি তৈরি হতে পারে, নীতিনির্ধারণে ভুল দিকনির্দেশনা আসতে পারে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: দেশের টিকাদান যাত্রা
বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয় ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে। শুরুতে মাত্র ছয়টি রোগের টিকা দেওয়া হতো: যক্ষ্মা, ডিফথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, পোলিও এবং হাম। প্রথমদিকে এই সেবা সীমিত ছিল শহরকেন্দ্রিক। ১৯৮৫ সালের আগে মাত্র ২–৩ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় ছিল। পরে ইউনিভার্সাল চাইল্ডহুড ইমিউনাইজেশন কর্মসূচির মাধ্যমে তা দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়। ২০০১ সালে যেখানে টিকাদানের আওতা ছিল ৫২ শতাংশ, তা ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮৪ শতাংশে।
সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে বলা যায়- বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ ছিল না। নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রম চালু ছিল এবং উচ্চ কভারেজ বজায় ছিল অন্তত ২০২৩ সাল পর্যন্ত। ২০২৪–২৫ সালে কভারেজ কমে যাওয়াই বর্তমান প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ। অতএব, “৮ বছর টিকা দেওয়া হয়নি”—এই বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বরং এটি আংশিক তথ্য বা বিভ্রান্তির ফল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো—টিকাদানের কভারেজ দ্রুত বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা এবং জনসাধারণের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন করা। কারণ, টিকাদান নিয়ে ভুল বার্তা শুধু বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করে না—এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন