সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** চার এসপিকে বদলি-পদায়ন *** এমপি নজরুলের গ্রেপ্তারে স্পিকারকে চিঠি দিচ্ছে পুলিশ, দ্বিতীয় স্ত্রীর চিরকুটের তদন্ত চলছে *** বাড়ছে হুতিদের হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মুখে ইরানের হুঁশিয়ারি *** জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী *** সাগরে শক্তিশালী হচ্ছে লঘুচাপ, ৬ অঞ্চলে ৬০ কিমি ঝড়ের আভাস *** আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যেভাবে ছড়াল আগুন *** আশুলিয়ায় কাভার্ড ভ্যান থেকে ৬ লাশ উদ্ধার *** জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথম স্ত্রীসহ থানায় এমপি নজরুল *** সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা *** কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন

সুখবর এক্সপ্লেইনার

আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের মনোনয়ন বাতিল ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০১:৩৮ পূর্বাহ্ন, ৩০শে এপ্রিল ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ২০২৬–২৭ মেয়াদের নির্বাচন সামনে রেখে দেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রাঙ্গণে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। আগামী ১৩ ও ১৪ মে দুই দিনব্যাপী এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত একাধিক আইনজীবীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, অভিযোগ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছে, যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও অংশগ্রহণমূলক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এবার কতজন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে বা কতজনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে—এ বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

আগামী ৩ মে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন, আর ওই দিনই চূড়ান্ত প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি মো. হুমায়ুন কবির মঞ্জু। ফলে নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।

বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দাবি, জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের লিখিত আবেদন এবং সাধারণ আইনজীবীদের আপত্তির প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তাদের মতে, যারা অতীতে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ব্যানারে নির্বাচন করেছেন বা সমর্থন দিয়েছেন, তাদের অংশগ্রহণ আইনজীবী সমাজের একটি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এই অবস্থানকে তারা ‘বারের স্বার্থ রক্ষার পদক্ষেপ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

অন্যদিকে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা এ সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও বেআইনি বলে অভিহিত করেছেন। তাদের বক্তব্য, কোনো প্রার্থীই দলীয় পরিচয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেননি; সবাই স্বতন্ত্রভাবে অংশ নিয়েছেন। অথচ বারের তথাকথিত বিশেষ সাধারণ সভার মাধ্যমে হঠাৎ করে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, ২৬ এপ্রিলের ওই সভার কোনো নোটিশ প্রার্থীদের দেওয়া হয়নি এবং অ্যাডহক কমিটি মধ্যরাতে বার্তা পাঠিয়ে পরদিন তড়িঘড়ি করে ‘মনগড়া’ সভা করে এই সিদ্ধান্ত নেয়, যা বারের সংবিধান ও প্রচলিত নিয়মের পরিপন্থী।

আওয়ামীপন্থী জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. মনসুরুল হক চৌধুরী, যিনি সভাপতি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন, তার মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সুখবর ডটকমকে বলেন, সংবিধান ও নিয়ম ভঙ্গ করে ৪০ জনের বেশি প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এটি শুধু অসাংবিধানিক নয়, ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

একই সঙ্গে তারা এই সিদ্ধান্তকে সুপ্রিম কোর্ট বারের ৭৭ বছরের ইতিহাসে একটি ‘কলঙ্কজনক অধ্যায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং বিশেষ সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত বাতিল করে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক বদরুদ্দোজা বাদল সাংবাদিকদের বলেন, বারের সদস্যদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই বিশেষ সাধারণ সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তার মতে, এটি কোনো ব্যক্তিগত বা দলীয় প্রতিহিংসার ফল নয়; বরং আইনজীবীদের একটি বৃহৎ অংশের ইচ্ছার প্রতিফলন। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতারাও একই অবস্থান ব্যক্ত করেছেন এবং দাবি করেছেন, এ সিদ্ধান্ত আইনজীবী সমাজের ‘নৈতিক অবস্থান’ রক্ষার অংশ।

২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) নিয়ে বিতর্কই এখন পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সভাটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় আহ্বান করা হয়েছিল কি না, সেখানে গৃহীত সিদ্ধান্ত বারের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বৈধ কি না—এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

সভায় উপস্থিত কয়েকজন আইনজীবী জানিয়েছেন, সেখানে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে ওই সিদ্ধান্তের পদ্ধতিগত বৈধতা নিয়েই মূল বিতর্ক।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার সীমিত করা হলে তা অবশ্যই সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। বার অ্যাসোসিয়েশন একটি স্বশাসিত পেশাজীবী সংগঠন হলেও এর কার্যক্রম সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে না।

যদি কোনো প্রার্থীকে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে তা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যদি না সেটির পেছনে সুস্পষ্ট আইনগত বিধান থাকে।

অভিজ্ঞদের মতে, এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—একটি হলো বারের নিজস্ব গঠনতন্ত্র, অন্যটি হলো প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি। যে কোনো প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করার আগে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক হওয়া জরুরি। তা না হলে পুরো নির্বাচনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিরোধ কেবল একটি পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনী বিরোধ নয়; এর মধ্যে দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলনও রয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা নতুন কিছু নয়। তবে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের বিতর্ক বিচারব্যবস্থার ভাবমূর্তির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

আইনজীবীদের একটি অংশ মনে করছে, এই পরিস্থিতি সমাধানের জন্য দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতা প্রয়োজন। অন্যথায় নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে চূড়ান্ত প্রার্থীর তালিকা প্রকাশের পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সব মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির এবারের নির্বাচন একটি কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা না গেলে এই নির্বাচন শুধু একটি সংগঠনের নেতৃত্ব নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি দেশের আইনি ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250