শনিবার, ১২ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮শে ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কলেজের নবীনবরণে ‘গানের কনসার্ট’ বন্ধের দাবি কওমি শিক্ষার্থীদের *** ইরান যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে, দাবি ট্রাম্পের *** দেশে সাংবাদিকদের আত্মহত্যার ঘটনা বেশি কেন *** ব্রিকস যৌথ ঘোষণায় সম্মতি নেতাদের, একতরফা যুদ্ধের নিন্দা জানাবে জোট *** ডিএনসিসির ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবসের স্টল পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী *** আসুন এবার রাষ্ট্রকে আমরা পুনর্গঠন করি: প্রধানমন্ত্রী *** ফরিদপুরে কার্টনে ভরা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির ৬ টুকরো মরদেহ উদ্ধার *** টুইন টাওয়ার থেকে লাফিয়ে পড়া সেই মানুষটি কে, ‘দ্য ফলিং ম্যান’ নিয়ে ২৫ বছরেও রহস্য *** কিশোরগঞ্জে গর্ভে থাকতেই চার শিশু বিক্রির অভিযোগ, তদন্তে পুলিশ *** তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু, তার পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন জিয়াউর রহমান

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন, ২৬শে জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন প্রবীণ সাংবাদিক ও দ্য ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তার মতে, মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পক্ষ থেকেই ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। অথচ স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র ও রাজনীতির অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বলি হন এই দুই নেতাই। একই সঙ্গে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতির আত্মত্যাগকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে।

শুক্রবার (২৪ জুলাই) দ্য ডেইলি স্টার-এর ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত ‘জুলাই চার্টার ইমপ্লিমেন্টেশন: গ্রোয়িং ডিস্ট্যান্স বিটুইন বিএনপি অ্যান্ড দ্য অপোজিশন ইজ ওয়ারিসাম’ শীর্ষক উপসম্পাদকীয়ে মাহফুজ আনাম এসব কথা বলেন।

উপসম্পাদকীয়ে তিনি লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করা জেনারেল জিয়াউর রহমান—উভয়কেই সশস্ত্র বাহিনীর কিছু সদস্য হত্যা করেন। আরও মর্মান্তিক বিষয় হলো, হত্যাকারীদের অনেকেই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর একই গোষ্ঠী জাতীয় চার নেতা—অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং দুই মন্ত্রী মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে কারাগারে হত্যা করে। পরবর্তী সময়ে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, মেজর জেনারেল মঞ্জুর, কর্নেল তাহেরসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও সহিংসতার শিকার হন।

মাহফুজ আনামের ভাষ্য, এসব আত্মঘাতী ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশ বারবার মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। একই সঙ্গে যারা মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস করে না, তাদের জন্য ইতিহাস বিকৃতির সুযোগও তৈরি হয়েছে। তার মতে, জাতি এসব অভিজ্ঞতা থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিতে পারেনি; বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সংঘাতের চক্রই দীর্ঘ হয়েছে।

উপসম্পাদকীয়ে তিনি দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার দিকেও আলোকপাত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ গণআন্দোলনের পর ১৯৯১ সালে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনকে তিনি নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে তিনি কারচুপিপূর্ণ বলে অভিহিত করে বলেন, এসব নির্বাচনের ধারাবাহিকতাই শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পথ তৈরি করে।

মাহফুজ আনামের মূল্যায়নে, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রকে পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারলেও গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থা সুদৃঢ় হয়। একই সময়ে অর্থনীতি সম্প্রসারিত হয়েছে, বেসরকারি খাত শক্তিশালী হয়েছে এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রও তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। তার মতে, ওই সময়ের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক ছিল শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা।

উপসম্পাদকীয়ে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনের বিষয়েও আলোচনা করেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সংসদীয় শাসনব্যবস্থা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা এবং একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে সেই পথ থেকে সরে আসেন।

তিনি আরও লেখেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান বাকশালের অধিকাংশ কাঠামো বিলুপ্ত করেন, যদিও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা বহাল রাখেন। পরে ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে।

মাহফুজ আনামের মতে, এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সহযোগিতা দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব এবং জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা—দুটি বিষয়ই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং গবেষণায় বহুল আলোচিত। তাদের ভাষ্য, ইতিহাসের এসব ঘটনাকে দলীয় অবস্থানের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য দলিল, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা এবং গবেষণার আলোকে মূল্যায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে স্বাধীনতার পর সংঘটিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল—এ বিষয়েও গবেষকদের মধ্যে বিস্তৃত ঐকমত্য রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের বিভাজন ও সহিংসতা থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের সংস্কৃতি বজায় রাখা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে রেখে উপস্থাপন করাই দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মাহফুজ আনাম

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250