ফাইল ছবি
টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারায় আওয়ামী লীগ। সেদিনই দেশ ছাড়েন দলীয় সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে (সাবেক) অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং নিবন্ধনও স্থগিতের মুখে পড়ে। সরকার অভিযোগ তোলে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো দমন–পীড়ন, গুম, হত্যা ও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় দুই বছর পর এখন দলটি কার্যত সাংগঠনিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে আছে। কেন্দ্রীয় অনেক নেতা বিদেশে, কেউ আত্মগোপনে, কেউ কারাগারে। মাঠে দৃশ্যমান কর্মসূচি নেই। তবে সাম্প্রতিক অনলাইন তৎপরতা, বিচ্ছিন্ন ঝটিকা মিছিল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে—আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। দলের বর্তমান তৎপরতা ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—দলটি কি নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার পথে হাঁটছে, নাকি অতীতের কৌশলেই ফিরে যেতে চাইছে?
আর সেই চেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের নাম। দেশের ভেতরে এবং আত্মগোপনে থাকা নেতা–কর্মীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সক্রিয় নানক ও নাছিম। শেখ হাসিনা তাদের এই দায়িত্ব দিয়েছেন বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের। দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা নিজেই এখনো দলের নীতি নির্ধারণ করছেন। পরিবারের কয়েকজন সদস্যও বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করছেন।
সূত্র বলছে, নানক ও নাছিম বর্তমানে বিদেশে বসে অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও মহানগরের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। দলটির নিষ্ক্রিয় সাংগঠনিক কাঠামো পুনরায় সচল করা, তৃণমূলের নেতা–কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে যেসব এলাকায় এখনো আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে, সেখানে যোগাযোগ জোরদারে তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন। জেলা, উপজেলা, মহানগর এবং সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকে ছোট ছোট ভার্চ্যুয়াল গ্রুপে যুক্ত করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিভাগের এক তৃণমূল নেতা সুখবর ডটকমকে বলেন, “আমাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি বদলালে যেন দ্রুত মাঠে নামা যায়। প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।” চট্টগ্রাম অঞ্চলের আরেক নেতা সুখবর ডটকমকে বলেন, “নানক ভাই ও নাছিম ভাই অনলাইনে কথা বলেছেন। তারা বলেছেন, দলকে ধরে রাখতে হবে, সংগঠন ভাঙতে দেওয়া যাবে না।”
তবে এই তৎপরতা নিয়ে দলের ভেতরেই ক্ষোভ আছে। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের অনেক নেতা–কর্মীর অভিযোগ, যারা এত দিন ক্ষমতার কেন্দ্র ছিলেন, সংকটের সময় তারা দেশের বাইরে থেকে নির্দেশনা দিচ্ছেন। অথচ তৃণমূলের অনেক নেতা–কর্মী মামলা, গ্রেপ্তার ও হামলার ঝুঁকি নিয়ে দেশে অবস্থান করছেন।
ময়মনসিংহের সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতা সুখবর ডটকমকে বলেন, “বিদেশে বসে কথা বলা সহজ। কিন্তু মাঠে নামলে গ্রেপ্তার হচ্ছে সাধারণ কর্মীরা। কেন্দ্রীয় নেতাদের কাউকে তো দেশে দেখা যায় না।” খুলনার আরেক নেতা বলেন, “অনলাইনে নির্দেশনা আসে, কিন্তু বাস্তবে সংগঠিত হওয়া খুব কঠিন। সবাই আতঙ্কে আছে।”
রাজশাহীর এক নেতা সুখবর ডটকমকে বলেন, “যারা মাঠে ছিল, মামলা খাচ্ছে, আত্মগোপনে আছে, তাদের কষ্টটা যারা বাইরে আছেন, তারা হয়তো পুরোপুরি বুঝতে পারছেন না। নির্দেশ দেওয়া সহজ, কিন্তু মাঠে নামার ঝুঁকি তো এখানকার লোকজনকেই নিতে হবে।” খুলনা অঞ্চলের এক কর্মী সুখবর ডটকমকে বলেন, “নেতারা যদি নিজেরা দেশে এসে দাঁড়াতেন, তাহলে কর্মীদের মনোবল বাড়ত। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চরিত্র কী হবে?”
দলীয় সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের বর্তমান তৎপরতার একটি বড় অংশ অনলাইননির্ভর। ভার্চ্যুয়াল বৈঠক, ফেসবুক লাইভ, ইউটিউবভিত্তিক প্রচার এবং বিদেশে অবস্থানরত সমর্থকদের সক্রিয় রাখার দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়াসহ কয়েকজন নেতা আন্তর্জাতিক মহল ও বিদেশি গণমাধ্যমে দলের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছেন বলেও জানা যায়।
আওয়ামী লীগের একাধিক অনলাইন আলোচনায় অংশ নেওয়া নেতাদের বক্তব্যে এখন দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথমত, তারা বিশ্বাস করেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। দ্বিতীয়ত, তারা মনে করছেন বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল না হলে আওয়ামী লীগের জন্য আবারও রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ভারতীয় কয়েকটি গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি “মাথা উঁচু করে” দেশে ফিরতে চান। তার দাবি, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে বর্ণনা দাঁড় করানো হয়েছে, তার বড় অংশই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে সমালোচকেরা বলছেন, আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় সংকট শুধু সাংগঠনিক নয়, নৈতিক ও রাজনৈতিকও।
২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় সহিংসতা, দমন–পীড়ন ও প্রাণহানির অভিযোগে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি বড় ধাক্কা খায়। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভ, কারফিউ ও সংঘর্ষের মধ্যে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো সে সময় ঘটনাকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় রাজনৈতিক পালাবদল হিসেবে বর্ণনা করে।
পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানায়। একই সঙ্গে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। সরকারি গেজেটে বলা হয়, বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো কোনো ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে পারবে না।
এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ভেতরে দুটি ধারা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। একটি অংশ মনে করছে, অতীতের ভুল স্বীকার করে দলকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে। অন্য অংশটি অপেক্ষাকৃত কট্টর অবস্থানে থেকে শক্ত অবস্থান নেওয়ার পক্ষে। দলটির সাম্প্রতিক অনলাইন আলোচনা ও তৎপরতায় দ্বিতীয় ধারাটিই বেশি সক্রিয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দলীয় সূত্র বলছে, বর্তমানে দলে সবচেয়ে সক্রিয় অংশটি হলো সেই নেতাদের একটি বলয়, যারা মনে করে আওয়ামী লীগকে “আক্রমণাত্মক বিরোধী শক্তি” হিসেবেই ফিরে আসতে হবে। তারা ঝটিকা মিছিল, আকস্মিক স্লোগান এবং প্রশাসনের ভেতরে সরকারবিরোধী মনোভাব তৈরির চেষ্টার ওপর জোর দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই অংশের তৎপরতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে যারা আওয়ামী লীগের “রিফাইন্ড” বা সংস্কারকৃত সংস্করণ দেখতে চেয়েছিলেন, তারা এখন অনেকটাই নীরব। দলটির এক সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, “জনগণের একটা বড় অংশের মধ্যে ক্ষোভ আছে। সেটা স্বীকার না করে শুধু শক্তি দেখানোর রাজনীতি করলে লাভ হবে না।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, সাংগঠনিক কাঠামো টিকিয়ে রাখা। দ্বিতীয়ত, জনসমর্থনের সংকট কাটানো। তৃতীয়ত, নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের রাজনৈতিক জবাব তৈরি করা। কারণ শুধু পুরোনো সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভর করে দলটির পক্ষে পুনরুত্থান সহজ হবে না।
তবে আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন, দেশের রাজনীতিতে বড় দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক করে রাখা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। দলটির নেতাদের ভাষ্য, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভোটের সমীকরণ একসময় আওয়ামী লীগকে আবারও রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরিয়ে আনবে।
কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের পথ কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ একদিকে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা, মামলা ও সাংগঠনিক বিপর্যয়; অন্যদিকে আছে জনমনে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও অবিশ্বাস। এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে নানক ও নাছিমের মতো নেতাদের ওপর ভর করেই এখন নিজেদের টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। তবে বিদেশে বসে পরিচালিত এই রাজনীতি আদৌ মাঠের বাস্তবতায় কতটা কার্যকর হবে, সেই প্রশ্ন এখন দলটির ভেতরেই ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
এই মুহূর্তে নানক ও নাছিমের নেতৃত্বে চলা যোগাযোগ–প্রচেষ্টা আওয়ামী লীগের জন্য এক ধরনের সাংগঠনিক লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত দলকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে, নাকি কেবল পুরোনো কাঠামোকে ধরে রাখার চেষ্টা হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর অনেক নেতা-কর্মীর কাছে এখনো স্পষ্ট নয়।
খবরটি শেয়ার করুন