সোমবার, ৩১শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে তাড়াহুড়া নয়, ঐকমত্য ও প্রস্তুতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান *** আর্জেন্টিনা দল থেকে মেসির অবসর *** সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে, সেবার মান বাড়বে তো? *** বিটিভির লোগো বদলানোর উদ্যোগে বিশিষ্টজনদের আপত্তি *** বরেণ্য শিল্পীদের স্মৃতিমাখা লোগোয় পরিবর্তন আনছে বিটিভি, মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক মুছে ফেলার শঙ্কা *** নতুন বেতনকাঠামো: কোন গ্রেডে কত বেতন হচ্ছে *** শি-পুতিনের সঙ্গে একই বৈঠকে মোদি-শাহবাজ-পেজেশকিয়ান, বদলে যাচ্ছে কী ইউরেশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণ *** ধর্মীয়-সামাজিক সংঘাতে যে বছর শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ: পিউ রিসার্চ *** মন্ত্রিসভায় নবম পে স্কেল অনুমোদন *** নতুন বেতনকাঠামো মন্ত্রিসভায় অনুমোদন, গ্রেডভেদে বাড়বে ১০০–১৪২ শতাংশ

আর্জেন্টিনা দল থেকে মেসির অবসর

শাওন দত্ত

🕒 প্রকাশ: ১০:৪১ অপরাহ্ন, ৩১শে আগস্ট ২০২৬

#

ফাইল ছবি

আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসির অধ্যায় শেষ! আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর মাঠে দেখা যাবে না বিশ্বের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারকে। আজ সোমবার, ৩১ আগস্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন খোলাচিঠিতে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্তকে তিনি বলেছেন কষ্টের, তবে একই সঙ্গে এটিকে সঠিক সময়ও মনে করছেন।

মেসির জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচটি ছিল ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল। গত ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলেই শিরোপা নিশ্চিত করে স্পেন। বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্ন নিয়ে ফাইনালে নামা আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত রানার্সআপ হয়। ম্যাচ শেষে মেসিকে অঝোরে কাঁদতে দেখা যায়।

তবে ফাইনালের পরই অবসরের ঘোষণা দেননি মেসি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ফাইনালের দুই দিন পর, ২১ জুলাই তিনি অবসরের চিঠিটি লিখেছিলেন। এরপর নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে আরও সময় নিয়ে ভেবেছেন। পরে তার বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর ঘটনাও সিদ্ধান্তটিকে আরও দৃঢ় করে।

৩১ আগস্টের চিঠিতে মেসি লিখেছেন, ফাইনালের পর অনেক ভেবেচিন্তে তিনি জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিদ্ধান্তটি নিতে তার ভীষণ কষ্ট হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। তবে তার উপলব্ধি, এটাই সরে দাঁড়ানোর সময়। আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য তিনি সব সময় নিজের সর্বস্ব দিয়েছেন—শুধু সাম্প্রতিক সাফল্যের বছরগুলোতে নয়, তারও অনেক আগে থেকেই। দেশের মানুষকে আনন্দ দেওয়া এবং ফুটবলের মাধ্যমে আর্জেন্টাইন পরিচয় নিয়ে তাদের গর্বিত করার লক্ষ্যেই তিনি খেলেছেন বলে জানিয়েছেন।

মেসির বিদায়বার্তার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো—তিনি মনে করেন, তার দেওয়ার মতো আর কিছু অবশিষ্ট নেই। জাতীয় দলের হয়ে খেলা তিনি ভালোবাসেন এবং সারা জীবন ভালোবাসবেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় শেষ হয়ে আসে। তার জায়গা নেওয়ার মতো প্রতিভাবান তরুণ ফুটবলারও উঠে আসছে। তাদের জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার অধিকার আছে—এমন উপলব্ধিও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিদায়বার্তায় মেসি গত দুই দশকের সমর্থনের জন্য আর্জেন্টিনার মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। মাঠে দাঁড়িয়ে সমর্থকদের কণ্ঠ আর শুনতে পারবেন না—এটি তিনি মিস করবেন। তবে জাতীয় দলকে বাইরে থেকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ভালো সময়ের পাশাপাশি কঠিন সময়েও তিনি দলের পাশে থাকবেন বলে জানিয়েছেন।

পরিবার, কোচ, সতীর্থ ও কর্মকর্তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মেসি। জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ পথচলায় পাওয়া স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাগুলোকে তিনি জীবনের অমূল্য অর্জন হিসেবে দেখছেন। সতীর্থদের সঙ্গে মিলে আর্জেন্টিনার মানুষকে এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দিতে পেরেছেন, যা তারা নিজেরাও হয়তো কখনো কল্পনা করেননি—এ নিয়ে তার গর্ব ও শান্তির কথাও উঠে এসেছে বিদায়বার্তায়।

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল নিয়ে। আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এবং সবচেয়ে বেশি গোল করা খেলোয়াড় তিনিই। ২০০৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর দুই দশকের বেশি সময় ধরে দলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন মেসি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি জিতেছেন ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের ফাইনালিসিমা এবং সবচেয়ে বড় অর্জন ২০২২ সালের বিশ্বকাপ।

বিশ্বকাপের ইতিহাসেও মেসির অবস্থান অনন্য। ২০২৬ সালের আসরে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলার পথে তিনি নিজের বিশ্বকাপ ম্যাচের সংখ্যা ৩৪-এ নিয়ে যান। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগেই তিনি বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড গড়েছিলেন; পরে সেই রেকর্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে ছাড়িয়ে যান। তবু ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া, চার দশকে গোল করা এবং বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা—সব মিলিয়ে মেসির দীর্ঘস্থায়ী শ্রেষ্ঠত্বের অনন্য নজির তৈরি হয়েছে।

মেসির জাতীয় দলের গল্প অবশ্য সব সময় সাফল্যে ভরা ছিল না। একসময় আর্জেন্টিনার মানুষের বড় একটি অংশ তাকে নিয়ে হতাশ ছিলেন। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পরাজয়—সব মিলিয়ে জাতীয় দলের হয়ে বড় শিরোপা জিততে না পারার আক্ষেপ তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

২০১৬ সালের ২৬ জুনের রাতটি ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিষণ্ন অধ্যায়গুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হারে আর্জেন্টিনা। টাইব্রেকারে মেসি নিজেও পেনাল্টি মিস করেন। ম্যাচের পর মাত্র ২৯ বছর বয়সে তিনি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, জাতীয় দলের হয়ে তার আর কিছু করার নেই এবং চারটি বড় ফাইনালে হেরে যাওয়ার হতাশা থেকেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তবে সেই অবসর স্থায়ী হয়নি। সমর্থকদের প্রবল আহ্বান, সতীর্থদের সঙ্গে আলোচনা এবং নিজের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পর আবার জাতীয় দলের জার্সিতে ফেরেন মেসি। এরপরই শুরু হয় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল অধ্যায়। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জিতে আর্জেন্টিনার দীর্ঘ শিরোপা-খরা কাটে। পরের বছর ইতালির বিপক্ষে ফাইনালিসিমা জয়ের পর আসে কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ।

২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। ম্যাচটি ৩-৩ গোলে শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে জেতে আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে মেসির জীবনের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাও পূর্ণ হয়। তিনি শুধু বিশ্বকাপই জেতেননি, পুরো আসরে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও পান।

এরপর ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। ফলে যে মেসি একসময় জাতীয় দলের হয়ে বড় শিরোপা না জেতার ব্যর্থতায় সমালোচিত হতেন, সেই তিনিই বিদায়ের সময় আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ফুটবলারদের একজন। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তার বিদায় তাই কেবল একজন তারকার অবসর নয়, একটি দীর্ঘ যুগের সমাপ্তিও।

৩৯ বছর বয়সে নেওয়া এবারের সিদ্ধান্ত ২০১৬ সালের সিদ্ধান্তের চেয়ে অনেক বেশি চূড়ান্ত বলেই মনে করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। ২০১৬ সালে মেসির সামনে ছিল দীর্ঘ ক্যারিয়ার। এবার তিনি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলে ফেলেছেন, জাতীয় দলের হয়ে ২০৭ ম্যাচ ও ১২৫ গোলের রেকর্ড গড়েছেন এবং আর্জেন্টিনাকে কাঙ্ক্ষিত সব বড় শিরোপা এনে দিয়েছেন।

তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার অর্থ ফুটবল থেকে অবসর নয়। মেসি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলছেন। অবসরের ঘোষণার আগের দিন, ৩০ আগস্টও ক্লাবটির হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছেন তিনি। মন্ট্রিয়ালের বিপক্ষে ৭-১ গোলের জয়ে চারটি গোল ও একটি সহায়তা করেন মেসি। ৩৯ বছর বয়সেও তার এমন পারফরম্যান্স দেখিয়ে দিচ্ছে, জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হলেও মাঠের গল্প এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষ দৃশ্যটি তাই বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি হাতে নয়, বরং পরাজয়ের পর অশ্রুসিক্ত মুখে। ১৯ জুলাই স্পেনের কাছে ১-০ গোলের হার তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হয়ে থাকল। দেড় মাসের বেশি সময় পর, ৩১ আগস্ট তিনি নিজেই জানিয়ে দিলেন—আর ফিরবেন না। বিদায়বার্তার শেষদিকে ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মেসি লিখেছেন, তাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে জন্ম দেওয়ার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। এরপর তার শেষ আহ্বান—‘এগিয়ে চলো আর্জেন্টিনা।’

একসময় যে মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে শিরোপা জিততে না পারার যন্ত্রণায় জাতীয় দল ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেই মেসিই এবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও দুইবারের কোপা আমেরিকা জয়ী হয়ে বিদায় নিলেন। তাই তার বিদায়ের সঙ্গে শুধু একটি বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ নয়, আর্জেন্টিনার ফুটবলের একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন অধ্যায়েরও পর্দা নামল।

লিওনেল মেসি

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250