ফাইল ছবি
দেশজুড়ে জনপ্রিয় একটি খাবার ‘মোরগ পোলাও’। বিয়ে, দাওয়াত কিংবা উৎসব—সব জায়গাতেই এই খাবারের আলাদা কদর রয়েছে। তবে সম্প্রতি পরিচিত খাবারটিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে নতুন এক বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছে—কেন এর নাম ‘মোরগ পোলাও’? কেন ‘মুরগি পোলাও’ নয়? এই নামকরণের পেছনে কি কোনো সামাজিক বা জেন্ডার-সংক্রান্ত মানসিকতা কাজ করেছে?
এই বিতর্কের সূত্রপাত করেন ড. নাহরিন ইসলাম খান, যিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এর ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক। একটি টকশোতে তিনি ‘মোরগ পোলাও’ নামটির মধ্যে জেন্ডার রাজনীতির ইঙ্গিত দেখিয়ে বলেন, সমাজে ‘অভিজাত’ বা উচ্চমার্গীয় খাবারের ক্ষেত্রে পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
তার ভাষায়, “খাবারের নামটা যখন পুরুষের নামের সঙ্গে যায়, তখন সেটা একটা স্ট্যান্ডার্ড পেয়ে যায়। যেমন মোরগ পোলাও। অথচ আমরা প্রতিদিন যে মুরগির মাংস খাই, সেটাকে বলি মুরগির ঝোল—কখনো বলি না মোরগের ঝোল।”
ড. নাহরিনের এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ তার বিশ্লেষণকে সমর্থন করেছেন, আবার কেউ একে ‘অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা’ বলেও উড়িয়ে দিয়েছেন।
তবে খাবারের নাম ‘মোরগ পোলাও’ হওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো প্রামাণ্য গবেষণা বা একাডেমিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। অনেকেই মনে করেন, এটি মুঘল আমলের রাজকীয় খাবার। তবে ঐতিহাসিক দলিল ঘেঁটে এমন কোনো সরাসরি উল্লেখ পাওয়া যায় না।
মুঘল সম্রাট আকবরের দরবার নিয়ে রচিত আইন-ই-আকবরী-তে বিভিন্ন ধরনের পোলাও ও মাংসের পদ থাকলেও ‘মোরগ পোলাও’ নামে কোনো খাবারের উল্লেখ নেই। একইভাবে মধ্যযুগীয় রন্ধনগ্রন্থ নিমতনামা-তেও এই নাম অনুপস্থিত।
ইতিহাসবিদদের ধারণা, ‘মোরগ পোলাও’ মূলত বাংলার নিজস্ব উদ্ভাবন, বিশেষ করে পুরান ঢাকার রান্নার ঐতিহ্যের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি ‘মুর্গ পোলাও’ নামে পরিচিত ছিল, যা পরে রূপান্তরিত হয়ে ‘মোরগ পোলাও’ হয়ে যায়।
সপ্তদশ শতকে ঢাকা যখন মুঘলদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে, তখন এখানকার স্থানীয় বাবুর্চিরা মুঘল রান্নার সঙ্গে দেশীয় স্বাদের মিশ্রণ ঘটান। সেই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় এক বিশেষ ধরনের পোলাও, যা পোলাও ও কোরমার সংমিশ্রণ—স্বাদে কিছুটা মিষ্টি, আবার মশলাদারও।
এই খাবারটিই সময়ের সঙ্গে ‘মোরগ পোলাও’ নামে জনপ্রিয়তা পায়। উনবিংশ ও বিংশ শতকে ঢাকায় এটি একটি স্বতন্ত্র ডিশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
রন্ধনবিশেষজ্ঞদের মতে, আসল ‘মোরগ পোলাও’-এর জন্য মোরগের মাংসই ব্যবহার করা হতো। কারণ, মুরগির তুলনায় মোরগের মাংস বেশি শক্ত, স্বাদে গাঢ় এবং ঘ্রাণে তীব্র। পোলাওয়ের মতো সুগন্ধি খাবারের সঙ্গে এই বৈশিষ্ট্যগুলো ভালোভাবে মিশে যায়। এ ছাড়া গ্রামীণ বাংলায় একসময় ডিম পাওয়ার জন্য মুরগিকে বাঁচিয়ে রাখা হতো। ফলে রান্নার জন্য বেশি ব্যবহৃত হতো মোরগ। এই বাস্তবতাও নামকরণে প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হয়।
অর্থাৎ, ‘মোরগ পোলাও’ নামটি কোনো জেন্ডারভিত্তিক মানসিকতার ফল নয়, বরং উপকরণ ও স্বাদের বৈশিষ্ট্য থেকেই এসেছে—এমনটাই মনে করছেন অনেক গবেষক। ড. নাহরিনের বক্তব্য সামনে আসার পর ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। নেটিজেনরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
ঢাকার বাসিন্দা আরিফ মাহমুদ লিখেছেন, “এটা অতিরিক্ত বিশ্লেষণ। রান্নার নামকরণে জেন্ডার খোঁজা ঠিক না। মোরগ পোলাও নাম হয়েছে কারণ এতে মোরগ ব্যবহৃত হতো—এটাই সহজ ব্যাখ্যা।” অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী সাবিহা রহমান ভিন্ন মত পোষণ করে বলেন, “আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিতে পুরুষবাচক শব্দকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়—এই বিষয়টা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ড. নাহরিনের কথায় ভাবার মতো দিক আছে।”
চট্টগ্রামের বাসিন্দা ফারহান কবির লিখেছেন, “বাস্তবে তো এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুরগি দিয়েই মোরগ পোলাও বানানো হয়। তাহলে নামটা কেন বদলাচ্ছে না? এখানেই প্রশ্নটা আসে।” আরেকজন ব্যবহারকারী, রাশেদা আক্তার মন্তব্য করেন, “আমরা অনেক সময় নামের মধ্যে সামাজিক মানসিকতা বহন করি—খাবারের ক্ষেত্রেও সেটা হতে পারে।”
ভাষাবিদদের মতে, কোনো কিছুর নামকরণ শুধু বাস্তবতার ভিত্তিতে নয়, বরং ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট মিলিয়েই গড়ে ওঠে। অনেক সময় একটি নাম তার মূল অর্থ ছাড়িয়ে একটি ‘ব্র্যান্ড’ বা পরিচয়ে পরিণত হয়।
‘মোরগ পোলাও’ও তেমন একটি নাম, যা এখন শুধু একটি উপকরণ নির্দেশ করে না—বরং একটি বিশেষ স্বাদ, রন্ধনপ্রণালী ও ঐতিহ্যের প্রতীক।
‘মোরগ পোলাও’ নিয়ে চলমান বিতর্ক হয়তো খুব শিগগির থামবে না। কেউ এটিকে জেন্ডার রাজনীতির দৃষ্টিতে দেখছেন, কেউ দেখছেন ইতিহাস ও রান্নার বাস্তবতার আলোকে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই আলোচনা আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও খাদ্য ঐতিহ্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। ‘মোরগ পোলাও’ শুধু একটি খাবার নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, রুচি এবং সামাজিক মানসিকতারও একটি প্রতিফলন।
খবরটি শেয়ার করুন