ফাইল ছবি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিতে বাধা, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে তালা এবং দুই কর্মীকে আটকে রাখার ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর রাত ১২টার পর নিজের যাচাইকৃত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ কোনো নিষিদ্ধ বই নয়। বইটি বিক্রয়ে বাধা দেওয়া, ইউপিএলের বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে তালা দেওয়া এবং এর দুজন কর্মীকে তুলে নেওয়া বেআইনি ও অপরাধমূলক কাজ। এ বিষয়ে সরকারের উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আসিফ নজরুল তার পোস্টে আরও লেখেন, শেখ হাসিনার ‘ফ্যাসিস্ট আমলে’ এভাবে বই বিক্রিতে বাধা দেওয়া, এমনকি বই নিষিদ্ধ করার বহু ঘটনা ঘটেছে এবং তিনি সেসবের প্রতিবাদ করেছেন। তার ভাষায়, এখন এসব নিন্দনীয় কাজ করে ‘প্রকৃতপক্ষে শেখ হাসিনাকেই অনুসরণ করা হচ্ছে’ এবং মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে।
তবে তার এই অবস্থান নিয়েই সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের কেউ কেউ বলছেন, আসিফ নজরুল অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকার সময়ে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্থাপনায় হামলার ঘটনায় তিনি টু শব্দটি করেননি। ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানেও বঙ্গবন্ধু ও শেখ পরিবারের নামে থাকা ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভাঙার ঘটনা ঘটে।
তবে চলতি বছরের এপ্রিলে এক বক্তব্যে আসিফ নজরুল বলেছিলেন, ‘ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর ভাঙা ঠিক হয়নি।’ ২০২৬ সালের আগস্টে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ভাঙচুরের ঘটনায় মুহাম্মদ ইউনূস, আসিফ নজরুলসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে করা মামলার আবেদন আদালত খারিজ করে দেন।
তবু প্রশ্ন উঠেছে, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রির ঘটনায় এখন আসিফ নজরুলের কথিত সরব হওয়ার কারণ কী? সমালোচকেরা মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিএনপি সরকারের সময়ে তার এই অবস্থানের পেছনে রাজনৈতিক হিসাব থাকতে পারে। তিনি মূলত জামায়াতঘনিষ্ঠ বা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি সহানুভূতিশীল।
এদিকে ঘটনার সূত্রপাত সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে। বাংলাবাজারে ইউপিএলের বিক্রয়কেন্দ্রে দুজন ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ কিনতে যান। ইউপিএলের বিবৃতি অনুযায়ী, কর্মীরা বইটি বের করে দেওয়ার পর ওই ব্যক্তিরা বইটি বিক্রি করা নিয়ে আপত্তি তোলেন। তাদের দাবি ছিল, বইটি নিষিদ্ধ। পরে আরও লোকজন সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে বিক্রয়কেন্দ্রের শাটার নামিয়ে তালা দেওয়া হয়। ইউপিএলের দুই কর্মী আমিনুল ইসলাম ও হুমায়ূন কবীরকে আটকে রাখার অভিযোগও ওঠে। পরে তাদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ওই দুই কর্মীকে থানায় নেওয়া হয়নি; তাদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়েছিল। পরে সেখান থেকেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘটনার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হয়েছে কি না, তা নিয়েও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন তথ্য এসেছে।
ঘটনার পর মঙ্গলবার ইউপিএল নিজেদের যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে বিবৃতি দেয়। প্রতিষ্ঠানটি স্পষ্ট করে জানায়, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ নয়। কোনো বই নিষিদ্ধ করতে হলে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে তা জানাতে হয়। এ বইয়ের ক্ষেত্রে সরকার বা আদালতের পক্ষ থেকে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে ইউপিএলের জানা নেই। দায়িত্বশীল কোনো কর্তৃপক্ষ আইনানুগভাবে বইটি নিষিদ্ধ করলে তারা সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে বলেও জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
ইউপিএল আরও বলেছে, প্রকাশিত প্রতিটি বইয়ের দায় তারা গ্রহণ করে। অতীতেও বিভিন্ন সরকার, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নানা বই নিয়ে আপত্তি এসেছে। চাপের মুখে বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রকাশনার মৌলিক নীতি থেকে তারা সরে যায়নি। প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করেছে, তাদের প্রকাশিত মওদুদ আহমদের গ্রন্থ এবং আসিফ নজরুলের গঙ্গাচুক্তিবিষয়ক বই নিয়েও অতীতে চাপের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে ইউপিএল দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশ সৃষ্টি ও মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাতের বহু প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট এই বইয়ে পাওয়া যায়। কোনো ফৌজদারি অপরাধে উসকানি নেই—এমন বইয়ের প্রকাশনা ও বিপণনে আইনসম্মত প্রক্রিয়ার বাইরে হস্তক্ষেপ জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর বলেও মন্তব্য করেছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি।
ঘটনাটির প্রতিবাদ এসেছে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও। মঙ্গলবার ৩৬ জন নাগরিকের দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউপিএলের বাংলাবাজার শোরুমে তালা ঝোলানো এবং কর্মীদের হয়রানির ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানানো হয়। বিবৃতিতে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ইউপিএলের কর্মীসহ সব প্রকাশক ও বই বিক্রেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
নাগরিকদের বিবৃতিতে বলা হয়, কোনো বইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ, সমালোচনা কিংবা বিতর্ক করার অধিকার সবার আছে। কিন্তু সেই অধিকার অন্যের বই প্রকাশ, বিক্রি বা পড়ার অধিকার কেড়ে নেওয়ার অনুমতি দেয় না। কোনো বই নিষিদ্ধ কি না, সেটি আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হওয়া উচিত, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ঘোষণা বা চাপের ভিত্তিতে নয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিয়ে ভিন্ন মূল্যায়ন থাকতে পারে; কিন্তু মতভেদের পথ হওয়া উচিত আলোচনা, গবেষণা ও যুক্তি। বইয়ের দোকানে হামলা বা বিক্রয়কর্মীদের হয়রানি তার বিকল্প হতে পারে না।
৩৬ নাগরিকের বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সারা হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা, সামিনা লুৎফা ও রুশাদ ফরিদী, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক বীথি ঘোষ, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, লেখক ও অধিকারকর্মী রেহনুমা আহমেদ, অধ্যাপক ফিরদৌস আজীম, অর্থনীতিবিদ জিয়া হাসান, নারী অধিকারকর্মী মাহীন সুলতান, মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন, সামাজিক কর্মী খুশী কবিরসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ইউপিএলের বক্তব্য—আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো বইকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা যায় না—এবং নেটিজেনদের প্রতিবাদী পোস্টকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অবস্থান, মুক্তচিন্তা ও বই প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াকে সামগ্রিক জনমতের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে যাচাইযোগ্য জনমত জরিপও পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রির ঘটনাটি শুধু একটি বই বিক্রি বন্ধের বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রকাশকের স্বাধীনতা, পাঠকের পছন্দের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং কোনো বই নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়ার প্রশ্ন। আসিফ নজরুলের প্রতিবাদ সেই বিতর্ককে আরও রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। একই সঙ্গে তার অতীত ভূমিকা ও বর্তমান অবস্থানের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
খবরটি শেয়ার করুন