ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) এক প্রসিকিউটরের ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে ঘুষের অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ অনিয়ম এবং গুরুত্বপূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ উধাও হওয়ার ঘটনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এখন তদন্ত কমিটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি আইসিটির প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদ একটি ফেসবুক পোস্টে গুরুতর অভিযোগ তোলেন। পোস্টে তিনি দাবি করেন, একটি মামলার আসামি পুলিশের সাবেক উপপরিদর্শক শেখ আবজালুল হকের স্ত্রী একটি ভারী ব্যাগ নিয়ে এক প্রভাবশালী প্রসিকিউটরের চেম্বারে প্রবেশ করেছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, টাকার বিনিময়ে ওই আসামিকে পরে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি খালাস পান।
এই অভিযোগের ইঙ্গিতকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রসিকিউটর। তাদের ভাষ্য, ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ওই ঘটনার পর থেকেই প্রসিকিউশন টিমের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। সুলতান মাহমুদ তার পোস্টে আরও দাবি করেন, তিনি এবং আরও কয়েকজন প্রসিকিউটর বিষয়টি তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে জানিয়েছিলেন। তবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং প্রসিকিউটর (প্রশাসন) গাজী মোনাওয়ার হোসাইন তামিমকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করায় তাকে তিরস্কার করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে অভিযুক্ত প্রসিকিউটর তামিম ও সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে বিষয়টি এখনো এক পক্ষের দাবি হিসেবেই রয়েছে।
এদিকে আইসিটি প্রসিকিউশন টিমের সদস্যদের বিরুদ্ধে অনৈতিক আচরণের আরও কিছু অভিযোগ সামনে আসার পর গত ১০ মার্চ চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি ‘ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং’ কমিটি গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্টদের নোটিশ দিয়ে তাদের জবানবন্দি নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হবে।
তবে তদন্তের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সিসিটিভি ফুটেজ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর ট্রাইব্যুনালের একটি হার্ডড্রাইভ বদলে ফেলা হয়েছে, যেখানে ওই দিনের ফুটেজ থাকার কথা ছিল।
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক প্রসিকিউটর জানান, আইসিটির প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা সিস্টেম লগ পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখতে পান, ট্রাইব্যুনালের প্রবেশপথ ও তামিমের অফিসের বাইরের করিডোরের ফুটেজ ধারণ করা হার্ডড্রাইভটি আগেই পরিবর্তন করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরের নির্দেশে ফুটেজ উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়েই বিষয়টি সামনে আসে। তবে এ বিষয়ে জোহা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী, রেকর্ডারের হার্ডড্রাইভটি ‘ক্ষতিগ্রস্ত বা হ্যাকড’ হওয়ার খবর পাওয়া যায় এবং ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর সরকারি নির্দেশনায় তা বদলে ফেলা হয়।
ট্রাইব্যুনালের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. নাসির উদ্দিন বলেন, তিনি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরদিন গণপূর্ত বিভাগের কর্মীদের উপস্থিতিতে নতুন হার্ডড্রাইভ বসান। তবে সেটি নষ্ট হয়েছিল নাকি হ্যাক হয়েছিল—এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “সবকিছু তদন্ত করা হবে। এখনই কিছু বলছি না। তবে যা তথ্য বেরিয়ে আসবে, তার সমাধান করা হবে।”
অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার এএসএম রুহুল ইমরান বলেন, কোনো সিসিটিভি সরঞ্জাম নষ্ট হলে তা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে বদলে ফেলা হয়। তিনি দাবি করেন, কোনো নির্দিষ্ট ক্যামেরার অংশ আলাদাভাবে পরিবর্তন করা হয়নি। সুলতান মাহমুদের ফুটেজ চাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সেটি ছিল মৌখিক অনুরোধ; লিখিত আবেদন না থাকায় তা দেওয়া হয়নি।
হার্ডড্রাইভ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি বরুণ জানান, ড্রাইভটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ওয়ারেন্টির আওতায় নতুনটি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, প্রতিটি এনভিআরে তিনটি করে ড্রাইভ থাকে, যা সর্বোচ্চ ১০ দিনের ফুটেজ সংরক্ষণ করতে পারে। এরপর পুরোনো ডেটার ওপর নতুন ডেটা সংরক্ষিত হয়।
তবে এসব ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রসিকিউটর। তাদের প্রশ্ন, অভিযোগ ওঠার পরও কেন সংশ্লিষ্ট হার্ডড্রাইভটি সংরক্ষণ করা হলো না? তাদের মতে, হ্যাকিংয়ের সন্দেহ থাকলে জিডি করা এবং ফরেনসিক পরীক্ষা চালানো উচিত ছিল। এতে মুছে ফেলা ফুটেজ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা থাকত।
সব মিলিয়ে ঘুষের অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রমাণের অনুপস্থিতি—এই তিনটি বিষয় এখন আইসিটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।
খবরটি শেয়ার করুন