বুধবার, ২৮শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৩ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আর্জি জানিয়ে জাতিসংঘে আওয়ামী লীগের চিঠি *** মানিক পশারীর জানাজা-দাফনে বাধার অভিযোগ তদন্তে জামায়াতের কমিটি *** তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা জাপান প্রধানমন্ত্রীর *** রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার: জাতিসংঘের প্রতিবেদন *** মাও সেতুংকে নিয়ে মন্তব্যের জেরে ক্ষমা চাইলেন এমবাপ্পে, দুঃখ প্রকাশ লা লিগার *** আইজিপির বক্তব্য সরকারের জন্য বিব্রতকর: রিজভী *** বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমকে সমর্থন করে না সরকার: তথ্য উপদেষ্টা *** ‘ক্রসফায়ারের’ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স, আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে মবের শিকার হবেন না: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা *** আওয়ামী লীগের যারা ভালো মানুষ, তারা আপন ঠিকানা খুঁজে নেবেন: জামায়াত আমির

পিএইচডিধারী অধ্যাপক মন্ত্রীর পিএস হওয়ায় সমালোচনার ঝড়

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১২:২১ অপরাহ্ন, ১৮ই এপ্রিল ২০২৬

#

কামরুল হাসান মামুন। ছবি: সংগৃহীত

একজন পিএইচডিধারী অধ্যাপককে মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. কামরুল হাসান মামুন এই নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিষয়টিকে নৈতিকতা, যোগ্যতা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংকটের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার বক্তব্য ঘিরে ইতোমধ্যে নেটিজেনদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ঢেউ দেখা যাচ্ছে।

কামরুল হাসান মামুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে গতকাল শুক্রবার দেওয়া এক পোস্টে বলেন, “একজন পিএইচডি করা অধ্যাপক মন্ত্রীর পিএস হলে—হয় তিনি অধ্যাপক হওয়ার যোগ্য নন, নতুবা যিনি তাঁকে নিয়োগ দিয়েছেন, তিনি মন্ত্রী হওয়ার যোগ্য নন।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে মন্ত্রীর একান্ত সচিব পদটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও আকর্ষণীয়। এ পদে ক্ষমতা ও অর্থ—দুটোরই সুযোগ থাকে বলে ধারণা করা হয়।”

তিনি বলেন, একান্ত সচিব পদের একটি আলাদা গুরুত্ব আছে, কারণ তিনি মন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। তাই মানুষ ধরে নেয়, তার অনেক ক্ষমতা রয়েছে। সেই ক্ষমতাকে দুর্নীতিতে রূপান্তর করে অধিক অর্থ উপার্জনের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, “একজন অধ্যাপক কীভাবে এই পদে যেতে পারেন, আমি ভেবে আশ্চর্য হই। তাও আবার যার পিএইচডি আছে। এই পিএইচডির তাহলে কী মূল্য আছে? শিক্ষক পিএইচডি করেন গবেষণা করার জন্য এবং একই সঙ্গে ছাত্রদের গবেষণা শেখানোর জন্য। তিনি তো অধ্যাপক এবং পিএইচডি ডিগ্রি—দুটোকেই লজ্জিত করলেন। এই অধ্যাপক লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে হলেন মন্ত্রীর পিএস।”

তিনি জানান, মন্ত্রীর সঙ্গে সেই একান্ত সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি এখন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালকের (ডিজি) অতিরিক্ত দায়িত্বও পেয়েছেন। এটিও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ও লোভনীয় পদ।

কামরুল হাসান মামুন লেখেন, “মন্ত্রী কীভাবে একজন পিএইচডি করা অধ্যাপককে এই পদে নিয়োগ দিলেন? একজন পিএইচডি করা অধ্যাপক যখন মন্ত্রীর পিএস হতে চান, তখন ধরে নিতে হবে তিনি অধ্যাপক হওয়ার অযোগ্য এবং একই সঙ্গে পিএস হওয়ারও অযোগ্য। কে যোগ্য আর কে অযোগ্য—এটি বোঝা একজন মন্ত্রীর সবচেয়ে বড় যোগ্যতা; আর তা না পারা তার অযোগ্যতা। অনেক চাকরিতে দেখা যায়, অধিক যোগ্যরা আবেদন করলেও তাদের নিয়োগ দেওয়া হয় না।”

তার মতে, অধিক যোগ্যতার কেউ যখন নিজের যোগ্যতার তুলনায় কম যোগ্যতার পদে যেতে চান, তখন ধরে নেওয়া হয়, এর পেছনে কোনো না কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। বাংলাদেশে এখন এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যেখানে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের সুযোগ বেশি, সেখানে উচ্চশিক্ষিতরাও চাকরি করতে দ্বিধা করেন না।

বিশ্লেষকদের মতে, এখানে মূল প্রশ্নটি কেবল একজন ব্যক্তির পেশাগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে ক্ষমতার আকর্ষণ ও নৈতিক বিচ্যুতির ইঙ্গিত দেয়। একজন পিএইচডিধারী অধ্যাপক সাধারণত গবেষণা, জ্ঞান উৎপাদন ও শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন—এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু সেই ব্যক্তি যদি প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে আগ্রহী হন, তবে তা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কাঠামোগত দুর্বলতার একটি সম্মিলিত প্রতিফলন হতে পারে।

এক্ষেত্রে আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র কি তার মানবসম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছে? একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিকে তার মূল দক্ষতার বাইরে নিয়ে যাওয়া হলে তা কি রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতির কারণ নয়?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, যার বেশিরভাগই নেতিবাচক। ফেসবুক ব্যবহারকারী মাহমুদুল হক লিখেছেন, “পিএইচডি করে যদি শেষ পর্যন্ত পিএস হতে হয়, তাহলে এত পড়াশোনার মানে কী? এটা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অপমান।” আরেক ব্যবহারকারী সাদিয়া রহমান মন্তব্য করেন, “ক্ষমতার কাছে সবাই নতজানু—এটাই বাস্তবতা। এখানে যোগ্যতা নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘কাকে চেনেন’।”

তানভীর আহমেদ নামে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “এই ধরনের নিয়োগ প্রমাণ করে, দেশে মেধার চেয়ে সম্পর্ক বেশি মূল্যবান।” রাশেদ কবির নামে আরেকজন বলেন, “যেখানে দুর্নীতির সুযোগ বেশি, সেখানেই উচ্চশিক্ষিতরাও ভিড় জমাচ্ছেন—এটা ভয়ঙ্কর সংকেত।”

দেশে প্রশাসনিক পদগুলো দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাব ও সুযোগ-সুবিধার কারণে আকর্ষণীয় হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে মন্ত্রীর একান্ত সচিবের মতো পদ, যেখানে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কাছাকাছি থাকা যায়, তা অনেকের কাছে ক্ষমতার শর্টকাট হিসেবে দেখা হয়।

তবে এ ধরনের প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষা ও গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে যদি মেধাবীদের ধরে রাখা না যায়, তবে তা দেশের জ্ঞানভিত্তিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

কেউ কেউ বলছেন, ড. কামরুল হাসান মামুনের বক্তব্য হয়তো কঠোর, কিন্তু তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক উসকে দিয়েছে—যোগ্যতা বনাম সুযোগ, নৈতিকতা বনাম বাস্তবতা, এবং ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বনাম পেশাগত দায়িত্বের প্রশ্ন।

এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ও পেশাগত সিদ্ধান্ত নিয়ে সমাজে প্রশ্ন করার জায়গা এখনও রয়েছে। আর সেই প্রশ্নগুলোর জবাব খোঁজাই হতে পারে একটি সুস্থ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার প্রথম ধাপ।

ড. কামরুল হাসান মামুন

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250