ফাইল ছবি
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে গঠিত সরকারের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন সৈয়দ আবুল হোসেন। দলটি ২০০৯ সালে সরকার গঠন করলে তিনি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে সৈয়দ আবুল হোসেন সরকারি পাসপোর্ট গোপন করে ব্যক্তিগত পাসপোর্ট নিয়ে সিঙ্গাপুর সফর করেছিলেন, নিজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সাকোর কাজে। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির বিদেশ সফরে কোন ধরনের পাসপোর্ট ব্যবহার করা উচিত—দেশের প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক মহলে সেই বিতর্কের একটি আলোচিত উদাহরণ হয়ে আছে ঘটনাটি।
প্রায় আড়াই দশক পর আবারও পাসপোর্ট ও কূটনৈতিক প্রটোকলের প্রশ্ন সামনে এসেছে। এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য এবং নীতি ও কৌশলবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান দিল্লি বিমানবন্দরে গতকাল রোববার প্রবেশের অনুমতি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন, জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ভারত সফর বাতিল করে দেশে ফিরে আসেন। ঘটনার জেরে ঢাকায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে আজ সোমবার (১৫ জুন) তলব করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারিভাবে এ ঘটনাকে “অনাকাঙ্ক্ষিত” ও “অপ্রত্যাশিত” বলা হয়েছে।
ঘটনার তাৎপর্য শুধু একজন উপদেষ্টাকে বিমানবন্দরে আটকে রাখা নয়। এটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশই সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি নিছক প্রশাসনিক ভুল, নাকি দুই দেশের সম্পর্কের ভেতরে এখনো আস্থাহীনতার গভীর সংকেত লুকিয়ে আছে?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জাহেদ উর রহমান ভারত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক জোট আইওআরএর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতে দিল্লি গিয়েছিলেন। বাংলাদেশ হাইকমিশন আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কূটনৈতিক নোটের মাধ্যমে তার সফরের বিষয়টি জানিয়েছিল। কিন্তু দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ভারতীয় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখেন এবং প্রবেশের অনুমতি দেননি বলে অভিযোগ ওঠে। পরে উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও তিনি সফর বাতিল করে কলম্বো হয়ে আজ ঢাকায় ফিরে আসেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একটি অংশের দাবি, তার নাম নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট একটি ওয়াচলিস্টে থাকায় নিয়মিত যাচাইয়ের অংশ হিসেবে তাকে আটকে রাখা হয়েছিল। পরে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার পর প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন। যদি এটি সত্যিই একটি প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত ভুল হয়ে থাকে, তাহলে আগে থেকে অবহিত একজন রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিকে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা ধরে আটকে রাখা কেন প্রয়োজন হলো? আর যদি তিনি নিরাপত্তা তালিকাভুক্ত ব্যক্তি হয়ে থাকেন, তাহলে বাংলাদেশ হাইকমিশনের আনুষ্ঠানিক নোট পাওয়ার পরও সেই জটিলতা আগেভাগে দূর করা হলো না কেন?
কূটনৈতিক মহলের অনেকে মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কখনো কখনো প্রক্রিয়ার চেয়ে আচরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে যখন সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে, তখন এমন ঘটনা সহজেই রাজনৈতিক বার্তায় রূপ নিতে পারে। গত দুই বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একাধিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পর্ক কার্যত তলানিতে পৌঁছেছিল। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, সীমান্তে উত্তেজনা, ভিসা জটিলতা, বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতা এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক অবিশ্বাস দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছিল।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর, জ্বালানি ও বাণিজ্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সও সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বৃদ্ধির বিষয়ে অগ্রগতির কথা জানিয়েছে।
এমনকি ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগকেও অনেক বিশ্লেষক সম্পর্ক উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি নিজেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা বলেছেন। এ প্রেক্ষাপটে জাহেদ উর রহমানের ঘটনাটি দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে অস্বস্তি তৈরি করেছে। কারণ সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারস্পরিক আস্থা। আর সেই আস্থার জায়গায় যদি বারবার সন্দেহ বা অপমানবোধ তৈরি হয়, তাহলে রাজনৈতিক সদিচ্ছাও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না।
তবে আরেকটি প্রশ্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ—জাহেদ উর রহমানের সাধারণ পাসপোর্ট ব্যবহার করা কতটা যৌক্তিক ছিল? সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, তিনি কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করেননি। বরং সাধারণ সবুজ পাসপোর্টে এবং সার্ক ভিসা নিয়ে সফরে গিয়েছিলেন। দেশের সাবেক কূটনীতিকদের একটি অংশ মনে করে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে বিদেশ সফরে গেলে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করাই অধিকতর নিরাপদ ও প্রটোকলসম্মত। কারণ কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের পরিচয়, মর্যাদা ও সফরের উদ্দেশ্য সংশ্লিষ্ট দেশ আগে থেকেই অধিক স্পষ্টভাবে যাচাই করে রাখে। এতে বিমানবন্দর পর্যায়ে জটিলতা কমে।
অন্যদিকে আরেকটি মত হলো, কূটনৈতিক পাসপোর্ট না থাকলেও কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিকে এমন আচরণের মুখে পড়তে হওয়া উচিত নয়, বিশেষত যখন সফর সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিতে সফরকারী প্রতিনিধির মর্যাদা পাসপোর্টের রঙ দিয়ে নয়, বরং সফরের চরিত্র ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ফলে পাসপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আচরণকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করে না। ভারতীয় কর্তৃপক্ষই এখানে বাড়াবাড়ি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনাটি আরো সংবেদনশীল হওয়ার কারণ, এটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ ইস্যু, অবৈধ অভিবাসন বিতর্ক এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশ একাধিকবার অভিযোগ করেছে যে ভারত যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে লোকজনকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ভারত বলছে, বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠাতে তারা নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে।
এ অবস্থায় একজন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে বিমানবন্দরে আটকে রাখার ঘটনা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করেছে। যদিও এখন পর্যন্ত ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ঘটনাটির প্রতীকী প্রভাব। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে দিল্লি এখনো নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি। আবার ভারতের একাংশে ধারণা রয়েছে, ঢাকার নতুন সরকার ভারতের প্রতি আগের মতো ঘনিষ্ঠ নয়। এই পারস্পরিক সন্দেহ যদি বাড়তে থাকে, তাহলে সম্পর্ক উন্নয়নের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তবে একই সঙ্গে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, একটি বিমানবন্দর-ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন সংকটে পড়বে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও তাড়াহুড়ো হবে। কারণ বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এতটাই গভীর যে কোনো পক্ষই দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনা চায় না।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা। ভারত যদি দ্রুত ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা করে এবং বাংলাদেশের উদ্বেগের সন্তোষজনক জবাব দেয়, তাহলে এটি একটি বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ভুল হিসেবেই থেকে যেতে পারে। কিন্তু ব্যাখ্যা না এলে বা ঘটনাটি নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য চলতে থাকলে তা নতুন করে অবিশ্বাসের জন্ম দেবে।
জাহেদ উর রহমানের দিল্লি সফর বাতিলের ঘটনা তাই শুধু একজন উপদেষ্টার ব্যক্তিগত ভোগান্তির গল্প নয়। এটি এমন এক পরীক্ষার মুহূর্ত, যেখানে দেখা যাবে তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সত্যিই নতুন পথে এগোচ্ছে, নাকি পুরোনো সন্দেহ ও অবিশ্বাসের ছায়া এখনো দুই দেশের সম্পর্ককে তাড়া করে ফিরছে।
কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস বলে, অনেক সময় বড় সংকট নয়, বরং ছোট ছোট অপমানবোধ ও অব্যাখ্যাত ঘটনার স্তূপই দীর্ঘমেয়াদে আস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। দিল্লি বিমানবন্দরের এ ঘটনাও সেই তালিকায় যুক্ত হবে কি না, তার উত্তর নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।
খবরটি শেয়ার করুন