ছবি: খালেদ সরকার
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা মহাখালী। চারপাশে যানজট, হাসপাতালের ভিড় আর মানুষের তাড়াহুড়োর মাঝেই ধরা পড়ে একটি হৃদয়বিদারক দৃশ্য—ধূসর একটি চাদরে মোড়ানো ছোট্ট এক শিশুকে কোলে নিয়ে দৌড়াচ্ছেন এক যুবক। মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি হতেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অসংখ্য মানুষের মনে নাড়া দেয় ছবিটি, তৈরি হয় আবেগ আর নানা ব্যাখ্যা।
ছবিটি তোলা হয়েছিল মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের সামনে। চাদরে মোড়ানো যে শিশুটির নিথর দেহ দেখা গেছে, তার নাম মো. সাদমান—মাত্র তিন বছর বয়স। হামে আক্রান্ত হয়ে গত মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালটিতেই তার মৃত্যু হয়।
ছবিটি তুলেছিলেন দৈনিক প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক খালেদ সরকার। পরে সেটি প্রকাশিত হলে দ্রুতই ভাইরাল হয়ে যায়। তবে ছবিটি ছড়িয়ে পড়ার পর তার বর্ণনা ঘিরে তৈরি হয় নানা বিভ্রান্তি। অনেকেই ছবিটি শেয়ার করে লিখেছেন—“সন্তানের লাশ কোলে দাঁড়িয়ে আছেন এক অসহায় বাবা।” আবার কেউ দাবি করেন, “অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে সন্তানকে কোলে নিয়েই ছুটছেন পিতা।”
কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছবিতে যাকে শিশুটিকে কোলে নিতে দেখা গেছে, তিনি সাদমানের বাবা নন। তিনি সাদমানের এক আত্মীয়—রেদোয়ান আহমেদ রাফি। হাসপাতাল থেকে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করার পর তিনিই মরদেহটি নিয়ে বেরিয়ে আসেন।
সাদমানের পরিবার থাকে ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এলাকায়। বাবা মো. সজীব একটি কাপড়ের দোকানে চাকরি করেন। মা আফরিন মীম। তাদের একমাত্র সন্তান ছিল সাদমান।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় দশদিন আগে সাদমান তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয়। ১২ এপ্রিল তাকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ দেওয়ার পর পরামর্শ দেওয়া হয়, শরীরে র্যাশ দেখা দিলে যেন হামের জন্য নির্ধারিত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এরপর কয়েকদিনের মধ্যে শিশুটির শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। ১৬ এপ্রিল তাকে মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রথমে সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসা চললেও অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়।
মঙ্গলবার সকালেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সাদমানের মা ফোন করে তার বাবাকে দ্রুত হাসপাতালে আসতে বলেন। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছে তিনি দেখতে পান, তার সন্তান আর বেঁচে নেই।
সাদমানের বাবা মো. সজীব বলেন, “আমি যখন গিয়ে দেখি, আমার ছেলে নিথর হয়ে শুয়ে আছে। তখনও বুঝতে পারিনি সে আর নেই।” আর মা আফরিন মীমের ভাষায়, “ওর বাবা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছিল, সেই দৃশ্য আমি ভুলতে পারবো না।”
শিশুটির মৃত্যুর পরপরই হাসপাতালে উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনরা মরদেহ নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। এ সময় সাদমানের বাবার শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ায় রেদোয়ান আহমেদ রাফি শিশুটিকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে আসেন। হাসপাতাল থেকে বের হয়ে ফুটওভার ব্রিজ পার হয়ে একটি সিএনজি নিয়ে কামরাঙ্গীরচরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি।
ঠিক সেই সময়ই ঘটনাস্থলে ছিলেন ফটোসাংবাদিক খালেদ সরকার। তিনি জানান, “হঠাৎ দেখি কয়েকজন নারী কান্না করতে করতে দৌড়াচ্ছেন। তাদের অনুসরণ করে গিয়ে দেখি একজন লোক একটি শিশুর মরদেহ নিয়ে যাচ্ছে। তখনই আমি ছবিগুলো তুলি।”
ছবিটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নানা ধরনের গল্প তৈরি হতে থাকে। কেউ কেউ দাবি করেন, অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে শিশুটিকে কোলে নিয়েই নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে এই তথ্য সঠিক নয় বলে নিশ্চিত করেছেন পরিবার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উভয়ই।
সাদমানের আত্মীয় রাফি বলেন, “আমরা দ্রুত বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্যই সিএনজি নিয়েছিলাম। অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ার বিষয়টি সত্য নয়।”
এদিকে শিশুটির চিকিৎসা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন তার বাবা-মা। তাদের দাবি, হাসপাতালে যথাযথ যত্নের অভাব ছিল। আফরিন মীম বলেন, “নার্সরা ঠিকমতো কেয়ার করতো না। জ্বর নিয়ে আমরা বারবার বললেও তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।”
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ডিএনসিসি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. আসিফ হায়দার জানান, “আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিয়েছি। কিন্তু শিশুটির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল ছিল। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।”
তিনি আরও জানান, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় গত মার্চ মাস থেকেই বিশেষ ইউনিট চালু করা হয়েছে। এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি রোগী ভর্তি হলেও মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম।
এদিকে ছবিটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ফেসবুক ব্যবহারকারী রাশেদ মাহমুদ লিখেছেন, “একটি ছবি পুরো দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।” আরেকজন সাবিহা নওরীন লিখেছেন, “ছবিটি দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। এমন মৃত্যু কোনো শিশুর প্রাপ্য নয়।”
তানভীর ইসলাম নামে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “আমরা শুধু ছবি শেয়ার করি, কিন্তু এর পেছনের সত্যটা জানার চেষ্টা করি না—এটাই দুঃখজনক।”
তবে কেউ কেউ গুজব ছড়ানোর প্রবণতা নিয়েও সমালোচনা করেছেন। মেহেদী হাসান জয় নামে একজন লিখেছেন, “ভুল তথ্য ছড়িয়ে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করা উচিত নয়। সত্যটা জানা জরুরি।” শিশু সাদমানকে মৃত্যুর দিনই দাফন করা হয় আজিমপুর কবরস্থানে। পরদিন তার বাবা-মা আবারও সেখানে ছুটে যান একমাত্র সন্তানের কবর দেখতে—যেখানে নিঃশব্দে লুকিয়ে আছে এক পরিবারের অপার শোক আর বেদনার গল্প।
একটি ছবি, অসংখ্য ব্যাখ্যা—কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময়ই ভিন্ন। সাদমানের গল্পটি সেই বাস্তবতারই নির্মম উদাহরণ, যা আমাদের শুধু আবেগী করে না, ভাবতেও বাধ্য করে—আমরা কি সত্য জানার আগেই খুব দ্রুত বিচার করে ফেলি না?
খবরটি শেয়ার করুন