ফাইল ছবি
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় হঠাৎ করেই আজ বৃহস্পতিবার ফিরে এসেছে কয়েক বছর আগের একটি বহুল আলোচিত ঘটনা। ঢাকা-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক খেলাফত মজলিসের নেতা মামুনুল হকের অতীতের একটি বিতর্কিত ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে বক্তব্য দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সংসদে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ওই বক্তব্যের অংশ বিশেষ কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করার নির্দেশ দেন।
সংসদে খন্দকার আবু আশফাক প্রশ্ন তোলেন, “মুতাহ বিয়ে কী?” একই সঙ্গে তিনি ২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের একটি রিসোর্টে মামুনুল হককে একজন নারীসহ পাওয়া যাওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেন। তবে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সংসদে দাঁড়িয়ে দাবি করেন, মামুনুল হক কোনো মুতাহ বিয়ে করেননি এবং ওই নারী তার বৈধ স্ত্রী ছিলেন। স্পিকারও আলোচনাটি বন্ধ করে দিয়ে বলেন, যার সংসদে এসে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই, তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা সমীচীন নয়।
২০২১ সালের ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের রয়্যাল রিসোর্টে মামুনুল হককে এক নারীসহ অবস্থান করতে দেখা যায়। ঘটনাটি দ্রুত দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, স্থানীয় লোকজন ও রাজনৈতিক কর্মীরা রিসোর্টে গিয়ে তাকে ঘিরে ফেলেন। পরে মামুনুল হক ওই নারীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন।
ঘটনার পর বিষয়টি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে এক বক্তব্যে বলেন, রিসোর্টে থাকা নারী মামুনুল হকের স্ত্রী নন বলে সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে। অন্যদিকে মামুনুল হক ও তার সমর্থকেরা শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন যে, ওই নারী তার শরিয়তসম্মত দ্বিতীয় স্ত্রী।
এই বিতর্কের মধ্যেই জনপরিসরে আলোচিত হতে থাকে “মুতাহ বিয়ে” শব্দটি। ইসলামী আইনশাস্ত্রে মুতাহ বিয়ে মূলত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সম্পাদিত একটি চুক্তিভিত্তিক বিবাহব্যবস্থা, যা শিয়া ইসলামের কিছু ধারায় বৈধ হিসেবে বিবেচিত হলেও সুন্নি মাজহাবগুলো তা গ্রহণ করে না। দেশের অধিকাংশ আলেম, বিশেষ করে দেওবন্দি ও হানাফি ধারার আলেমরা মুতাহ বিয়েকে অবৈধ বলে মনে করেন। ফলে কোনো সুন্নি ধর্মীয় নেতার সঙ্গে মুতাহ বিয়ের অভিযোগ বা গুঞ্জন যুক্ত হলে তা স্বাভাবিকভাবেই বড় বিতর্কের জন্ম দেয়।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, ইসলামে বহুবিবাহ অনুমোদিত হলেও সেটি নিঃশর্ত নয়। কোরআনে চারটি পর্যন্ত বিয়ের অনুমতি থাকলেও সব স্ত্রীর প্রতি সমান ন্যায়বিচার ও ভরণপোষণের সক্ষমতার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলেন, বহুবিবাহকে ধর্মীয় মর্যাদার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা কিংবা ব্যক্তিগত ভোগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও ইসলামী আইন গবেষকদের অনেকে অতীতে বিভিন্ন আলোচনায় বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বহুবিবাহের বিষয়টি প্রায়ই ধর্মীয় বিধানের চেয়ে সামাজিক ক্ষমতা ও পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত হয়ে ওঠে। তাদের মতে, একজন ধর্মীয় নেতার ব্যক্তিগত জীবন সাধারণ মানুষের কাছে আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তার আচরণ নিয়ে জনস্বার্থের প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
দেশে ধর্মীয় নেতাদের বহুবিবাহ নতুন কোনো বিষয় নয়। বিভিন্ন সময় একাধিক আলেম বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিয়ের খবর গণমাধ্যমে এসেছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিতর্ক তৈরি হয়েছে বিয়ের বৈধতা নয়, বরং তথ্য গোপন, সামাজিক দায়বদ্ধতা কিংবা নৈতিক অবস্থানের প্রশ্নে। বিশেষ করে যারা প্রকাশ্যে নারীর অধিকার, পারিবারিক মূল্যবোধ বা সামাজিক নৈতিকতা নিয়ে বক্তব্য দেন, তাদের ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনা সাধারণ মানুষের বাড়তি আগ্রহের কারণ হয়ে ওঠে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, জনপরিসরে ধর্মীয় নেতাদের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা সাধারণ রাজনীতিকদের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে কোনো ধর্মীয় নেতার ব্যক্তিগত জীবনের বিতর্ক রাজনৈতিক নেতার তুলনায় অনেক বেশি আলোচিত হয়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে এসব ঘটনা দ্রুত ভাইরাল হয়ে জনমতকে প্রভাবিত করে।
মামুনুল হকের ক্ষেত্রে ঘটনাটি আরও বেশি আলোচিত হওয়ার কারণ ছিল তার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে সরব ভূমিকা পালন করেছেন এবং হেফাজতে ইসলাম ও খেলাফতপন্থী রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ওঠা প্রশ্ন দ্রুত জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়।
তবে আইনি ও নৈতিক প্রশ্নের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। মানবাধিকারকর্মীদের একটি অংশ তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন, কোনো ব্যক্তির হোটেল কক্ষে জোরপূর্বক প্রবেশ, ভিডিও ধারণ এবং তা প্রকাশ করা কতটা আইনসঙ্গত। অন্যদিকে সমালোচকেরা যুক্তি দেন, জননেতা বা ধর্মীয় নেতাদের ক্ষেত্রে জনস্বার্থের প্রশ্নে জবাবদিহি জরুরি। ফলে ঘটনাটি শুধু একজন আলেমের ব্যক্তিগত জীবন নয়, বরং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বনাম জনস্বার্থের বিতর্কেও পরিণত হয়েছিল।
পাঁচ বছর পর জাতীয় সংসদে আবারও যখন সেই ঘটনার প্রসঙ্গ উঠল, তখন স্পিকারের হস্তক্ষেপ নতুন করে একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—জনপ্রতিনিধিদের আলোচনায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত জীবন কতটা প্রাসঙ্গিক? স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যার জবাব দেওয়ার সুযোগ নেই, তার ব্যক্তিগত বিষয় সংসদে টেনে আনা সমীচীন নয়। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, মামুনুল হকের জীবনের “অন্ধকার অংশ” নিয়ে সংসদে আলোচনা হোক, তা তিনি চান না।
সংসদের সাম্প্রতিক এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে যে, ২০২১ সালের নারায়ণগঞ্জ রিসোর্টকাণ্ড এখনো রাজনীতি ও জনআলোচনায় একটি স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। মুতাহ বিয়ে, বহুবিবাহ, ধর্মীয় নেতৃত্বের নৈতিকতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের জবাবদিহি—সব মিলিয়ে মামুনুল হককে ঘিরে বিতর্কটি এখনো পুরোপুরি অতীত হয়ে যায়নি। বরং সময়ের ব্যবধানে এটি দেশের ধর্ম, রাজনীতি ও সামাজিক মূল্যবোধের সম্পর্ক নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণে পরিণত হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন