রবিবার, ২৫শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ফ্রান্সে ৪ লাখ মানুষের বিক্ষোভ, বাড়ছে উত্তেজনা–সংঘর্ষ *** আজই ইরানে ফের হামলার ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প *** সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশের নিয়ম-কানুন পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** এইচএসসি-সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ২৯ অক্টোবর *** টঙ্গীতে মাদ্রাসাছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ *** তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগের প্রস্তাব *** সাঈদীর মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিকের লাশ দাফনে বাধা, গোপনে গার্ড অব অনার *** মৃত্যুর জন্য ইউএনওকে দায়ী করে এসি ল্যান্ডের ফেসবুক পোস্ট, পরিবারের দাবি মানসিক সমস্যা *** সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডে কূটনৈতিক যোগাযোগের ফাঁক উন্মোচিত, ঢাকার অজান্তেই আরও ২০ জনের পরিণতি অনিশ্চিত *** আসিফ আকবরের চালকের পেছনের আসন বরাবর গুলি করা হয়

সুখবর এক্সপ্লেইনার

দেশে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার ও জঙ্গি তৎপরতা কী বাড়ছে, আওয়ামী লীগ কেন অভিযোগ করছে?

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৫:৫২ অপরাহ্ন, ১৩ই আগস্ট ২০২৬

#

ফাইল ছবি

দেশে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) তৎপরতা বেড়েছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত ৫ আগস্ট ভারতের নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। সেখানে জয় অভিযোগ করেন, দেশে আইএসআইয়ের প্রভাব এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা দেশে অবাধে কাজ করছে।

জয় আরও দাবি করেন, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে জঙ্গি কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া অনেক ব্যক্তি বর্তমান সরকারের সময়ে মুক্তি পেয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হিযবুত তাহরীর প্রকাশ্যে মিছিল করছে এবং আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা জনসভায় বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর নতুন ঘাঁটিতে পরিণত হতে পারে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে এ বিষয়ে নজর রাখার আহ্বানও জানান তিনি।

আওয়ামী লীগের পাকিস্তান ও আইএসআইবিষয়ক অভিযোগ অবশ্য ৫ আগস্টের বক্তব্যে শুরু হয়নি। চলতি বছরের ২ জানুয়ারি সাবেক তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত ভারতের সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেন, আইএসআই ও পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। তিনি দাবি করেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব বেড়েছে।

এরপর ২৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এক সাক্ষাৎকারে দেশে আইএসআইয়ের উপস্থিতি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাড়তে থাকা সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের এই বক্তব্যকে বিচ্ছিন্ন কোনো মন্তব্য নয়, বরং গত এক বছরের রাজনৈতিক বয়ানের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়। প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ কেন বারবার পাকিস্তান ও আইএসআইয়ের প্রসঙ্গ সামনে আনছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর একটি কারণ রাজনৈতিক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দলটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে বক্তব্য দিয়ে এসেছে। ফলে পাকিস্তানের প্রভাবের অভিযোগ আওয়ামী লীগের জন্য নতুন কোনো রাজনৈতিক ভাষা নয়।

২০১৪ সালে গোপালগঞ্জে এক বক্তব্যে শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, তার জন্ম ভারতে হলেও অন্তরে পাকিস্তান। অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াতকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করার রাজনৈতিক প্রবণতা আওয়ামী লীগের পুরোনো কৌশল।

কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন, দেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হয়েছে এবং দলটির অনেক নেতা-কর্মী আত্মগোপনে বা বিদেশে রয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে এবং জামায়াতে ইসলামীও জাতীয় রাজনীতিতে বড় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের পরিচালক অধ্যাপক তৌফিক এম হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, আওয়ামী লীগ পাকিস্তান ও জঙ্গিবাদ নিয়ে তাদের পুরোনো কৌশলই ব্যবহার করছে। তার মতে, দলটির ধারণা হতে পারে, এসব অভিযোগ তুলে ধরলে শুধু ভারত নয়, পশ্চিমা বিশ্বকেও আওয়ামী লীগের পক্ষে সক্রিয় করা সম্ভব হবে।

ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের ব্যাখ্যা কিছুটা ভিন্ন। তার মতে, পাকিস্তান নিয়ে ভারতের মানুষের মধ্যে যেমন ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতা রয়েছে, আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও তেমন আবেগ আছে। ফলে পাকিস্তানের প্রসঙ্গ তুলে দলটি একই সঙ্গে নিজস্ব সমর্থকদের উদ্বুদ্ধ করছে এবং নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করছে।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এম সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, আওয়ামী লীগ মূলত পুরোনো বিষয় সামনে আনছে। পাকিস্তান ও জঙ্গিবাদকে সামনে রেখে ভারতের পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

তবে আওয়ামী লীগের অভিযোগের পেছনে যে বাস্তব পরিবর্তন নেই, তা বলা যাবে না। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক দৃশ্যত দ্রুত এগিয়েছে। ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকায় এসে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রায় ১৩ বছর পর পাকিস্তানের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর হিসেবে এটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। তার সফরে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হয় এবং বাণিজ্য, সংস্কৃতি, কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ঢাকা-করাচি সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর উদ্যোগ, বাণিজ্য বাড়ানো এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও তখন আলোচনা হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে ড. ইউনূসের একাধিকবার বৈঠকও দুই দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।

সামরিক পর্যায়েও যোগাযোগ বেড়েছে। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান পাকিস্তান সফরে দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল সৈয়দ অসিম মুনির এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জার সঙ্গে বৈঠক করেন। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ও দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। দুই পক্ষ ‘শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সম্পর্ক’ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়।

এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল অসিম মালিকের ঢাকা সফরের দাবি করে ভারতের ইকোনমিক টাইমস। ২৩ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি দাবি করে, কয়েক দশকের মধ্যে এটিই ছিল আইএসআই প্রধানের প্রথম বাংলাদেশ সফর। ইকোনমিক টাইমসের দাবি, সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়ের কাঠামো তৈরির চেষ্টা।

৩১ জানুয়ারি ইকোনমিক টাইমস আরেক প্রতিবেদনে দাবি করে, আইএসআই বাংলাদেশে কক্সবাজার, উখিয়া, টেকনাফ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও শেরপুরের মতো কৌশলগত এলাকায় উপস্থিতি তৈরির বিষয়ে আলোচনা করেছে। একই প্রতিবেদনে পাকিস্তানপন্থী ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও তোলা হয়। তবে এগুলো ছিল ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটির সূত্রনির্ভর দাবি; বাংলাদেশ সরকার বা আইএসআই প্রকাশ্যে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেনি। তবে ঘটনাটি যে দুই দেশের নিরাপত্তা যোগাযোগে নতুন মাত্রার ইঙ্গিত দেয়, তা অস্বীকার করা যায় না।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা গেছে ২০২৬ সালের ৮ মে। ওই দিন বাংলাদেশ ও পাকিস্তান মাদক পাচার, মাদক-সংশ্লিষ্ট অর্থপাচার এবং অপরাধী চক্র মোকাবিলায় একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। চুক্তিতে দুই দেশের মধ্যে সন্দেহভাজন মাদক অপরাধী, পাচারকারী সংগঠন, পাচারের নতুন পথ ও কৌশল সম্পর্কে নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের কথা রয়েছে। মাদক পাচার দমনে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় একটি স্বাভাবিক দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা। এটিকে সরাসরি আইএসআইয়ের রাজনৈতিক তৎপরতার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ যে ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ করছে, তার সঙ্গে এই চুক্তিকে এক করে দেখলে তথ্যগত বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

দেশে জঙ্গিবাদ ও উগ্রপন্থার পরিস্থিতি নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে বিপুলসংখ্যক বন্দী পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নিষিদ্ধ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের অন্তত ৩১১ সদস্য পলাতক ছিলেন। তাদের মধ্যে ১৮৫ জন জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ বা জেএমবির, ৮৩ জন আনসার আল ইসলামের, ১৬ জন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের এবং ১৬ জন নব্য জেএমবির সদস্য।

জঙ্গি সদস্যদের জামিনের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে ঢাকার আদালতের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, জেএমবির ৪২ জন, হিযবুত তাহরীরের ৪২১ জন, হরকাতুল জিহাদের ১৫ জন এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ৪৮২ জন সদস্য জামিন পেয়েছেন। 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বোমা উদ্ধারের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার সাভার-আশুলিয়া এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক বোমা উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। ১২ আগস্ট পর্যন্ত ওই এলাকায় পৃথক ঘটনায় বেশ কয়েকটি শক্তিশালী বোমা উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। একটি ঘটনায় পুলিশ নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্ত করছে।

তবে জঙ্গি তৎপরতার পাশাপাশি দেশের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থী শক্তির প্রভাব বাড়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০২৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, দেশে মব সহিংসতা বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে এবং দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী হচ্ছে।

এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দক্ষিণপন্থার উত্থান নিয়ে আওয়ামী লীগের অভিযোগকে বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি এক করে দেখা না গেলেও, দুই পক্ষই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশে ধর্মীয় ও রক্ষণশীল শক্তির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

ড. ইউনূসের সরকারের সময়ে আফগানিস্তানের তালেবানের সঙ্গে বাংলাদেশে যোগাযোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তালেবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম রাজনৈতিক বিভাগের মহাপরিচালক মোল্লা নূর আহমাদ নূর, যিনি মোল্লা জাওয়ান্দি নামেও পরিচিত, ঢাকায় অবস্থান করেছিলেন বলে সুখবর ডটকম প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২১ ডিসেম্বর ঢাকায় আসেন এবং কয়েক দিন বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসা ও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট তার সফর সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত ছিল না বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে তালেবানের প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা হয়। ‘তালেবানের দুই শীর্ষ নেতা’ বাংলাদেশ সফর করেছেন—এমন দাবিও বিভিন্ন মহলে করা হয়েছে। একইভাবে ‘হামাসের একজন শীর্ষ নেতা ড. ইউনূসের সময়ে ঢাকায় সফর করেছেন’—এমন দাবিও বিভিন্ন ভারতীয় ও মতামতধর্মী প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে হামাসকে ঘিরে বাংলাদেশের নাম ব্যবহার করে বেশ কিছু সূত্রনির্ভর ও বিতর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও উগ্রপন্থার সম্ভাব্য উত্থান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গ্যাটস্টোন ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের একটি নিবন্ধে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী শক্তির উত্থান এবং জঙ্গিবাদের ঝুঁকি নিয়ে কঠোর দাবি করা হয়। ভারতীয় কৌশলবিদ অধ্যাপক ব্রহ্মা চেলানির বক্তব্য উদ্ধৃত করে সেখানে ‘র‌্যাডিক্যাল ইসলামিজম’-এর উত্থানের কথা বলা হয়।

অন্যদিকে পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি আইএসআইয়ের ভূমিকা নিয়ে ইঙ্গিতকে স্পষ্টভাবে নাকচ করেন এবং বলেন, পাকিস্তান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ইশতিয়াক আহমেদ বিবিসি উর্দুকে দেওয়া মন্তব্যে বলেন, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার পাকিস্তানবিরোধী বক্তব্যের পেছনে রাজনৈতিক প্রয়োজন কাজ করতে পারে। দিল্লিতে পাকিস্তানের সাবেক হাইকমিশনার আবদুল বাসিতও প্রায় একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক এম সাখাওয়াত হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য সব সময় বিদেশি এজেন্টকে দৃশ্যমানভাবে পাঠানোর প্রয়োজন হয় না। কূটনৈতিক মিশন, প্রযুক্তি, স্থানীয় যোগাযোগ ও তথ্যের বিভিন্ন উৎস ব্যবহার করে গোয়েন্দা কার্যক্রম চালানো সম্ভব। তবে কোনো দেশের গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশে কী মাত্রায় কাজ করছে, তা নিয়ে প্রকাশ্য তথ্য-প্রমাণ ছাড়া নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

অধ্যাপক তৌফিক এম হকের পর্যবেক্ষণও একই জায়গায় এসে মেলে। তার মতে, বাংলাদেশে ভারতীয়, পাকিস্তানি, মার্কিনসহ বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা নিয়ে নানা কথা শোনা যায়। কিন্তু জল্পনা ও প্রমাণ এক জিনিস নয়।

আওয়ামী লীগ সম্ভবত এই তিনটি বাস্তবতার সঙ্গে জঙ্গিবাদ, বোমা উদ্ধার, কারাগার থেকে জঙ্গিদের পালিয়ে যাওয়া, জামিন এবং দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থানের ঘটনাগুলোকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বয়ানে যুক্ত করতে চাইছে। এর লক্ষ্য হতে পারে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন, ভারতকে উদ্বিগ্ন করা এবং আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আদায়।

দেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে বাস্তব উদ্বেগ আছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যদের পলাতক থাকা, বোমা উদ্ধারের ঘটনা, উগ্রপন্থী মতাদর্শের প্রচার এবং রাজনৈতিক পরিসরে রক্ষণশীল শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি—এসব বিষয় রাষ্ট্রের জন্য নজর দেওয়ার মতো। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের দ্রুত উন্নয়নও একটি নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।

তবে এসব বাস্তবতার সঙ্গে আইএসআইয়ের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বা আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের দেশে ঘাঁটি তৈরির দাবি এক করে দেখা যাবে না। আর আওয়ামী লীগের পাকিস্তান প্রসঙ্গ টানার পেছনে তাই শুধু নিরাপত্তা নয়, রাজনীতিও রয়েছে। ১৯৭১-এর স্মৃতি, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, জামায়াতের উত্থান, পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন যোগাযোগ এবং দেশে পরিবর্তিত রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য—সবকিছু মিলিয়েই এই বয়ান তৈরি হয়েছে।

প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘আইএসআই বাংলাদেশে আছে কি না’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নেই। বড় প্রশ্ন হলো, পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করবে।

শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ সজীব ওয়াজেদ জয়

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250