ছবি: সংগৃহীত
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের প্রায় দুই বছর পরও তার দেশে ফেরা, অবস্থান, আইনি ভবিষ্যৎ এবং রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা থামেনি। তার বিরুদ্ধে একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায়, বিভিন্ন মামলার অগ্রগতি এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি নতুন করে বিষয়টিকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, শেখ হাসিনাকে ঘিরে এখন যে বিতর্ক চলছে, তা শুধু একটি বিচারিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যতের ক্ষমতার সমীকরণও।
তার মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা কিংবা না-ফেরার প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। মহিউদ্দিন আহমদ শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা ও মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে তার বিশ্লেষণধর্মী কলাম ‘দেশে ঢুকতে এত অস্থির হলে পালালেন কেন’ শিরোনামে লিখেছেন। কলামটি আজ শুক্রবার (১০ জুলাই) প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জানান, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেবে। পরে জানা যায়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি উড়োজাহাজে করে তিনি ভারত গেছেন। এরপর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তার ভারতে পৌঁছানোর খবর প্রকাশ করলেও, এরপর থেকে তার অবস্থান সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে খুব কম তথ্যই প্রকাশ্যে এসেছে।
এ সময় থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনার নামে বিভিন্ন অডিও বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সেগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এমন অডিও তৈরি করাও সম্ভব হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
মহিউদ্দিন আহমদ তার আলোচনায় একটি প্রশ্ন তুলেছেন। তার ভাষায়, যদি শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে এতটাই আগ্রহী হন, তাহলে তিনি দেশ ছাড়লেন কেন? তার মতে, সে সময় রাষ্ট্রের প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারি কাঠামো তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফলে শেষ মুহূর্তে দেশত্যাগের সিদ্ধান্তের পেছনের বাস্তব কারণ নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।
তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, শেখ হাসিনার জীবনে এটি প্রথম বিদেশে দীর্ঘ সময় অবস্থান নয়। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি কয়েক বছর ভারতের বাইরে ছিলেন। সেই সময় তিনি দেশে ফিরতে পারেননি—এমন বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বয়ানের অংশ ছিল।
তবে মহিউদ্দিন আহমদের মূল্যায়ন ভিন্ন। তার মতে, সে সময় দেশে ফেরার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার সুস্পষ্ট প্রমাণ জনসমক্ষে আসেনি। বরং তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, শেখ হাসিনা নিজে কতটা সক্রিয়ভাবে দেশে ফেরার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেটিও আলোচনার বিষয়।
কলামে তিনি শেখ হাসিনার তৎকালীন পাসপোর্ট নবায়নের তথ্যও উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, সে সময় তিনি বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করছিলেন। ফলে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন কি না, সে প্রশ্নও আলোচনার দাবি রাখে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ বিভিন্ন আদালতে একাধিক মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। এই রায়কে কেন্দ্র করেই নতুন করে আইনি বিতর্ক শুরু হয়েছে।
মহিউদ্দিন আহমদ তার লেখায় বিবিসি বাংলাকে দেওয়া আইনজীবী মনজিল মোরশেদের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। মনজিল মোরশেদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও দেরিতে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে আবেদন করতে হয়। যদি আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করেন, তাহলে আপিল শুনানির আগে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত রাখার আবেদন করা যেতে পারে। তার মতে, আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করলে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর থাকবে না এবং আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তা স্থগিত থাকতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারব্যবস্থায় আপিল বিচারপ্রক্রিয়ার একটি স্বীকৃত অধিকার। কোনো দণ্ডিত ব্যক্তি আপিল করলে উচ্চ আদালত রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত রাখবেন কি না, সেটি আদালতের বিবেচ্য বিষয়। প্রতিটি মামলার বাস্তবতা, আইন এবং উপস্থাপিত যুক্তির ভিত্তিতেই আদালত সিদ্ধান্ত নেন।
বর্তমানে শেখ হাসিনার লাল পাসপোর্ট বাতিল হওয়ায় দেশে ফিরতে হলে তার ভ্রমণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি লাগতে পারে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানরত কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের বৈধ পাসপোর্ট না থাকলে বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে ট্রাভেল পাস নেওয়ার সুযোগ থাকে। তবে সেটি দেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।
আইন অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে যদি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর থাকে, তাহলে দেশে ফিরলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। সে ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করার দাবি রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালোভাবে উচ্চারিত হলেও বাস্তবে সেই প্রক্রিয়া সহজ নয়। কারণ, একজন বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক, আইনি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাসহ একাধিক বিষয় জড়িত থাকে।
তিনি আরও মনে করেন, শেখ হাসিনা তখনই দেশে ফিরতে চাইবেন, যখন তিনি নিজের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত হবেন। তার ভাষায়, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে সেটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দেবে। সেই পরিবর্তন কবে আসবে বা আদৌ আসবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা আগামী দিনেও দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে। একদিকে বিচারিক প্রক্রিয়া চলবে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করবে। ফলে আদালতের সিদ্ধান্ত, সরকারের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বাস্তবতা—এই তিনটি বিষয়ই ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এখন শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিচারব্যবস্থা, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা। তাই বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আদালতের কার্যক্রম, রাষ্ট্রের নীতি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অবস্থানের দিকে নজর রাখাই যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
খবরটি শেয়ার করুন