মঙ্গলবার, ২৭শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** সিপিবির মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ তুলে হামলা *** আমার দেশ-এর প্রেসে বোমা হামলার ঘটনায় মামলা, আসামি শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ *** শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে ‘র’-এর বৈঠক, এনএসআই প্রধানের দিল্লি সফর আলোচনায় *** ধানমন্ডিতে আটক দীপক শীলকে ছেড়ে দিল পুলিশ *** নারী বাউলদের গানে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদ কর্মসূচি সংস্কৃতিকর্মীদের করতে দিল না পুলিশ *** ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা জানাল এইচআরএসএস *** সাংবাদিকদের নিয়ে আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার ও ক্ষমা চাওয়ার আলটিমেটাম ডিআরইউয়ের *** ধানমন্ডিতে সংস্কৃতিকর্মীদের মানববন্ধনে পুলিশের বাধা, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আটক *** আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের যে ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর *** ‘বিএনপিকে ভোট দিয়ে আজ ভুক্তভোগী’ বলা নারী গ্রেপ্তার, সরকারবিরোধী বক্তব্য পাননি ওসি

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের সামনে বৈষম্য

শাওন দত্ত

🕒 প্রকাশ: ০৫:১৯ অপরাহ্ন, ১৪ই মে ২০২৬

#

ফাইল ছবি

রাজনীতির মঞ্চে স্লোগান কখনো কেবল শব্দ নয়; কখনো তা হয়ে ওঠে সময়ের প্রতিশ্রুতি, কখনো মানুষের দীর্ঘ বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক প্রতীকী আহ্বান। দেশের রাজনীতির ইতিহাসেও বড় বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে স্লোগান মানুষের কল্পনা, আশা ও ক্ষোভকে একসুতোয় বেঁধেছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের ‘দিনবদলের সনদ’ যেমন এক নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল, তেমনি ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটিও ভোটারদের মনে নতুন এক আলোড়ন তোলে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—রাজনীতির ভাষায় উচ্চারিত এই প্রতিশ্রুতি কি বাস্তব রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতর জায়গা করে নিতে পারবে, নাকি সেটিও সময়ের সঙ্গে আরেকটি রাজনৈতিক অলংকারে পরিণত হবে? জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট ও কবি সোহরাব হাসান তার কলামে এই প্রশ্নগুলোকেই গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণের আলোয় তুলে ধরেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে লিখে আসা সোহরাব হাসানের লেখার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি সরাসরি রাজনৈতিক ভাষ্যকে মানবিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেন। তার লেখায় পরিসংখ্যান যেমন থাকে, তেমনি থাকে সমাজের নীরব মানুষের দীর্ঘশ্বাসও। রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সঙ্গে সাহিত্যিক সংবেদনশীলতার এমন মিশেল বাংলা সাংবাদিকতায় খুব কম লেখকের মধ্যেই দেখা যায়। সোহরাব হাসানের লেখাটি আজ বৃহস্পতিবার , ১৪ মে প্রথম আলোর মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে ‘‘বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ও বৈরী বাস্তবতা’’ শিরোনামে।

সোহরাব হাসান তার লেখায় মনে করিয়ে দেন, গত সাড়ে ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি কিংবা মাথাপিছু আয় বেড়েছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু উন্নয়নের সেই আলো সমাজের সব মানুষের ঘরে পৌঁছায়নি। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও যখন দেশের এক-পঞ্চমাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, তখন উন্নয়নের বড় বড় পরিসংখ্যানের আড়ালে এক ধরনের বৈষম্যমূলক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই বিএনপি নির্বাচনী স্লোগান হিসেবে সামনে আনে—‘সবার আগে বাংলাদেশ’। সোহরাব হাসান মনে করেন, এই স্লোগান সাধারণ মানুষের মনোযোগ কেড়েছিল বলেই দলটি নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তবে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেমন ক্ষমতার শক্ত ভিত্তি তৈরি করে, তেমনি তা কখনো কখনো এক ধরনের রাজনৈতিক আত্মতুষ্টি ও কর্তৃত্ববাদের ঝুঁকিও তৈরি করে।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, তারা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায় যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না। কিন্তু সোহরাব হাসানের প্রশ্ন—বর্তমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে এই লক্ষ্য অর্জন কতটা সম্ভব?

তিনি লিখেছেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মূল শক্তি ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ। অথচ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে সেই বৈষম্য কমার বদলে আরও বেড়েছে। বিশেষ করে তথাকথিত ‘মব-সন্ত্রাস’ সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আরও নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে। নারীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণও সংকুচিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদাহরণ টেনেছেন। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় গঠিত এই কমিশনে নারী ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধির অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি দেখিয়েছেন, সংস্কারের নামে তৈরি হওয়া অনেক কাঠামো বাস্তবে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠতে পারেনি।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের দুই সদস্য শরীফ ভূঁইয়া ও ফিরোজ আহমদ যে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন, সেটিকেও সোহরাব হাসান গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, এটি প্রমাণ করে যে সংস্কারের নামে যে ঐকমত্যের কথা বলা হচ্ছিল, তার ভেতরেও মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্ব ছিল।

কলামে তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, অর্থনৈতিক অনাচার কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কার্যকর কোনো অবস্থান নেয়নি। বরং মতাদর্শগতভাবে পরস্পরবিরোধী দলগুলোকে একই টেবিলে বসিয়ে এক ধরনের ‘গোঁজামিল’ তৈরি করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে।

সোহরাব হাসানের লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে আছে অর্থনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের প্রশ্ন। তিনি মনে করেন, কেবল ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ড দিয়ে মানুষের মৌলিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। মানুষের প্রয়োজন স্থায়ী কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন।

বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু লেখকের প্রশ্ন—শিল্পকারখানা সম্প্রসারণ, উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদার না করে এই কর্মসংস্থান কীভাবে তৈরি হবে? একই সঙ্গে তিনি বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং প্রসঙ্গ টেনে সরকারের বক্তব্য ও বাস্তবতার ফারাকও তুলে ধরেছেন।

তার লেখার সবচেয়ে আলোচিত অংশ সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা শুল্কচুক্তি নিয়ে। তিনি লিখেছেন, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে হওয়া এই চুক্তিতে এমন কিছু শর্ত রয়েছে, যা দেশের জন্য অসম ও মর্যাদাহানিকর। তার উল্লেখ অনুযায়ী, চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা মাত্র ছয়টি, বিপরীতে বাংলাদেশের জন্য রয়েছে ১৭৬টি শর্ত।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান অন্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির উদাহরণ দিলেও সোহরাব হাসান মনে করেন, অন্য দেশ একই ধরনের চুক্তি করেছে বলেই সেটি বাংলাদেশের জন্য গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো এত নীরব কেন? বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান যখন বাস্তবতার নিরিখে চুক্তিটি দেখার কথা বলেন, তখন সোহরাব হাসান পাল্টা যুক্তি দেন—শুধু বাস্তবতা মেনে চলাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাজ নয়; প্রয়োজন হলে সেই বাস্তবতা বদলানোর সাহসও থাকতে হবে।

এই জায়গাতেই তার লেখাটি নিছক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ থেকে এক ধরনের নৈতিক প্রশ্নে রূপ নেয়। তিনি যেন মনে করিয়ে দিতে চান—রাষ্ট্র কেবল প্রশাসনিক কাঠামো নয়, এটি মানুষের আশা, অধিকার ও মর্যাদারও প্রতিফলন। সোহরাব হাসানের লেখার শক্তি এখানেই যে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলকে একমাত্র দায়ী করেন না; বরং সামগ্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে থাকা বৈষম্য, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও নীতিগত দুর্বলতাগুলোকে সামনে আনেন। তার ভাষা কখনো তীক্ষ্ণ, কখনো বিষণ্ন; কিন্তু সবসময়ই পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে।

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু স্লোগান এসেছে, বহু প্রতিশ্রুতি উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ বিচার করে বাস্তবতার ভিত্তিতে। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে উন্নয়নের ভাষণ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ জীবন, ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ নাগরিকত্ব।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’—শব্দবন্ধটি তাই এখন শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি এক ধরনের পরীক্ষাও। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে কেবল ক্ষমতায় যাওয়া যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বৈষম্য কমানোর সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আত্মমর্যাদাপূর্ণ অবস্থান। সোহরাব হাসানের কলাম শেষ পর্যন্ত সেই কঠিন প্রশ্নটাই সামনে আনে—বাংলাদেশ কি সত্যিই সবার আগে থাকবে, নাকি ক্ষমতা ও বৈষম্যের পুরোনো বৃত্তেই আবার ঘুরপাক খাবে?

সোহরাব হাসান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

সিপিবির মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ তুলে হামলা

🕒 প্রকাশ: ০১:৪১ পূর্বাহ্ন, ২৭শে অক্টোবর ২০২৬

আমার দেশ-এর প্রেসে বোমা হামলার ঘটনায় মামলা, আসামি শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ

🕒 প্রকাশ: ০১:১৫ পূর্বাহ্ন, ২৭শে অক্টোবর ২০২৬

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে ‘র’-এর বৈঠক, এনএসআই প্রধানের দিল্লি সফর আলোচনায়

🕒 প্রকাশ: ০১:০১ পূর্বাহ্ন, ২৭শে অক্টোবর ২০২৬

ধানমন্ডিতে আটক দীপক শীলকে ছেড়ে দিল পুলিশ

🕒 প্রকাশ: ১১:৫৯ অপরাহ্ন, ২৬শে অক্টোবর ২০২৬

নারী বাউলদের গানে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদ কর্মসূচি সংস্কৃতিকর্মীদের করতে দিল না পুলিশ

🕒 প্রকাশ: ০৮:৩৪ অপরাহ্ন, ২৬শে অক্টোবর ২০২৬

Footer Up 970x250