ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সঠিক বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির কিছু কর্মকাণ্ড উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে বিরোধী দলের সঙ্গে আচরণ, দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, উচ্চপর্যায়ে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সরকারের প্রতি তৈরি হওয়া আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এমন পর্যবেক্ষণ দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনামের।
আজ শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি এসব কথা বলেন। ‘পিএম কন্টিনিউজ টু বিল্ড কনফিডেন্স, বিএনপি করোডস ইট’ শিরোনামের নিবন্ধটির উপশিরোনাম ‘হোয়াট আর দ্য লেসনস অব জুলাই চার্টার দ্যাট নিড টু বি ইমপ্লিমেন্টেড’। অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রী আস্থা তৈরি করছেন, বিএনপি তা ক্ষয় করছে—জুলাই সনদের কোন শিক্ষাগুলো বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
মাহফুজ আনাম মনে করেন, সরকার হিসেবে বিএনপির সামগ্রিক মূল্যায়নের জন্য এখনো যথেষ্ট সময় পেরোয়নি। তবে দলটি কোন দিকে এগোচ্ছে, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়ার জন্য বর্তমান সময় কম নয়। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে জবাবদিহিমূলক শাসনের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা ইতিবাচক। কিন্তু দলের কিছু কর্মকাণ্ড সেই বার্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
প্রথমেই জনগণের কথা সরকার কতটা শুনছে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার মতে, জনগণের প্রকৃত মতামত যাতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, সে জন্য বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা থাকা দরকার। অতীতে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ওপরমহলে এমন খবরই পৌঁছে দিতেন, যা শীর্ষ নেতৃত্বকে অসন্তুষ্ট করবে না। সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন প্রবীণ সাংবাদিক মাহফুজ আনাম। যদিও তার মতে, দেশের গণমাধ্যমের একটি অংশ রাজনৈতিক বিভাজনে আক্রান্ত। এতে গণমাধ্যমের যেমন ক্ষতি হয়, তেমনি সরকারেরও প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার সুযোগ কমে যায়। তবে বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে গণমাধ্যমে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করছে বলে তিনি সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘জবাবদিহিমূলক শাসনের মাধ্যমে জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান’ দেওয়ার কথা বলেছেন। মাহফুজ আনামের মতে, তিনি যদি এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারেন, তাহলে জনগণ দীর্ঘদিন তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।
তবে জবাবদিহিমূলক শাসনের পথে প্রথম বাধা হিসেবে তিনি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয় লোক নিয়োগের প্রবণতার কথা বলেছেন। অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল করে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবী সংগঠন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় অনুগতদের নিয়োগ নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, এসব ক্ষেত্রে মেধা, অভিজ্ঞতা ও সততার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্য গুরুত্ব পেয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে প্রশাসক নিয়োগ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন তিনি। তার লেখায় বলা হয়েছে, এসব নিয়োগে বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের জায়গা দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে বিরোধীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। জামায়াতের নেতারা স্থানীয় সরকারের সব স্তর থেকে দলীয় প্রশাসক প্রত্যাহার এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের আসন্ন নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার দাবি তুলেছেন। মাহফুজ আনামের মতে, এই দাবি সহজে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কারণ, স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ হলে জবাবদিহিমূলক শাসন দুর্বল হয়।
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, জনপ্রতিনিধিদের সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া জরুরি নয়। কিন্তু যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তারা পেয়েছেন, তার চ্যালেঞ্জ ও দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের যথেষ্ট ধারণা থাকা দরকার। রাষ্ট্র পরিচালনা এখন অত্যন্ত জটিল একটি কাজ। তাই দায়িত্বশীলদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
একাধিক মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার পাশাপাশি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট করার ব্যবস্থা নিয়েও তিনি উদ্বেগ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্য হয়তো সবাইকে একটি দল হিসেবে কাজ করানো। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো কাজ করছেন। এতে আমলারা কার নির্দেশনা নেবেন, তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে প্রভাব খাটানো, স্বজনতোষণ ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মাহফুজ আনামের লেখায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তার পর্যবেক্ষণ, বিএনপি জুলাই সনদকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব ও গভীরতার সঙ্গে দেখছে না—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাহী বিভাগের এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর মতো সংস্কার বাস্তবায়নে দলটির অনীহা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ব্যাপক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। সেই ক্ষমতার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণও দুর্বল। সংসদ ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তদারকি ক্ষমতা থাকলেও ক্ষমতাসীন দলের এমপিদের আধিপত্যের কারণে তা অনেক সময় কার্যকর হয় না। অতীতে বিরোধী দলের সংসদ বর্জন ও পদত্যাগের সংস্কৃতিও সরকারের ওপর সংসদীয় চাপ কমিয়েছে।
মাহফুজ আনামের মতে, জুলাই সনদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক ক্ষমতা কমানো এবং তাকে সংসদের কাছে আরও জবাবদিহিমূলক করা। রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও একই উদ্দেশ্যের অংশ। এসব সংস্কার বাস্তবায়ন হলে দেশের ক্ষমতার কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টি ত্রয়োদশ সংসদ অনুমোদন করেছে। বাকি ২০টি বাতিল হয়েছে অথবা মেয়াদ শেষ হয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়া অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে স্বাধীন বিচার বিভাগ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনসংক্রান্ত সংস্কারের বিষয় ছিল। এসব ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা কমানো।
গুম ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইন নিয়েও মাহফুজ আনাম সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এসব আইনের চূড়ান্ত রূপ থেকে বোঝা যাবে, বিএনপি সরকার কতটা জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চায়। আগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ‘নখদন্তহীন বাঘ’ বলা হতো। তার আশঙ্কা, নতুন কাঠামো কার্যকর হলে সেটিকে ‘নখদন্তহীন বিড়াল বা ইঁদুর’ বলাই যথেষ্ট হবে।
এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের ব্যর্থতার একটি কারণও তুলে ধরেছেন মাহফুজ আনাম। তার মতে, শেখ হাসিনা কেন ব্যর্থ হয়েছেন—এর অনেক কারণের মধ্যে একটি সরল কারণ হলো, তিনি এমন কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে দেননি, যেখান থেকে তাকে ও তার সরকারকে প্রশ্ন করা সম্ভব ছিল।
এই অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান সরকারের শিক্ষা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি সত্যিই জবাবদিহিমূলক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাহলে এমন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে দিতে হবে, যেগুলো প্রয়োজনে সরকারকেও প্রশ্ন করতে পারে। শুধু প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা দিয়ে এটি সম্ভব নয়। এর জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু ও জেমস এ. রবিনসনের ২০১২ সালের বই ‘হোয়াই নেশন্স ফেইল’-এর কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। বইটির মূল যুক্তি হলো, কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শক্তিশালী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর বইটির পর্যালোচনাতেও প্রতিষ্ঠানকে এর মূল যুক্তির কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। গার্ডিয়ান-এর আলোচনায়ও বলা হয়েছিল, মানুষের সম্পদ ও অধিকার সুরক্ষিত থাকবে—এমন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও উন্নয়নের পরিবেশ তৈরি করে। তবে বইটির যুক্তি নিয়ে একাডেমিক বিতর্কও রয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক রিভিউ অব বুকস-এ ভূগোলসহ অন্যান্য কারণকে কম গুরুত্ব দেওয়ার জন্য লেখকদের সমালোচনা করা হয়েছিল।
মাহফুজ আনামের বক্তব্যের মূল কথা হলো, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কোনো একজন নেতার ব্যক্তিগত সদিচ্ছা বা জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে পারে—এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
শেখ হাসিনা সরকারের অভিজ্ঞতা থেকে তারেক রহমান সরকারের জন্য তার সতর্কবার্তাও তাই স্পষ্ট। দলীয় আনুগত্যের বদলে যোগ্যতা ও সততাকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিরোধী মতকে জায়গা দিতে হবে। গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জুলাই সনদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ওপর যে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে।
মাহফুজ আনামের প্রশ্ন, বিএনপি কি অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে, যা ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা দলকে সীমাহীন ক্ষমতার সুযোগ দেবে না?
খবরটি শেয়ার করুন