ছবি: সংগৃহীত
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছেন। রায়কে সরকার, অধিকাংশ রাজনৈতিক ও অনেক বিশ্লেষক স্বাগত জানিয়েছেন। তবে ভিন্ন কথাও শোনা যাচ্ছে অনেক বিশ্লেষকের কণ্ঠে। তারা বলছেন, বিষয়টকে আন্তর্জাতিকভাবে যারা বাইরে থেকে দেখছেন, তারা কীভাবে মূল্যায়ন করছেন, তা বিবেচনায় নেওয়া নানা কারণে খুব জরুরি।
গত ১৭ই নভেম্বর শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এই রায় নিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এএফপি, বিবিসি, সিএনএন, আল-জাজিরা, গার্ডিয়ানসহ অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি, আল জাজিরা এবং ভারতের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম এই রায়ের খবর সরাসরি প্রচার করেছে।
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেন, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর বিবৃতি ও অবস্থানের কারণেও বহির্বিশ্ব থেকে অনেকে শেখ হাসিনার রায়কে কীভাবে দেখছেন, তারা এটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের অনুপস্থিতিতে বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। আলাদা বিবৃতিতে মানবাধিকার নিয়ে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুজনের অনুপস্থিতিতে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং তাদের পছন্দের আইনজীবী দেওয়ার সুযোগ ছিল না, যেটি গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়, এই মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরোধিতা করেছে, কেননা দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের সাজা বাতিলের আহ্বান জানিয়ে আসছে জাতিসংঘ। একইসাথে তারা বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। তবে এই রায়কে 'ভুক্তভোগীদের জন্য একটি মুহূর্ত' বলে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দুজনের (শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল) অনুপস্থিতিতে বিচারের 'নজীরবিহীন গতি' এবং রায় এই মামলার ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে 'উল্লেখযোগ্য উদ্বেগ' তৈরি করে বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাদের বক্তব্যকে অনেকটা সমর্থন করছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে মাসুদ কামাল প্রধান উপদেষ্টাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘শেখ হাসিনার বিচার করে আপনি সারজিস আলমকে খুশি করতে পেরেছেন। কারণ সে বলেছিল, শেখ হাসিনার বিচারের আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে না। তো আপনি তাকে খুশি করলেন, আমরা বাকি দেশবাসী কি গাঙের জলে ভেসে এসেছি?’
দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। তার মতে, ‘এই বিচারের রায় খুবই তড়িঘড়ি করে দেওয়া হয়েছে। এই বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো বিবৃতি দিয়েছে। তারা কি টাকা খেয়ে বিবৃতি দিয়েছে? না, কারণ তারা শেখ হাসিনার আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, সেই বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও বিবৃতি দিয়েছিল।’
মাসুদ কামাল বলেন, ‘এই রায় নিয়ে আলোচনা অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। আগামীতে আরো অনেক আলোচনা হবে। কাজেই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের কাজকর্মগুলো যেন সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য হয়।’
তিনি বলেন, ‘বিচারের রায় নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিচার প্রক্রিয়া কি যথাযথ ছিল? বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে কি অতিরিক্ত তাড়াহুড়া হয় নাই? একটা হত্যা মামলায় একজনকে মৃত্যুদণ্ড দেবেন, সেটা এত অল্প সময় কিভাবে হয়? এক বছরের মধ্যে চার বার আইন চেঞ্জ হয়েছে। তো বোঝাই যাচ্ছে, এটা মোটিভেটেড। এই প্রশ্নগুলো তো উঠবে।’
মাসুদ কামাল বলেন, ‘শেখ হাসিনা যে কাজটা করেছেন, তার জন্য তো যেকোনো ফৌজদারি আদালতে তিনি অপরাধী হবেন। এটার জন্য একটা দ্রুত বিচার আদালত করে দিতেন। সেখানেই হয়ে যেত। কিন্তু এত তাড়াহুড়া ছিল যে, জাতীয় নির্বাচনের আগেই এটা করতে হবে। কারণ, প্রধান উপদেষ্টাকে বলতে শুনেছি, তার তিনটা কমিটমেন্ট ছিল। এক নম্বর কমিটমেন্ট হলো বিচার করা, দুই নম্বর কমিটমেন্ট হলো সংস্কার করা, তিন নম্বর কমিটমেন্ট হলো নির্বাচন করা। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, এই কমিটমেন্টগুলো আপনি কোথায় পেয়েছেন?'
খবরটি শেয়ার করুন