সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বাড়ছে হুতিদের হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মুখে ইরানের হুঁশিয়ারি *** জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী *** সাগরে শক্তিশালী হচ্ছে লঘুচাপ, ৬ অঞ্চলে ৬০ কিমি ঝড়ের আভাস *** আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যেভাবে ছড়াল আগুন *** আশুলিয়ায় কাভার্ড ভ্যান থেকে ৬ লাশ উদ্ধার *** জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথম স্ত্রীসহ থানায় এমপি নজরুল *** সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা *** কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন *** শিল্পকলা একাডেমির সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, পল্লবীতে বাসে আগুন *** ন্যাম ভবন থেকে সাতক্ষীরার এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার

সুখবর এক্সপ্লেইনার

সরকার প্রকাশ্যে বলছে এক রকম, ঘটছে যেন অন্য রকম

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ১১:২৩ অপরাহ্ন, ২৩শে জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কয়েক দিন ধরেই জোর আলোচনা চলছে। তবে সরকারিভাবে কেউ বিষয়টি নিশ্চিত করছেন না। মন্ত্রীরা বলছেন, তাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। কিন্তু একই সময়ে কয়েকটি ঘটনা এমনভাবে সামনে এসেছে, যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নতুন করে কৌতূহল তৈরি করেছে।

বিশেষ করে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের বিদেশ সফর নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।

সব মিলিয়ে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে সরকারের প্রকাশ্য বক্তব্য ও বাস্তবে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে একটি স্পষ্ট অমিল দেখছেন বিশ্লেষকেরা। সরকার বলছে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। কিন্তু সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির বিদেশ সফরের হঠাৎ পরিবর্তন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসার জন্য ১৯ জুলাই থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে যান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সফরসূচি অনুযায়ী, তার ২৬ জুলাই দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু আজ বৃহস্পতিবার হঠাৎ সেই সূচি পরিবর্তন করা হয়। এখন তিনি শুক্রবার দুপুরে ঢাকায় ফিরছেন। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই দেশে ফিরছেন তিনি।

এই সময় পরিবর্তনকে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আরও গতি পেয়েছে। কারণ সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে বা কোনো কারণে দায়িত্ব পালন করতে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকারই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। আবার রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্রও জমা দিতে হয় স্পিকারের কাছেই।

ফলে স্পিকারের হঠাৎ দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্তকে অনেকেই কেবল ব্যক্তিগত বা চিকিৎসাসংক্রান্ত সফরের পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না। বরং এটি রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। অবশ্য সংসদ সচিবালয় থেকে স্পিকারের সফর সংক্ষিপ্ত করার কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। সরকারও এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

একই দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যও আলোচনায় এসেছে। তিনি একদিকে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি যদি স্বাস্থ্যগত বা অন্য কোনো কারণে পদত্যাগ করতে চান, তাহলে সংবিধান তাকে সেই সুযোগ দিয়েছে। অন্যদিকে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেই এবং তিনি নিজেও পত্রিকায় প্রকাশিত খবর ছাড়া আর কিছু জানেন না।

সাংবাদিকেরা জানতে চেয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ আছে কি না। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতি যদি পদত্যাগ করতে চান, তাহলে সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। এর বাইরে তিনি কিছু জানেন না।

এ বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের খবর অস্বীকারও করছে না, আবার নিশ্চিতও করছে না। বরং পুরো বিষয়টিকে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সাংবিধানিক সিদ্ধান্তের বিষয় হিসেবে তুলে ধরছে।

তবে দিনের শেষে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকেরা একই প্রশ্ন আবার করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন। তিনি বলেন, "শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।"

এই একটি বাক্যই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ যদি সরকারের কাছে সত্যিই কোনো তথ্য না থাকে, তাহলে শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ কেন দেওয়া হলো—সেই প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক মহলে। অনেকেই মনে করছেন, হয়তো শুক্রবার কোনো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক ঘটনা ঘটতে পারে। যদিও মন্ত্রী নিজে এ বিষয়ে আর কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের বক্তব্যও একই ধরনের। সাংবাদিকেরা তাকে প্রশ্ন করেন, বিদেশে চিকিৎসার সময় রাষ্ট্রপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, সে বিষয়ে সরকার কোনো তদন্ত করছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। যদি খবরটি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সরকার এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় তদন্ত করবে।

অর্থাৎ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। আবার পুরোপুরি নাকচও করেননি। তার বক্তব্য ছিল তথ্য না থাকার ওপর ভিত্তি করে।

এভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী—দুজনই মূলত বলেছেন, তাদের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তারা রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে কোনো ইঙ্গিত দেননি। তবে একই সময়ে স্পিকারের সফরসূচির আকস্মিক পরিবর্তন রাজনৈতিক আলোচনা আরও তীব্র করেছে।

রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের পেছনে শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি সামনে আসছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, অসুস্থতাকেই পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হতে পারে। যদিও রাষ্ট্রপতি নিজে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি।

অন্যদিকে রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে সরকার বা বিএনপি—কোনো পক্ষই প্রকাশ্যে এসব তথ্য স্বীকার করেনি।

মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। কিন্তু ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা পুরোপুরি বদলে যায়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা হারায়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। পরে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করে।

ফলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। যদিও সরকার পরিবর্তনের পরও রাষ্ট্রপতিকে তাৎক্ষণিকভাবে অপসারণ বা পদত্যাগের কোনো উদ্যোগ প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।

তবে গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা ছিল। ছাত্র আন্দোলনের নেতারা তার পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও হয়েছিল। কিন্তু তখন অন্তর্বর্তী সরকার তাকে সরানোর পথে যায়নি।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই আলোচনা আবার সামনে এসেছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সর্বোচ্চ ৯০ দিনের সময় রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। ফলে স্পিকারের উপস্থিতি সাংবিধানিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই কারণেই তার বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে আসাকে অনেকেই সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

সব মিলিয়ে ঘটনাপ্রবাহ এমন একটি অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে সরকার প্রকাশ্যে বলছে তাদের কাছে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। মন্ত্রীরাও একই কথা বলছেন। কিন্তু একই সময়ে স্পিকারের নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরে আসা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর "শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করেন" মন্তব্য এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান আলোচনার কারণে পরিস্থিতি নিয়ে কৌতূহল আরও বেড়েছে।

এখন নজর আগামীকাল শুক্রবারের দিকে। কারণ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান অপরিবর্তিত থাকলেও বাস্তব ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশের সাংবিধানিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নিজে, বঙ্গভবন কিংবা সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা না দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত পুরো বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনা ও জল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

তবে একের পর এক ঘটনার ধারাবাহিকতা এটুকু স্পষ্ট করেছে যে, রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা এখন আর নিছক গুঞ্জনের পর্যায়ে নেই; বরং দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

মো. সাহাবুদ্দিন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250