শনিবার, ১২ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮শে ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কলেজের নবীনবরণে ‘গানের কনসার্ট’ বন্ধের দাবি কওমি শিক্ষার্থীদের *** ইরান যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে, দাবি ট্রাম্পের *** দেশে সাংবাদিকদের আত্মহত্যার ঘটনা বেশি কেন *** ব্রিকস যৌথ ঘোষণায় সম্মতি নেতাদের, একতরফা যুদ্ধের নিন্দা জানাবে জোট *** ডিএনসিসির ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবসের স্টল পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী *** আসুন এবার রাষ্ট্রকে আমরা পুনর্গঠন করি: প্রধানমন্ত্রী *** ফরিদপুরে কার্টনে ভরা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির ৬ টুকরো মরদেহ উদ্ধার *** টুইন টাওয়ার থেকে লাফিয়ে পড়া সেই মানুষটি কে, ‘দ্য ফলিং ম্যান’ নিয়ে ২৫ বছরেও রহস্য *** কিশোরগঞ্জে গর্ভে থাকতেই চার শিশু বিক্রির অভিযোগ, তদন্তে পুলিশ *** তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

সুখবর এক্সপ্লেইনার

পরবর্তী রাষ্ট্রপতি পদে আইরিন খানকে নিয়ে আলোচনা কতটা জোরালো?

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৮:০৯ অপরাহ্ন, ২৫শে জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে শুরু হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ নিয়ে জোর আলোচনা। সংবিধান অনুযায়ী, ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা থাকায় ক্ষমতাসীন বিএনপি কাকে মনোনয়ন দেবে, সেটিই এখন রাজনৈতিক মহলের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। শুরুতে বিএনপির জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন কিছু নাম সামনে এসেছে। এর মধ্যে আলোচিত নামগুলোর একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকারকর্মী আইরিন খান।

একাধিক সরকারি ও রাজনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সরকার ইতোমধ্যে আইরিন খানকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর আগেই তার নিউইয়র্কে দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তুতির কথাও জানা গেছে। তবে একই সময়ে রাষ্ট্রপতি পদে তার নাম আলোচনায় আসায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন কৌতূহল। প্রশ্ন উঠেছে—জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে তার সম্ভাব্য নিয়োগ কি রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনাকে দুর্বল করে, নাকি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে?

পর্যবেক্ষকদের মতে, বাস্তবতার বিচারে এই দুটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ, রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন পেলে জাতিসংঘে যোগ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আবার জাতিসংঘে দায়িত্ব গ্রহণ করলে রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনাও কার্যত শেষ হয়ে যায়। ফলে আইরিন খানকে ঘিরে যে আলোচনা চলছে, তা এখনো রাজনৈতিক পর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সরকার ও বিএনপির ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে একজন নারীকে বিবেচনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ও মানবাধিকার বিষয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে আইরিন খানের নাম সামনে এসেছে। পশ্চিমা কয়েকটি দেশের কূটনৈতিক মহলেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।

যদিও এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার বা বিএনপি কোনো মন্তব্য করেনি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইরিন খানকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন অনেকে। তাদের যুক্তি, রাজনৈতিক বিভাজনের এই সময়ে দলীয় রাজনীতির বাইরের আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্রপতি হলে দেশের ভাবমূর্তি ইতিবাচক হতে পারে।

আইরিন খান দেশের সবচেয়ে পরিচিত আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদের একজন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব ছিলেন। সংস্থাটির ইতিহাসে তিনিই ছিলেন প্রথম নারী, প্রথম মুসলিম এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় মহাসচিব। পরে তিনি জাতিসংঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা–বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার, শরণার্থী সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করায় বিশ্ব কূটনৈতিক অঙ্গনে তার পরিচিতি সুপ্রতিষ্ঠিত।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার নাম বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দায়িত্বের জন্য বিবেচনায় এসেছিল। ফলে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে তাকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল না।

তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে যারা সরাসরি রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করছেন, তাদের বড় একটি অংশ মনে করে, বিএনপির বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত দলীয় রাজনীতির অভিজ্ঞ কাউকেই রাষ্ট্রপতি করা হতে পারে।

সরকার ও বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বাইরে থেকে কাউকে আনার পরিবর্তে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সম্ভাবনা বেশি। যদিও এখন পর্যন্ত দলীয় ফোরামে কোনো চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি, তবু সম্ভাব্যদের তালিকা অনেকটাই সংক্ষিপ্ত হয়ে এসেছে।

এ তালিকায় শুরু থেকেই ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির নামও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম। বিএনপির ভেতরের একটি অংশ তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে আগ্রহী বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী বলে মত দেন। তার ভাষায়, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সহিষ্ণুতা, ব্যক্তিগত সততা ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে মির্জা ফখরুল অন্যদের তুলনায় এগিয়ে।

একইভাবে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহও তার ফেসবুক পোস্টে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। যদিও এ দুটি মতামত ব্যক্তিগত, তবু তা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে জনপরিসরের আলোচনাকে আরও বেগবান করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, এটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। বিশেষ করে সরকার যদি দলীয় রাজনীতির বাইরের কোনো ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রপতি করে, তাহলে সেটি জাতীয় ঐকমত্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার বার্তা দিতে পারে। অন্যদিকে দলীয় কোনো প্রবীণ নেতাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে সেটি হবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দলীয় আনুগত্যের স্বীকৃতি।

বিশেষজ্ঞদের, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে অতিরিক্ত জল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে রাজনৈতিক কৌশলের ওপর। যেহেতু সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাই দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনিই কার্যত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দৃষ্টিতেও আইরিন খান একজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশি ব্যক্তিত্ব। বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান ও নিউইয়র্ক টাইমসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গত দুই দশকে মানবাধিকার, শরণার্থী সংকট, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে তার বক্তব্য ও বিশ্লেষণ গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা দেশের জন্য ইতিবাচক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা থাকলেই রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন মূলত সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে দলীয় রাজনৈতিক সমীকরণই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আইরিন খান কখনো সক্রিয় দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তার পুরো কর্মজীবন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, জাতিসংঘব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক কূটনীতিকেই ঘিরে। ফলে তাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে সেটি হবে প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে একটি সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্তের সুফল যেমন থাকতে পারে, তেমনি দলীয় রাজনীতির বাস্তবতায় কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুখবর ডটকমকে বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে এখনো সময় রয়েছে। রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলাতে পারে। ফলে আজ যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে, শেষ পর্যন্ত তাদের সবাই চূড়ান্ত বিবেচনায় থাকবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।

বর্তমানে সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দলটির মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

সব মিলিয়ে আইরিন খানকে নিয়ে আলোচনা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আন্তর্জাতিক মর্যাদা, মানবাধিকার বিষয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং একজন নারীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা—এই তিনটি কারণ তার নামকে বিশেষভাবে আলোচনায় এনেছে। তবে এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে তাকে ঘিরে আলোচনা যতটা জনপরিসরে, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক সম্ভাবনার পর্যায়ে।

অন্যদিকে বিএনপির অভ্যন্তরে দলীয় নেতাদের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রবণতা শক্তিশালী বলেই বিভিন্ন সূত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে আইরিন খান রাষ্ট্রপতি হবেন কি না, তার উত্তর এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা, জল্পনা ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ অব্যাহত থাকবে।

আইরিন খান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250