ফাইল ছবি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময়, পথ ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি নিয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে যে আলোচনা চলছে, তার একটি রূপরেখা আগামী শুক্রবারের বৈঠকে চূড়ান্ত হতে পারে। ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা। দিল্লি ও কলকাতায় অবস্থানরত কেন্দ্রীয় কমিটির ২১ জন নেতা ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে সুখবর ডটকমকে।
কেন্দ্রীয় কমিটির বাইরে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অন্তত সাতজন সুখবর ডটকমকে বলেছেন, ১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠকটি শুধু সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা, সম্ভাব্য সময়, ফেরার পথ, নিরাপত্তা এবং তার প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রস্তুতির বিষয়েও মতামত নেওয়া হতে পারে। তবে এসব বিষয়ে বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে কি না, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
তবে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া জানিয়েছেন, ভারতে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনা মতবিনিময় করবেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার নির্দিষ্ট কোনো এজেন্ডা নেই।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার এটাই প্রথম বড় পরিসরের সরাসরি বৈঠক হতে যাচ্ছে। দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে দেশে নিষিদ্ধ। ২০২৬ সালের এপ্রিলেও সংসদে পাস হওয়া আইনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
এই রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতার মধ্যেই শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা কয়েক সপ্তাহ ধরে নানা তথ্য দিয়ে আসছেন। গত জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নিজেই জানিয়েছিলেন, গ্রেপ্তার, কারাবন্দি হওয়া বা এমনকি হত্যার আশঙ্কা থাকলেও তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরতে চান।
এরপর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার একটি পরিকল্পনা রয়েছে। ওই পরিকল্পনায় ভারতের পেট্রাপোল হয়ে বাংলাদেশের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে এটি এখনো দলীয় সূত্রের দাবি; বাংলাদেশ বা ভারতের পক্ষ থেকে এমন কোনো সরকারি ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
সুখবর ডটকমকে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বলেছেন, ১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে এ ধরনের সম্ভাব্য পথগুলোর মধ্যে কোনটি বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। স্থলপথের পাশাপাশি আকাশপথে ফেরার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। নিরাপত্তা, সীমান্ত পরিস্থিতি, আইনি বিষয় এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের উপস্থিতির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত পথ নির্ধারণ করা হবে বলে তারা জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান বলছেন, শেখ হাসিনার বিমান ও সড়ক—দুই পথেই ফেরার প্রস্তুতি রয়েছে। তার ভাষ্য, এর সঙ্গে কৌশলগত ও নিরাপত্তার বিষয় জড়িত। দলীয় নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ফেরার পথ নির্ধারণের ক্ষেত্রে টুঙ্গিপাড়ায় যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোন পথে এবং কখন তিনি ফিরবেন, সেটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমও বলেছেন, শেখ হাসিনার ফেরার সঙ্গে কৌশলগত অনেক বিষয় জড়িত এবং সব পরিকল্পনা এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ দলের ভেতরে কোনো ধরনের প্রস্তুতি থাকলেও তার বিস্তারিত প্রকাশের আগে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রয়োজন রয়েছে।
আওয়ামী লীগের কয়েক নেতা জানিয়েছেন, যদি শেষ পর্যন্ত বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে দলীয় নেতা-কর্মীদের বড় ধরনের জমায়েতের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ‘লংমার্চ টু টুঙ্গিপাড়া’ নামে কর্মসূচির কথাও দলীয় পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে। তবে এটি এখনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার বক্তব্যেও এ ধরনের প্রস্তুতির কথা এসেছে।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে দলীয় সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের বিষয়টিও যুক্ত হতে পারে। দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যারা দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন, গ্রেপ্তার, মামলা বা নির্যাতনের মুখে পড়েছেন, তাদের নতুন সাংগঠনিক কাঠামোয় গুরুত্ব দেওয়ার আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকা কিংবা বিদেশে অবস্থান করে দলীয় কর্মকাণ্ডে দৃশ্যমান ভূমিকা না রাখা নেতাদের বিষয়ে নতুন করে মূল্যায়ন হতে পারে।
দলের ভেতরে পদ বাণিজ্য, সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও আলোচনায় আসতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ, বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর গ্রেপ্তার বা আইনি জটিলতায় পড়া নেতা-কর্মীদের কেউ কেউ পরে কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় নেতাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। এসব অভিযোগ শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছেছে।
দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি সহযোগী সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রেও পুনর্বিন্যাসের আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোন নেতা বা কর্মী কী ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন, কে সক্রিয় এবং কে নিষ্ক্রিয়—এসব বিষয় পর্যবেক্ষণের জন্য শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ একটি পর্যবেক্ষণ দল কাজ করছে বলেও কয়েক নেতা দাবি করেছেন। এসব তথ্য যাচাই করে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কাঠামো নিয়েও আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে তিনি দেশে ফিরলে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে কে দায়িত্ব পালন করবেন, সে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এ বিষয়ে কারও নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
আরেকটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। দলীয় সূত্রের দাবি, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে নয়াদিল্লিতে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে শেখ হাসিনা সরাসরি সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে পারেন। সেখানে তার দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময় ও পথ সম্পর্কে ঘোষণা আসতে পারে।
দলের কয়েক নেতা আরও দাবি করেছেন, সম্ভাব্য ওই সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি থাকতে পারে। শেখ হাসিনার সঙ্গে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল থাকবেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
দেশে ফেরার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে। দলটির কিছু নেতা মনে করছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তার নিরাপত্তা, বিচারপ্রক্রিয়া ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের নজর বাড়তে পারে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া আসবে কি না, তা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত বা বার্তার তথ্য পাওয়া যায়নি।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো তার বিরুদ্ধে থাকা আইনগত বিষয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দণ্ড দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা রায় প্রত্যাখ্যান করে বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছিলেন।
এ কারণে দেশে ফেরার যে কোনো পরিকল্পনার সঙ্গে আইনগত প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা এবং ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ও যুক্ত থাকবে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা এবং দলটির ২০২৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারার বিষয়টিও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ।
সব মিলিয়ে ১৮ সেপ্টেম্বরের দিল্লি বৈঠক আওয়ামী লীগের জন্য একাধিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগ তৈরি করতে পারে। শেখ হাসিনা কবে দেশে ফিরবেন, কোন পথ বেছে নেবেন, ফেরার আগে কোনো সংবাদ সম্মেলন করবেন কি না, দলের নেতৃত্ব কাঠামোয় পরিবর্তন আসবে কি না এবং মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের কীভাবে সংগঠিত করা হবে—এসব বিষয়ে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বৈঠকটি শেষ হওয়ার আগে এসব পরিকল্পনার কোনোটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বরের মতবিনিময়েই শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাব্য পথনকশা নিয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন