মঙ্গলবার, ৬ই অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** রওনা দিয়েছেন ইমরান খানের সমর্থকেরা—লক্ষ্য ইসলামাবাদ *** জাতীয় দিবসে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** এশিয়ায় শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়তে চায় ডেনমার্ক: রাষ্ট্রদূত *** রমজানের আগেই তিন ধাপের ইউপি নির্বাচন *** ৭ নভেম্বর ছুটি ঘোষণা, বাড়ল পূজার ছুটিও *** আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ রাত *** মেসির শেষ ম্যাচে থাকতে পারছেন না দিবালাসহ যে বিশ্বকাপজয়ীরা *** বিচার ছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সমঝোতা নয়: ডেপুটি স্পিকার *** দুর্গাপূজায় রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে শপিংমল-দোকান *** বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় কানাডা

‘শেখ হাসিনার তিন মেয়াদে সাংবাদিকদের জন্য পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ’

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৮:৪১ অপরাহ্ন, ৩রা মে ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং তথ্যপ্রবাহের অবাধ পরিবেশ নিয়ে আলোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাস্তবতা নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে এক গবেষণা। সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্রেসির (ভি-ডেম) তথ্য বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে দেশের সাংবাদিকতা কখনোই পুরোপুরি মুক্ত ছিল না; বরং দীর্ঘ সময় ধরে নানা মাত্রায় দমন-পীড়নের মুখে পড়েছে।

দীর্ঘ সময়জুড়ে সংকুচিত পরিসর

ভি-ডেমের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছরের মধ্যে প্রায় ২৭ বছর সাংবাদিকদের জন্য ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি সময় জুড়েই সমালোচনামূলক প্রতিবেদনের কারণে সাংবাদিকেরা নিয়মিতভাবে শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। গ্রেপ্তার, মামলা, হুমকি কিংবা পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়ার মতো ঘটনা এই দীর্ঘ সময়জুড়ে পুনরাবৃত্তি হয়েছে।

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক—‘হ্যারাসমেন্ট অব জার্নালিস্টস’—সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর আচরণের একটি ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরে। এতে গ্রেপ্তার, কারাবাস, হামলা কিংবা হত্যার মতো ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই সূচকেই দেশের অবস্থান বারবার উদ্বেগজনক পর্যায়ে নেমে গেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখানে একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে: সরকার পরিবর্তন হলেও সাংবাদিকদের প্রতি রাষ্ট্রের মনোভাবের মৌলিক পরিবর্তন খুব কমই হয়েছে।

তিনটি কঠিন অধ্যায়

ভি-ডেমের তথ্য বিশ্লেষণে দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তিনটি সময় বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছে, যখন দমন-পীড়ন ছিল সবচেয়ে তীব্র।

প্রথমটি ১৯৭৫ সাল—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনের শেষ বছর। বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সব বেসরকারি পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং মাত্র চারটি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম চালু রাখা হয়। সংবাদমাধ্যম কার্যত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

দ্বিতীয় সময়টি ১৯৮০-এর দশকের শুরু থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত—এইচ এম এরশাদের সামরিক শাসনামল। এ সময়ে সংবাদপত্রকে কী প্রকাশ করতে হবে, কী করা যাবে না—সেটিও নির্ধারণ করে দেওয়া হতো। নির্দেশ অমান্য করলে বন্ধ হয়ে যেত প্রকাশনা। সেন্সরশিপ, ভয়ভীতি এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছিল নিয়মিত ঘটনা।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে দীর্ঘ সময়টি ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল—শেখ হাসিনা-এর টানা তিন মেয়াদ। ভি-ডেমের সূচকে দেশের সবচেয়ে খারাপ ১০টি বছরের মধ্যে ৯টিই এই সময়ের অন্তর্ভুক্ত। গবেষণাটি এই সময়কে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে কঠিন পর্ব হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

‘কাঠামোগত হয়রানি’র বাস্তবতা

২০১৪–২০২৪ সময়কালে সাংবাদিকদের ওপর চাপ শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি একটি কাঠামোগত রূপ নেয়। ক্ষমতাবান রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিদের সমালোচনা করলেই মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শন প্রায় নিয়মে পরিণত হয়।

এই সময়ের একটি বহুল আলোচিত ঘটনা ২০২৩ সালের মার্চে প্রথম আলোর প্রতিবেদক শামসুজ্জামান শামসের গ্রেপ্তার। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়। প্রতিবেদনে এক দিনমজুরের বক্তব্য—“পেটে ভাত না জুটলে স্বাধীনতা দিয়া কী করমু”—সরকারবিরোধী হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

এই ঘটনা সাংবাদিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছিল। অনেকেই এটিকে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখেন।

আইনের ব্যবহার না অপব্যবহার?

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এই আইনের আওতায় অনলাইন বা ছাপা গণমাধ্যমে প্রকাশিত সমালোচনামূলক মতামত সহজেই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক বা সামরিক—সব সরকারই সাংবাদিকদের ওপর দমনমূলক কৌশল প্রয়োগ করেছে। তার ভাষায়, ‘বিরোধী দল দমনে যে আইন ও পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তা অনেক সময় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণেও প্রয়োগ করা হয়।’

তার মতে, রাষ্ট্রের এই মনোভাব গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি গভীর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়।

ব্যক্তিগত হয়রানি থেকে প্রাতিষ্ঠানিক চাপ

দেশে সাংবাদিকদের ওপর চাপ কেবল গ্রেপ্তার বা মামলা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। নজরদারি, বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক ভীতি—সব মিলিয়ে একটি জটিল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সব সময় জেল বা বলপ্রয়োগ দরকার হয় না। নজরদারি ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও সাংবাদিকদের চাপে রাখা যায়।’ এই ধরনের চাপের ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ তৈরি হয়, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য সমানভাবে ক্ষতিকর।

অতীতের উদাহরণ: পরিবর্তন নাকি পুনরাবৃত্তি?

দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে বিভিন্ন সময় একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। মাহফুজ উল্লাহ, এনায়েতুল্লাহ খান ও তাসনিম খলিলের মতো সাংবাদিকেরা বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। কবি ও সম্পাদক আল মাহমুদও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।

এমনকি তুলনামূলক স্বস্তির সময় হিসেবেও বিবেচিত ১৯৯১ থেকে ২০০৫ সালেও হামলা ও দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটেছে। ২০০১ সালে প্রথম আলোর প্রতিবেদক টিপু সুলতানের ওপর হামলা এবং ২০০২ সালে একুশে টেলিভিশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা তার উদাহরণ। অর্থাৎ, ভালো সময়েও পুরোপুরি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়নি।

তুলনামূলক স্বস্তির সময়

ভি-ডেমের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সাংবাদিকদের ওপর হয়রানির মাত্রা তুলনামূলক কম ছিল। এ সময়ে প্রেস ইনস্টিটিউট ও প্রেস কাউন্সিল গঠন এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের জন্য জমি বরাদ্দের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এগুলো গণমাধ্যমের জন্য একটি সীমিত হলেও নতুন পরিসর তৈরি করেছিল। তবে এই সময়েও সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা পুরোপুরি নিরাপদ ছিল না।

সাম্প্রতিক পরিবর্তন: বাস্তব উন্নতি নাকি সাময়িক স্বস্তি?

২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ভি-ডেমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মুহাম্মদ ইউনূসেরর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাংবাদিকদের ওপর হয়রানির মাত্রা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা কমে যাওয়া, নজরদারি শিথিল হওয়া এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন কমে যাওয়ার কারণে এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে।

তবে একই সময়ে কিছু সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন এবং হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারও হয়েছেন। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি পুরোপুরি ইতিবাচক বলা যায় না।

কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন

গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ওঠানামা করে, কিন্তু স্থায়ী উন্নতি দেখা যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মূল কারণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। আইনের শাসন, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক সংযম—এই তিনটি উপাদান শক্তিশালী না হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা টেকসই হয় না।

তারা মনে করেন, সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কার্যকর আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইনগুলোর অপব্যবহার বন্ধ করা জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ভেতরে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সামনে পথ কোন দিকে?

দেশের সাংবাদিকতা আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে প্রযুক্তির বিস্তার, নতুন প্ল্যাটফর্ম এবং তথ্যপ্রবাহের বহুমাত্রিকতা গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে, আইনি চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সেই শক্তিকে সীমাবদ্ধ করে রাখছে।

ভি-ডেমের তথ্য কেবল অতীতের একটি চিত্র নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে এই বাস্তবতা নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি গণতন্ত্রের ভিত্তি। আর সেই ভিত্তি যতক্ষণ দুর্বল থাকবে, ততক্ষণ রাষ্ট্রের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামোও ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।

গণমাধ্যম সাংবাদিক বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250