ফাইল ছবি
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট সোহরাব হাসান বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের ১৮ মাসের শাসনকালে যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল, সংসদ বসার ৩০ দিনের মধ্যে সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। কিন্তু সরকার সেগুলোই পাস করছে, যেগুলো করলে রাজনৈতিকভাবে তারা লাভবান হবে। আর যেগুলোতে জবাবদিহির প্রশ্ন আছে, সেগুলো হয় স্থগিত করেছে, না হয় রহিত করে দিচ্ছে ভবিষ্যতে ‘ভালো আইন’ করবে এই ‘দোহাই’ দিয়ে।
এদিকে জাতীয় সংসদের চলমান প্রথম অধিবেশনে গত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি হয়েছে। গত শুক্রবার পর্যন্ত ১২০টি অধ্যাদেশের নিষ্পত্তি হয়েছে ৯১টি বিল পাসের মাধ্যমে, আর বাতিল হয়েছে ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ। এ প্রক্রিয়ায় সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থানের পার্থক্য, নির্বাচনের আগে ও পরের অবস্থানগত পরিবর্তন, এবং সংস্কার বনাম রাজনৈতিক কৌশলের প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে—সরকার কেন অবস্থান বদলাল? এটি কি বাস্তবতা ও শাসনব্যবস্থার প্রয়োজনে নেওয়া সিদ্ধান্ত, নাকি রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী কৌশলগত পুনর্বিন্যাস? বিশ্লেষকদের মতে, অধ্যাদেশগুলোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো নির্বাচনের আগে এবং পরে রাজনৈতিক দলের অবস্থানের দৃশ্যমান পরিবর্তন। বিশেষ করে গণভোট অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি স্পষ্ট।
নির্বাচনের আগে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং এটিকে রাজনৈতিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু সংসদে এসে একই দল সেই অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়নি; বরং এটি বাতিল হওয়ার পথেই এগিয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি কতটা আন্তরিক ছিল?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে গণভোটের মতো ইস্যু জনসমর্থন অর্জনের একটি কার্যকর হাতিয়ার ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারত, যা সরকার হয়তো এড়াতে চেয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানিম হোসেইন শাওনের বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে—সরকার যেসব অধ্যাদেশকে প্রয়োজনীয় মনে করেছে, সেগুলোর অধীনে গৃহীত কার্যক্রম সুরক্ষা দিয়েছে; আর যেগুলো পছন্দ হয়নি, সেগুলো বাতিল করেছে।
উদাহরণ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয় অধ্যাদেশের অধীনে নেওয়া কার্যক্রম সুরক্ষিত করা হয়েছে। কারণ এসব ক্ষেত্রে বাস্তবিক প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এগুলো বাতিল করলে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারত।
অন্যদিকে গণভোট, দুদক বা গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সুরক্ষা দেওয়া হয়নি, কারণ এসব ক্ষেত্রে হয় কার্যক্রম সম্পূর্ণ হয়নি, নয়তো সেগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব বেশি।
এ থেকে বোঝা যায়, সরকারের সিদ্ধান্তে একটি ‘প্রাগম্যাটিক সিলেকশন’ কাজ করেছে—যেখানে আইনি ধারাবাহিকতা ও প্রশাসনিক সুবিধা অগ্রাধিকার পেয়েছে, আর রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়ানো হয়েছে।
সরকারি দল বিএনপি বলছে, বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলো নতুনভাবে, আরও যুগোপযোগী করে আনা হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটি কি সত্যিই সংস্কারের অংশ, নাকি সময়ক্ষেপণের কৌশল?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য ছিল, সেগুলো দ্রুত আইনে পরিণত করা হলে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ত। কিন্তু সেসব অধ্যাদেশ বাতিল করে ভবিষ্যতে নতুন করে আনার কথা বলা হলে সন্দেহ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।
তিনি আরও বলেন, আপত্তির জায়গাগুলো আগে থেকেই স্পষ্ট করা উচিত ছিল। এতে রাজনৈতিক আস্থার সংকট তৈরি হতো না।
বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলোকে গণতান্ত্রিক সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখছে। তাদের দাবি, এসব অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো ও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা আবার ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হলো।
বিশেষ করে গুম প্রতিরোধ, পুলিশ কমিশন, তথ্য অধিকার সংশোধন—এসব অধ্যাদেশকে তারা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা ও মানবাধিকার সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখছে।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংসদে অভিযোগ করেন, আলোচনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত অনেক অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপনই করা হয়নি। এতে রাজনৈতিক সমঝোতা ভঙ্গ হয়েছে।
সংসদে কিছু বিল পাসের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যেমন, সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল পাসের আগে সংসদ সদস্যদের হাতে বিলের কপি খুব অল্প সময় আগে দেওয়া হয়। এতে আইন প্রণয়নের স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণমূলক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এছাড়া বিশেষ কমিটিতে একমত হওয়ার পরও সংসদে সংশোধনী আনা—এটিকে বিরোধী দল রাজনৈতিক আস্থার সংকট হিসেবে দেখছে। বিশ্লেষকদের মতে, কিছু অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার পেছনে বাস্তব প্রশাসনিক কারণও রয়েছে। যেমন, রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বিভক্ত করার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু এটি নিয়ে তীব্র বিরোধিতা ছিল এবং বাস্তবায়নও হয়নি। ফলে এটি বাতিল করা তুলনামূলক সহজ সিদ্ধান্ত ছিল।
একইভাবে, দুর্নীতি দমন কমিশনের সংশোধনী অধ্যাদেশের অধীনে নতুন কমিশন গঠন না হওয়ায় সেটিও বাতিল হয়েছে। অর্থাৎ, যেসব অধ্যাদেশ বাস্তবে প্রয়োগ হয়নি বা প্রয়োগে বাধা ছিল, সেগুলো বাদ দেওয়ার মাধ্যমে সরকার প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে চেয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যেসব অধ্যাদেশের অধীনে নেওয়া কার্যক্রমের কোনো সুরক্ষা দেওয়া হয়নি, সেগুলো নিয়ে। বিশেষ করে গণভোট অধ্যাদেশের অধীনে অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও কিছু আইনজীবী বলছেন, অধ্যাদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় যে কার্যক্রম হয়েছে, তা বৈধই থাকবে। তবুও আইনি স্পষ্টতা না থাকায় ভবিষ্যতে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ঢাকার এক বেসরকারি চাকরিজীবী আনিস আলমগীর বলেন, “সংস্কারের কথা বলে অনেক কিছু করা হয়েছিল। এখন আবার সেগুলো বাতিল করা হলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মতিয়ার রহমান মনে করেন, “সবকিছু নতুন করে আনার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তা কতটা হবে, সেটাই প্রশ্ন।”
অন্যদিকে ব্যবসায়ী আলিমুল হক বলেন, “যদি পুরোনো অধ্যাদেশে সমস্যা থাকে, তাহলে নতুন করে আনা উচিত। তবে তা যেন দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে করা হয়।”
সব দিক বিবেচনায় কয়েকটি কারণ স্পষ্টভাবে সামনে আসে—১. ক্ষমতায় আসার পর বাস্তবতার চাপ: বিরোধী অবস্থানে থাকা অবস্থায় যেসব সংস্কারমূলক অবস্থান নেওয়া হয়, ক্ষমতায় এলে সেগুলো বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশাসনিক কাঠামো, আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক ভারসাম্য—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়।
২. রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়ানো: গণভোট বা পুলিশ কমিশনের মতো কিছু অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন করলে ক্ষমতার কাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারত। সরকার হয়তো সেই ঝুঁকি নিতে চায়নি। ৩. নির্বাচনী কৌশল বনাম শাসন কৌশল: নির্বাচনের আগে জনপ্রিয় ইস্যুগুলো সামনে আনা হয়। কিন্তু ক্ষমতায় এসে শাসনব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা অগ্রাধিকার পায়।
৪. প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা রক্ষা: যেসব অধ্যাদেশের অধীনে কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলো সুরক্ষিত রেখে অন্যগুলো বাতিল করা হয়েছে—এটি প্রশাসনিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
সরকার বলছে, বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলো আরও উন্নত করে আনা হবে। এটি একদিকে সময় নেওয়ার কৌশল, অন্যদিকে নতুন করে রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরির সুযোগ। অধ্যাদেশ বাতিল ও বিল পাসের এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু আইন প্রণয়নের বিষয় নয়; বরং রাজনৈতিক আস্থা, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার জটিল সম্পর্কের প্রতিফলন।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন