ফাইল ছবি (সংগৃহীত)
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে বলেছিলেন, 'বঙ্গবন্ধু মহান নেতা। এ নিয়ে বিতর্কের কী আছে!' দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি থাকাকালে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে জিয়াউর রহমান এভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে। মতিউর রহমান চৌধুরী সেই সাক্ষাৎকার নেওয়ার স্মৃতিচারণা করে এ কথা জানিয়েছেন।
১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় মতিউর রহমান চৌধুরী দৈনিক সংবাদে জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের শাসনকালে দৈনিক সংবাদে এক প্রতিবেদন করায় তার অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির তথ্য উপদেষ্টা তাকে ডেকে পাঠান বঙ্গভবনে। সদ্য প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের আমলেও একবার মতিউর রহমান চৌধুরীকে কারাগারে যেতে হয় বলে জানান তিনি।
জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মুখোমুখি হয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়ার স্মৃতিচারণা করে মতিউর রহমান চৌধুরী এক বিশেষ নিবন্ধে এসব কথা বলেন। তার লেখা নিবন্ধটি সাপ্তাহিক জনতার চোখের চলতি সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। এতে তিনি বলেন, 'সৌভাগ্য হয়েছিল এই তিন রাজনৈতিক সেলিব্রেটির মুখোমুখি হওয়ার। এক নয় একাধিকবার।' তার নিবন্ধটি জনতার চোখের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন হিসেবে 'তিন তারকার মুখোমুখি' শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।
জিয়াউর রহমানের সরকারের সময় অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে মতিউর রহমান চৌধুরী নিবন্ধে বলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়া যখন ক্ষমতায়, তখন সংবাদে প্রকাশিত আমার এক রিপোর্ট নিয়ে হুলস্থুল কাণ্ড ঘটে গেল। মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে মন্ত্রীরা কোরআন শরিফ ছুঁয়ে শপথ করেছিলেন। ঘুষ খাবেন না, তথ্য পাচার করবেন না। এই খবরটা আমি পেয়ে গিয়েছিলাম কোনো একটি সূত্রে। কিন্তু রিপোর্টটি কনফার্ম করতে পারছিলাম না। ইত্তেফাকের সহকর্মী আলমগীর হোসেন আমাকে সাহায্য করেছিলেন। রিপোর্ট প্রকাশের পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া।
তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়ার তথ্য উপদেষ্টা দাউদ খান মজলিস আমাকে ডেকে পাঠালেন বঙ্গভবনে। জানতে চাইলেন সূত্র। তিনি জানতেন আমি সূত্র বলব না। শুধু বললাম, খবরটা ঠিক আছে কিনা। তিনি বললেন, খবর নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। প্রেসিডেন্ট সাহেব জানতে চাচ্ছেন- কে মিডিয়ায় এই খবরটি লিক করলো। পেশাদার সাংবাদিক দাউদ খান মজলিস সূত্র জানতে পারলেন না। অনেক পীড়াপীড়ির পর বললাম, সম্পাদক ছাড়া কারও কাছে সূত্র বলা সাংবাদিকতার নীতিমালা পরিপন্থি। বললেন, তুমি যাও। আমি কবির সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করব।
মতিউর রহমান চৌধুরী লেখেন, পরে অবশ্য আমার অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল হয়ে গিয়েছিল। এক সপ্তাহ বাদে প্রেসিডেন্ট হাউস থেকে একটা চিঠি এলো। যে চিঠিতে আমার সাহসিকতার প্রশংসা করে বলা হলো- খবরটা যিনি লিক করেছেন, তার নৈতিকতা নিয়েই আমাদের যতসব প্রশ্ন।
মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, বিরল সম্মান, বিরল খ্যাতি। অনেকটা ঈর্ষণীয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নজিরবিহীন। এক পরিবারের তিনজন খ্যাতির শীর্ষে। একজন প্রেসিডেন্ট, একজন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। আরেকজন রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার আগেই জনপ্রিয়তার মানদণ্ডে এগিয়ে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, প্রয়াত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কথা বলছি।
তিনি লেখেন, 'জানতে চাইলাম বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তার (জিয়াউর রহমান) ধারণা কী। এই প্রশ্নের জবাব তো সংবাদ পত্রিকাকে আগেই দিয়েছি। সহকর্মী আশরাফ খান তাকে প্রশ্ন করেছিলেন। জবাবে জিয়া বলেন, বঙ্গবন্ধু মহান নেতা। এ নিয়ে বিতর্কের কী আছে! আমাকেও একই কথা বললেন। এটা সংবাদে শিরোনাম হয়েছিল।'
খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হওয়া প্রসঙ্গে মতিউর রহমান চৌধুরী লেখেন, ’৯৯-এর শেষের দিকে এক দুপুরে কোথায় যেন যাচ্ছিলাম গাড়িতে করে। এমন সময় একটা ফোন এলো। অপরপ্রান্ত থেকে তারেক রহমান কথা বলছেন। বললেন, আমি তারেক বলছি। আম্মা আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। আমি তখন ভাবতেও পারিনি কেন তিনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন। আমি তখন মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া একের পর এক মামলা দিয়ে আমাকে নাস্তানাবুদ করছেন। জীবনটা অতিষ্ঠ করে ফেলেছেন। পত্রিকার পাতায় এগুলো ছাপা হচ্ছিল।
তিনি বলেন, সম্ভবত এসব খবর দেখেই তিনি কিছুটা বিরক্ত ছিলেন। এরই ফলশ্রুতিতে টেলিফোনে আমাকে বললেন, মতিউর রহমান সাহেব আপনি ভয় পাবেন না। আমরা আছি আপনার সঙ্গে। আমি কিছুটা অবাকই হলাম। কারণ তিনি তো আমার সম্পর্কে খুব একটা জানেন না। বলতে দ্বিধা নেই- তখনই তার সম্পর্কে আমার ধারণা পাল্টে গেল। যোগাযোগ বাড়ল। পাশাপাশি তারেক রহমানের সঙ্গেও। আমি যেহেতু ক্ষমতা থেকে দূরে থাকি সে কারণে দূরত্ব মেনে চলি।
তিনি বলেন, ২০০১ এ ক্ষমতায় আসার পর বেগম জিয়া আমাকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, অনেকে তো অনেক কিছুই চায়। আপনি তো কিছু চাইলেন না। বললাম, ম্যাডাম এটা তো আমার কাজ নয়। ভালো কাজের প্রশংসা করি, খারাপ কাজের সমালোচনা। এতে আপনারা মাঝে-মধ্যেই বিরক্ত হন। তখন তার স্বভাবসুলভ জবাব- আমরা কি শুধু বিরক্তই হই, ভালোবাসি না! মানবিক গুণাবলিতে তিনি ছিলেন অনন্য। মানুষ তাকে ভালোবাসে মৃদুভাষী হওয়ার জন্য। তিনি আসলেই বলেন খুব কম, শুনেন ঢের বেশি।
তিনি লেখেন, তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও আবেগ আর বাস্তবতার। অসংখ্যবার কথা বলেছি দেশে এবং বিদেশে। সাক্ষাৎকার নিয়েছি। সুখ-দুঃখ শেয়ার করেছি। ২০০৩ এর ২৮শে ডিসেম্বর চ্যানেল আইতে সাক্ষাৎকার নেয়। যেটা ছিল ইলেক্ট্রনিকস মিডিয়ায় প্রথম সাক্ষাৎকার। ঘণ্টাব্যাপী এই সাক্ষাৎকারে অনেক বিব্রতকর প্রশ্নও করেছি। কিন্তু তিনি একবারের জন্যও বিরক্ত হননি। বরং সাক্ষাৎকার শেষে জড়িয়ে ধরেন। বলেন, আমি পেরেছি তো আপনার মারদাঙ্গা প্রশ্নের জবাব দিতে? বললাম, চমৎকার, ধারণাতীত। যে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রতিদিনের রাজনীতিতে দুই নেতাকে টেনে না আনাই ভালো’।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে নতুন করে প্রকাশিত হচ্ছে সাপ্তাহিক জনতার চোখ। এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। 'জনতার চোখ' আগেও প্রকাশিত হয়েছিল, শেখ হাসিনার গত সরকারের আমলে এর প্রকাশনা বন্ধ করে দেয় প্রশাসন।
৫৪ বছরের পেশাগত জীবনে সাংবাদিক ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী গণমাধ্যমের নানা চড়াই-উৎরাইয়ের সাক্ষী। কখনো কখনো তিনি নিজেই ইতিহাসের উপাদান ও অধ্যায়। এ সময়ের মধ্যে তথ্যপ্রকাশের দায়ে তাকে একাধিকবার আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে, জেলেও গিয়েছেন একাধিকবার। দেশ ছাড়তে হয়েছে, সাজাও হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন