রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ দল *** মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছিল: ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী *** উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে ১,৩৯৯টি ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে: গবেষণা *** হুতিদের মোকাবিলায় এবার সৌদির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা তুরস্কের! যুদ্ধ করবে কি? *** কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ *** তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি *** জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান *** মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের *** আওয়ামী লীগ-জামায়াত এক হয়েও বিএনপির কিছুই করতে পারেনি: এমপি চাঁদ *** তেজগাঁওয়ে মসজিদে গোপন বৈঠক: উগ্রবাদ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ১২ জন ৩ দিনের রিমান্ডে

সুখবর এক্সপ্লেইনার

ব্যয় কমাতে বাজেট-পরবর্তী নৈশভোজ বাতিল: প্রতীকী সিদ্ধান্তের তাৎপর্য কতটা?

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৩:০০ পূর্বাহ্ন, ১লা জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পাসের পর প্রতিবছরের মতো সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হওয়া বাজেট–পরবর্তী নৈশভোজ এবার আর হবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ব্যয়সংকোচনের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সিদ্ধান্তে প্রায় ৫০ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে।

বাজেট–পরবর্তী নৈশভোজ দীর্ঘদিন ধরে সংসদীয় সংস্কৃতির একটি অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। এতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা অংশ নিতেন। আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াও এটি বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময় ও সৌজন্য বিনিময়ের একটি সুযোগ হিসেবে পরিচিত ছিল। এ কারণে অনেকেই এটিকে এক ধরনের ‘গেটটুগেদার’ বা প্রাতিষ্ঠানিক মিলনমেলা হিসেবে দেখেন।

সরকার অবশ্য বলছে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রতীকী হলেও ব্যয়সংকোচনের বার্তা দেওয়া জরুরি ছিল। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বাসসকে বলেন, “ব্যয় সংকোচনের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এবার বাজেট–পরবর্তী নৈশভোজও বাতিল করা হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ৫০ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে।”

সরকারের দাবি, এই সিদ্ধান্ত বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং সরকারি ব্যয় কমানোর বৃহত্তর নীতির অংশ। অতিরিক্ত প্রেস সচিব আরও বলেন, “তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরে আপ্যায়ন ভাতা কাটছাঁট করেছেন। চলতি মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপ্যায়ন ব্যয় হয়েছে ১১ লাখ ৬৯ টাকা। এ ছাড়া দুই ঈদে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপ্যায়ন ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯০ লাখ টাকা।”

তিনি অতীত ব্যয়ের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “বিগত ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপ্যায়ন খাতে প্রতিবছর ব্যয় হয়েছিল ৩০ থেকে ৫৫ কোটি টাকা। এই ব্যয়ের বাইরেও দেখা গেছে প্রতিবছর ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করা হয়েছে। যেমন ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই খাতে খরচ হয়েছিল ৩০ কোটি ২ লাখ ৯৭ হাজার ৩৩৫ টাকা।”

একই সঙ্গে তিনি জানান, “বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খাবার সরবরাহ করত। বিগত সরকারের সময়ে এই বিশাল অঙ্কের টাকা এখনো বাকি রয়ে গেছে, যা বর্তমান সরকারকেই পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করতে হচ্ছে।”

ব্যয়সংকোচনের এই বার্তা সরকারের অন্যান্য সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরকারি অর্থের অপচয় কমানো, জনগণের অর্থ জনগণের কল্যাণে ব্যয় এবং প্রশাসনিক ব্যয়ে সংযমের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। একই সঙ্গে আপ্যায়ন ব্যয় কমানো এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কৃচ্ছ্রসাধনের বিষয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।

তবে নৈশভোজ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে। সংসদসংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, প্রায় ৫০ লাখ টাকা সাশ্রয় নিঃসন্দেহে ইতিবাচক; কিন্তু অনুষ্ঠানটির আর্থিক দিকের পাশাপাশি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রতীকী মূল্যও ছিল। সংসদ সদস্য, আমলা, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হতো এই আয়োজনকে ঘিরে। তাদের মতে, এই ধরনের যোগাযোগ কখনও কখনও পারস্পরিক বোঝাপড়া ও কর্মসম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

সমালোচকদের মতে, জাতীয় বাজেটের আকারের তুলনায় ৫০ লাখ টাকা খুবই সামান্য অঙ্ক। তাই শুধু একটি নৈশভোজ বাতিল করলেই ব্যয়সংকোচনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে না। তাদের মতে, প্রকৃত ব্যয়সংকোচন নিশ্চিত করতে হলে সরকারি প্রকল্পের অপ্রয়োজনীয় খরচ, বিদেশ সফর, যানবাহন ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক অপচয় এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় আরও কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।

অন্যদিকে ব্যয়সংকোচনের সমর্থকেরা মনে করেন, যখন সরকার নাগরিকদের সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানায়, তখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও একই ধরনের সংযম প্রদর্শন জনআস্থার জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তাদের মতে, সাশ্রয়ের অঙ্ক বড় বা ছোট—সেটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যয়ের বিষয়ে নীতিগত অবস্থান।

এ সিদ্ধান্তের আরেকটি দিক হলো এর প্রতীকী গুরুত্ব। অনেক সময় সরকারি নীতিতে প্রতীকী পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ তা প্রশাসনের জন্য একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করে। যদি এই সিদ্ধান্ত বৃহত্তর ব্যয়সংকোচন কর্মসূচির অংশ হয় এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের মিতব্যয়িতা অনুসরণ করা হয়, তাহলে এর বাস্তব প্রভাব আরও দৃশ্যমান হতে পারে।

তবে কেবল একটি অনুষ্ঠান বাতিল করাই যথেষ্ট নয়। সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে জনগণও জানতে আগ্রহী থাকে, সাশ্রয় হওয়া অর্থ কোন খাতে ব্যবহার করা হবে এবং তা জনকল্যাণে কতটা অবদান রাখবে।

এদিকে বাজেট পাসের দিন প্রধানমন্ত্রীর কর্মব্যস্ততার বিষয়েও তথ্য দিয়েছেন অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান সকাল পৌনে ১০টায় সংসদে আসেন। প্রথম থেকে তিনি অধিবেশনকক্ষে অবস্থান করেন। বাজেটের মঞ্জুরি দাবির ওপর ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়াসহ আইন প্রণয়ন কার্যাবলিতে অংশ নেন। শুধু তা–ই নয়, বিরতির সময় প্রধানমন্ত্রী দাপ্তরিক কাজ সেরেছেন এবং জরুরি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল সই করেছেন।”

সব মিলিয়ে বাজেট–পরবর্তী নৈশভোজ বাতিলের সিদ্ধান্তকে একদিকে যেমন সরকারের ব্যয়সংকোচন নীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে এটি সংসদীয় ঐতিহ্যের একটি অনানুষ্ঠানিক আয়োজনের অবসান হিসেবেও আলোচনায় এসেছে। সিদ্ধান্তটির আর্থিক প্রভাব তুলনামূলক সীমিত হলেও, প্রশাসনিক সংস্কৃতি, প্রতীকী বার্তা এবং জনমনে এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাজেট–পরবর্তী নৈশভোজ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250