সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যেভাবে ছড়াল আগুন *** আশুলিয়ায় কাভার্ড ভ্যান থেকে ৬ লাশ উদ্ধার *** জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথম স্ত্রীসহ থানায় এমপি নজরুল *** সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা *** কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন *** শিল্পকলা একাডেমির সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, পল্লবীতে বাসে আগুন *** ন্যাম ভবন থেকে সাতক্ষীরার এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার *** সমালোচনার মুখে হাফেজদের উপহার দেওয়া সেই বই ফেরত নিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী *** অপ্রতিমের মা ড. নাহিদার চব্বিশের সেই ফেসবুক পোস্ট কেন আলোচনায়, কী লিখেছিলেন তিনি *** পাকিস্তান কি সৌদি আরবকে রক্ষা করতে যুদ্ধে জড়াবে

পদত্যাগের পর সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে কেন ইতিবাচক মূল্যায়ন করছে সরকার ও বিএনপি?

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৫:৩২ অপরাহ্ন, ২৬শে জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন তার গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে আন্দোলন করছে, অন্যদিকে সরকার এবং ক্ষমতাসীন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা তার সাংবিধানিক ভূমিকার প্রশংসা করছেন। সরকারের মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্যদের বক্তব্য এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির মন্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—সরকার চাইছে, সাহাবুদ্দিনের বিদায়কে রাজনৈতিক সংঘাতের নয়, বরং একটি সাংবিধানিক ও স্বাস্থ্যগত প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে।

আজ রোববার (২৬ জুলাই) সচিবালয়ে পুলিশের সাহসিকতা ও প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “সাবেক রাষ্ট্রপতিকে গ্রেপ্তারের মতো কিছু দেখছি না।” তিনি জানান, বর্তমানে সরকার তার বিরুদ্ধে আমলে নেওয়ার মতো কোনো অভিযোগ দেখছে না। আইন অনুযায়ী তিনি যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী, সেগুলোও পাবেন এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মো. সাহাবুদ্দিন সাংবিধানিক দায়মুক্তি (ইমিউনিটি) ভোগ করেছেন। দায়িত্ব পালনের সময় তিনি সংবিধান অনুযায়ী কাজ করেছেন এবং স্বৈরাচার সরকার, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এবং বর্তমান সরকারের সময়ও সরকার তার সহযোগিতা পেয়েছে। তবে দায়িত্বের বাইরের কোনো সময়ের বিষয়ে কারও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি হবে।

একই দিন সাংবাদিকেরা জানতে চান, লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মো. সাহাবুদ্দিনের কথিত ফোনালাপের বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে দেখেছেন, কিন্তু সরকারের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে কারও সঙ্গে কথা বলতে বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হয়—এমন দাবি তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।

এর আগে ২৪ জুলাই, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায়ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকার রাষ্ট্রপতির পদকে কোনো ব্যক্তির নয়, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে। তার ভাষায়, “তিনি যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন।”

একই সঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত হওয়ায় সাহাবুদ্দিনের আগের কিছু ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা থাকতেই পারে। কিন্তু ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ৫ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত রাষ্ট্রকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং সেই ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার।

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে ২৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বক্তব্য দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, তার ব্যক্তিগত মূল্যায়নে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত হলেও বর্তমান জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রতি মো. সাহাবুদ্দিন সব সময় সমর্থন ও শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। তিনি তার মঙ্গল কামনা করেন।

স্পিকার জানান, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি বিকেল ৫টা ১ মিনিটে তার স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগপত্রে তিনি গুরুতর শারীরিক অসুস্থতাকে দায়িত্ব ছাড়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা এবং সম্প্রতি শনাক্ত হওয়া ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’র কারণে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়েছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও আজ এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সরকার চায় না অন্যায়ভাবে কেউ কষ্ট পাক। তবে সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো খতিয়ে দেখে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও সংবিধান অনুসারেই হবে বলে তিনি জানান।

সরকারের এই ধারাবাহিক অবস্থানের বিপরীতে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে কর্মসূচি পালন করছে। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে এ দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না সরকার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, রাজনৈতিকভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার সবার রয়েছে, কিন্তু সরকার বর্তমানে এমন কোনো অভিযোগ দেখছে না, যার ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তারের প্রয়োজন রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ও বিএনপির এই অবস্থানের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিবেচনা রয়েছে। প্রথমত, রাষ্ট্রপতির পদকে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় রাখার চেষ্টা করছে সরকার। রাষ্ট্রপতির বিদায়ের সঙ্গে যদি তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার, মামলা বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চিত্র যুক্ত হয়, তাহলে দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে কারণে সরকার বারবার বলছে, এটি কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রশ্ন।

দ্বিতীয়ত, সরকার চায় আন্তর্জাতিক মহলে এই বার্তা পৌঁছাতে যে রাষ্ট্রপতির বিদায় রাজনৈতিক চাপের কারণে নয়, বরং তার শারীরিক অসুস্থতার কারণে হয়েছে। পদত্যাগপত্রে অসুস্থতার বিস্তারিত ব্যাখ্যা, স্পিকারের সংবাদ সম্মেলন এবং মন্ত্রীদের ধারাবাহিক বক্তব্য—সবকিছু মিলিয়ে সেই বার্তাই প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় সাহাবুদ্দিনের ভূমিকার স্বীকৃতি দিতেও সরকার আগ্রহী। বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে এসেছে, সংকটময় সময়ে তিনি রাষ্ট্রকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে রাখতে সহযোগিতা করেছিলেন। সেই মূল্যায়ন থেকেই তাঁর প্রতি ইতিবাচক মন্তব্য করা হচ্ছে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে। তবে দায়িত্ব পালন ও ব্যক্তিগত দায়—এই দুটি বিষয়কে পৃথকভাবে দেখা প্রয়োজন। কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনগত প্রক্রিয়ায় তদন্ত ও বিচার হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সব মিলিয়ে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সরকার ও বিএনপির বক্তব্যে একটি অভিন্ন সুর স্পষ্ট হয়েছে। তারা একদিকে তার অতীতের কিছু ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার সুযোগ স্বীকার করছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বিশেষ করে অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক সংকটে তার সাংবিধানিক ভূমিকার প্রশংসা করছেন। একই সঙ্গে সরকার বারবার জোর দিচ্ছে, তার পদত্যাগের মূল কারণ স্বাস্থ্যগত এবং তার সঙ্গে সরকারের কোনো রাজনৈতিক বিরোধ নেই।

বিপরীতে তাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্দোলনকারী দলগুলোর অবস্থানও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে বিতর্ক এখন শুধু একজন সাবেক রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্র করে নয়; বরং সাংবিধানিক রাজনীতি, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক বার্তা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মো. সাহাবুদ্দিন হাফিজ উদ্দিন আহমদ সালাহউদ্দিন আহমদ মো. আসাদুজ্জামান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250