বুধবার, ২৮শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৩ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আর্জি জানিয়ে জাতিসংঘে আওয়ামী লীগের চিঠি *** মানিক পশারীর জানাজা-দাফনে বাধার অভিযোগ তদন্তে জামায়াতের কমিটি *** তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা জাপান প্রধানমন্ত্রীর *** রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার: জাতিসংঘের প্রতিবেদন *** মাও সেতুংকে নিয়ে মন্তব্যের জেরে ক্ষমা চাইলেন এমবাপ্পে, দুঃখ প্রকাশ লা লিগার *** আইজিপির বক্তব্য সরকারের জন্য বিব্রতকর: রিজভী *** বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমকে সমর্থন করে না সরকার: তথ্য উপদেষ্টা *** ‘ক্রসফায়ারের’ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স, আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে মবের শিকার হবেন না: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা *** আওয়ামী লীগের যারা ভালো মানুষ, তারা আপন ঠিকানা খুঁজে নেবেন: জামায়াত আমির

আওয়ামী লীগের বেলায় আইন যেন প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে: কালের কণ্ঠ

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৮:৩৮ পূর্বাহ্ন, ১০ই এপ্রিল ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে দেশে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০২৬ পাস হওয়ার পর। এ বিষয়ে দৈনিক কালের কণ্ঠ তাদের আজ শুক্রবারের সম্পাদকীয় ‘সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হোক’-এ যে অবস্থান ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে, তা শুধু একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়—বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার ওপর একটি গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে।

সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে—“অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে সেটি আইনে পরিণত হয়েছে। এর ফলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থাকছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকিতে থাকলেও কিছুটা তড়িঘড়ি করে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিষয়টি স্থায়ী রূপ দিলেন বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্য। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিএনপি বলেছিল, কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে তারা অবস্থান নেবে না।”

কালের কণ্ঠের পর্যবেক্ষণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব নীতির মধ্যে ব্যবধানকে সামনে আনে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দলীয় অবস্থান পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু তা যদি যথাযথ ব্যাখ্যা ছাড়া ঘটে, তাহলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে। বিশেষ করে যখন বিষয়টি একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আইনের বিধান অনুযায়ী আরোপিত সীমাবদ্ধতাগুলোও ব্যাপক—“পাস হওয়া বিল অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ মিছিল-সভা-সমাবেশ করতে পারবে না, দলটির কার্যালয় বন্ধ থাকবে, ব্যাংক হিসাব জব্দ হবে, পোস্টার-ব্যানারে প্রচারসহ কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারবে না। বলা হয়েছে, সংগঠনটির পক্ষে কেউ কার্যক্রম পরিচালনা করলে চার থেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।”

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বিধান কার্যত একটি রাজনৈতিক দলকে সম্পূর্ণভাবে অচল করে দেয়। এটি কেবল সাংগঠনিক কার্যক্রম নয়, বরং মতপ্রকাশের অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও গুরুতর প্রভাব ফেলে। মানবাধিকারকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে ‘রাজনৈতিক স্পেস’ সংকুচিত হতে পারে।

কালের কণ্ঠের সম্পাদকীয়তে আইন পাসের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে—“গত বুধবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬ উত্থাপন করলে তা কণ্ঠ ভোটে পাস হয়, যদিও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিলটি পর্যালোচনার জন্য সময় চেয়েছিলেন। জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, বিলটি পাসের জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ে, এখন আর নতুন করে আপত্তি জানানোর সুযোগ নেই।”

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আলোচনার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়া একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, বিতর্কিত বা সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আইন পাসের আগে সংসদীয় কমিটি, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং জনআলোচনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

এরপর সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়—“এরপর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিলটি পাসের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করতে বলেন। আওয়ামী লীগ দেশের প্রাচীনতম একটি রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গেও দলটির নাম ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। নিকট অতীতে দলীয় কর্মকাণ্ডের সমালোচনা থাকলেও দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা নিয়ে বিশ্লেষকদের পর্যালোচনা রয়েছে।”

এই অংশে একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতার দিক তুলে ধরা হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন, যেসব দল দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে আরও সতর্ক থাকতে হয়, যাতে তা প্রতিহিংসামূলক বা প্রতিশোধমূলক হিসেবে প্রতীয়মান না হয়।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কেও কালের কণ্ঠ সম্পাদকীয়তে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য রয়েছে—“তারা মনে করেন, একটি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের মধ্য দিয়ে তেমন সুফল পাওয়া যায় না, বরং অনেক সময় এটি দেশ ও জাতির জন্য সংকট তৈরি করে। আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতিও কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ সমর্থন করে না।”

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সাধারণত রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে গুরুত্ব দেয়। চরমপন্থা বা সহিংসতা প্রমাণিত না হলে একটি দলকে নিষিদ্ধ করা বিরল ঘটনা। এমনকি সে ক্ষেত্রেও বিচারিক প্রক্রিয়া, স্বচ্ছতা এবং আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়।

সম্পাদকীয়তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানও দেখা যায়—“আমরা মনে করি, আওয়ামী লীগের যারা অপরাধ করেছেন, তাদের অবশ্যই সাজা হওয়া উচিত। তবে আইন যেন প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে। তাহলে সমাজে সহিংসতা, বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।”

আইনের শাসনের মৌলিক নীতি অনুযায়ী, অপরাধের দায় ব্যক্তির, গোষ্ঠীর নয়। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো দলের কিছু সদস্যের অপরাধের দায় পুরো দলের ওপর চাপানো হলে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বিভাজন বাড়াতে পারে।

সবশেষে, সুশাসনের প্রশ্নে সম্পাদকীয়টি সতর্কবার্তা দেয়—“সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে দেশে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর একটি অংশ (তা যত বড় বা ছোট হোক) কিভাবে রাজনীতির চর্চা করবে, তা সরকারকে ভাবতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করলে ফল উল্টো হয়। কাজেই নতুন এই আইনের প্রয়োগ নিয়ে সরকারকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।”

এটি কেবল একটি মতামত নয়, বরং একটি নীতিগত দিকনির্দেশনা। রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। যদি কোনো জনগোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়ে, তাহলে তা অসন্তোষ ও অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে।

সার্বিকভাবে, কালের কণ্ঠের সম্পাদকীয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—রাষ্ট্র কি আইনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই সমাধান খুঁজবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই সমাধান সবসময়ই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, স্বচ্ছ বিচারব্যবস্থা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের মধ্যেই নিহিত।

কালের কণ্ঠ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250